সরকার বলছে আছে, পাম্প বলছে তেল নেই, সত্যটা কী
দেশে জ্বালানি তেলের সংকট কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা টের পাওয়া গেলো নড়াইলের একটি ঘটনায়। সেখানে তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে পেট্রোলপাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত হয়েছেন পাম্পের আরেক কর্মী।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, শনিবার রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে নড়াইল-যশোর মহাসড়কের তুলারামপুর এলাকায় মেসার্স তানভীর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসেন একজন ট্রাকচালক। কিন্তু পাম্পে থেকে বলা হয় তেল নেই। এ নিয়ে পাম্পের ম্যানেজারের সঙ্গে চালকের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ট্রাকচালক রেগে গিয়ে বলেন, ‘তোদের পাম্পে তেল আছে, তুই দিচ্ছিস না; তোকে আজকে ট্রাকের তলে চাপা দেব’।
রাত আনুমানিক সোয়া ২টা দিকে পাম্পের ম্যানেজার কাজ সেরে তার ভাইয়ের বন্ধুকে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ির দিকে রওনা দেন। এ সময় ওই ট্রাকচালকও ট্রাক ঘুরিয়ে তার পেছনে রওনা দেন। তিনি সড়কে পাম্প ম্যানেজার নাহিদকে চাপা দিয়ে চলে যান। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং মোটরসাইকেলে থাকা আরেকজন গুরুতর আহত হন। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৯ মার্চ ২০২৬)।
সড়কে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দিয়ে হত্যা করলে সেটি যে ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুযায়ী হত্যার অপরাধ এবং তার শাস্তি যে মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড—সেটি ট্রাকচালকের না জানার কথা নয়। তাছাড়া এটা যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, তারও প্রমাণ তিনি নিজেই রেখেছেন। কিন্তু তারপরও জেনেশুনে এরকম একটি ঘটনা তিনি যে ঘটালেন, তার পেছনে রয়েছে তার রাগ ও ক্ষোভ। কিন্তু এই রাগ ও ক্ষোভ তৈরি হলো কেন? এর জন্য দায়ী কে? যে সিস্টেম বা রাষ্ট্রীয় যে অব্যবস্থাপনার জন্য এই ঘটনা ঘটলো, তার দায় কি রাষ্ট্র গ্রহণ করবে? এর জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাস্তির মুখোমুখি করা যাবে?
পেট্রোলপাম্পে তেল না পাওয়ার জেরে পাম্প ম্যানেজারকে যেদিন খুন করা হলো, সেদিনই সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার একটি ফিলিং স্টেশনে তেল সংগ্রহকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে ইউনিয়ন বিএনপির একজন সাবেক নেতার হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এছাড়া শনিবার দিনভর দেশের বিভিন্ন স্থানে তেল সংকটের নানা খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। যেমন টেলিভিশনের সংবাদে দেখা গেছে, নীলফামারীর রাজা পাম্পে তেল নিতে এসে সিরিয়াল না পাওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন চালক। বললেন, তেলের অভাবে রোগী নিয়ে চরম বিপদে আছেন তারা। সময়মতো রোগীদের সেবা দিতে পারছেন না।
প্রশ্ন হলো, জ্বালানি তেলের এমন সংকট তৈরি হলো কেন যে অ্যাম্বুলেন্সও গিয়ে তেল পাবে না? সরকার তো বারবার বলছে যে দেশে পেট্রোল ও অকটেনের কোনো সংকট নেই কারণ এগুলো দেশেই উৎপাদিত হয়। যদি তাই হয়, তাহলে অসংখ্য পাম্প কেন বন্ধ এবং চালু থাকা পাম্পের সামনে কেন মাইলের পর মাইল যানবাহনের সারি? কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্রাহকরা যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না? সরকারের দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই কেন? নাকি একশ্রেণির পাম্প মালিক কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চোরাইপথে বেশি দামে তেল বিক্রি করছেন? তেলের ডিপো এবং ডিপো থেকে পাম্পে আসার পথে সংশ্লিষ্ট লোকজন কি তেল চুরি ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত? এই প্রশ্নগুলো উঠছে। কারণ মানুষ এসব নিয়ে সন্দেহ করছে।
পেট্রোল ও অকটেন যেখানে দেশেই উৎপাদিত হয়, সেখানে কেন এমন ভয়াবহ সংকট তৈরি হলো? শোনা যায়, বেসরকারি কনডেনসেট রিফাইনারি ইউনিটগুলো দাম বাড়ার আশায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তার উৎপাদনের উৎস ঠিক থাকলেও বাজার কারসাজির করার জন্য কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তাছাড়া ইরান যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানিও যে ব্যাহত হচ্ছে, সেই বাস্তবতাও অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে সবদিক রক্ষা করে নাগরিকের স্বস্তি নিশ্চিত করা। সরকার সেটি পারছে না।
পাম্পে পৌঁছানোর আগেই যে তেল বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, সেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে নাটোরের সিংড়ায়। ফিলিং স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই গোপনে তেল বিক্রির অভিযোগে তেলের লরির ম্যানেজারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
একদিকে বলা হচ্ছে পাম্পে তেল নেই। অন্যদিকে সরকারের সংশ্লিষ্টরা অভিযান চালিয়ে দেখছেন যে, পাম্পের রিজার্ভ ট্যাংকেতে তেলের অভাব নেই। শনিবারই ফরিদপুরে ‘পেট্রোল নেই’ লেখা একাধিক পাম্পে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৮ হাজার লিটার তেলের সন্ধান পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এজন্য জরিমানাও করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে তেল মজুদ রাখার অপরাধে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই দিন যশোরের মণিরামপুরে অননুমোদিত তেল বিক্রেতার গুদাম থেকে প্রায় ১৮শ’ লিটার জ্বালানি তেল ও মবিল জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই দিন নীলফামারীতে ক্রেতা সেজে তেল চুরি ধরে ফেলেন এনডিসি।
শনি ও রবিবার দিনভর এরকম আরও অনেক সংবাদ এসেছে, যাতে জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, কারা এই সংকট তৈরি করছে? সংকটের ব্যবসা বাজারে যেকোনো পণ্য সংকটের আড়ালে অনেক সময়ই অবৈধ ও অনৈতিক ব্যবসার যোগসূত্র থাকে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে পণ্যটি বাজারে নেই বা সংকট আছে, কিন্তু চোরাই পথে আপনি সেটি বেশি দাম দিয়ে কিনতে পারবেন। ফলে অনেক সময়ই দেখা যায় ওই সংকট তৈরিই করা হয় চোরাই পথে বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের জন্য কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রির জন্য। এরকম একেকটি সংকট একেকটি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেককে রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দিতে পারে।
দেশের চলমান জ্বালানি তেল সংকটের পেছনে একটি শ্রেণির এরকম অপতৎপরতা কাজ করছে কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। কেননা সরকার বারবারই বলছে যে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। অথচ গণমাধ্যমের খবর বলছে, অসংখ্য পাম্প বন্ধ। আর যেগুলো খোলা আছে, তার সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কেউই তার কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছেন না। যার চাহিদা ২০ লিটার, তাকে দেয়া হচ্ছে ২ লিটার। কিন্তু চোরাই পথে বা বাঁকা পথে গিয়ে অনেকেই যে বাড়তি দামে তেল কিনছেন, সেই খবরও আসছে।
তাহলে সরকার কী করছে?
শনিবার জাতীয় সংসদে সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানান, বৈঠকে দেশের বিদ্যমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে বলা হয়েছে, তেল মজুদকারী ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যারা সরকারকে যারা বিপদে ফেলতে চাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান জানিয়েছেন, তেলের মজুদ পর্যাপ্ত আছে। ২ লাখ মেট্রিকটন তেল এরইমধ্যে এসেছে। আরো ২ লাখ পথে আছে। তেলের চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তেলের দাম যাতে না বাড়ে তার সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পরদিন রবিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে অফিস করতে গিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেন।
দৃশ্যত মনে হচ্ছে, জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় সরকার আন্তরিক। কিন্তু সমস্যা হয়েছে শুরুতেই। শুরুতেই সকারের কোনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কথা এবং গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদন, সেইসাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কিছু খবর ও গুজবের কারণে মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যে কারণে শুরু হয়েছে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয়ের মানসিকতা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির হিসাবে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে আসে। মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত আকারে এনে দেশে পরিশোধন করা হয়। বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়। ইরান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এর পাশাপাশি বাজার কারসাজি এবং আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনার মানসিকতাও এই সংকট তৈরিতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হয়। সুতরাং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, কঠোর নজরদারি এবং ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতার ওপরেই গুরুত্ব দিতে হবে।
বলা হয়, পেট্রোলের বর্তমান চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোলের মোট চাহিদা ছিল চার লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন, যার শতভাগই দেশে উৎপাদন হয়েছে। অপরিশোধিত তেল থেকে এর ১৬ শতাংশ উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। বাকি ৮৪ শতাংশ বেসরকারি রিফাইনারি থেকে উৎপাদিত হয়।
অকটেনের ক্ষেত্রেও বড় অংশ দেশে উৎপাদিত হয় মূলত কনডেনসেট থেকে। প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া এক ধরনের হালকা, বর্ণহীন বা হালকা হলুদ বর্ণের যে তরল হাইড্রোকার্বন মিশ্রণ পাওয়া যায়, সেটি পরিশোধন করে অকটেন তৈরি করা হয়। গত অর্থবছরে প্রায় পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার টন কনডেনসেট সংগ্রহ ও পরিশোধন করা হয়েছে। তবে অকটেনের চাহিদার পুরোটা দেশীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হয় না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চার লাখ ১৫ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৩ টন অকটেন আমদানি করেছে বিপিসি।
সুতরাং পেট্রোল ও অকটেন যেখানে দেশেই উৎপাদিত হয়, সেখানে কেন এমন ভয়াবহ সংকট তৈরি হলো? শোনা যায়, বেসরকারি কনডেনসেট রিফাইনারি ইউনিটগুলো দাম বাড়ার আশায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তার উৎপাদনের উৎস ঠিক থাকলেও বাজার কারসাজির করার জন্য কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তাছাড়া ইরান যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানিও যে ব্যাহত হচ্ছে, সেই বাস্তবতাও অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে সবদিক রক্ষা করে নাগরিকের স্বস্তি নিশ্চিত করা। সরকার সেটি পারছে না।
এখানে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার সংকট আছে। গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রশাসনিক কঠোরতাও ঘাটতি আছে। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার হয়তো শুরুতেই কঠোর হতে চাচ্ছে না। কিন্তু দেশ ও জনগণের স্বার্থে যে-কোনো পর্যায়ের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা এবং চোরাই পথে তেল বিক্রির কার্যক্রম শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাম্পের ম্যানেজার ও কর্মী থেকে শুরু করে তেলের ডিপো, তেলের লরির চালকসহ বিভিন্ন স্তরের লোকজন তেল চুরির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ এসেছে। কিছু কিছু অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। সুতরাং এসব বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/এমএস