মাইক ব্যবহার: বিএনপি-জামায়াত প্রধানের ক্ষেত্রে নির্বিকার ইসি
চট্টগ্রামে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জনসভাস্থল/ফাইল ছবি
মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ছোট ছোট দলের প্রার্থীদের জরিমানা করা হলেও বড় দুটি দলের প্রধানদের জরিমানার আওতায় আনেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অথচ বিএনপি-জামায়াতের প্রধানরা রাত-দিন সমানভাবে সভা সমাবেশ করছেন এবং একাধিক মাইক ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আচরণবিধিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বেলা ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে মাইক ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু কোনো প্রার্থীই এই বিষয়টি কর্ণপাত করছে না বলে ইসিতে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৩ জানুয়ারি ভোর ৪টায় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের পাঁচরুখী বেগম আনোয়ারা ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন তারেক রহমান। এই প্রচারণায় তিনটির অধিক মাইক ব্যবহার করা হয়। অথচ বিধিমালায় রয়েছে, দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে মাইক ব্যবহার করতে হবে। অথচ ভোর ৪টায় মাইক ব্যবহার মানে স্পষ্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন। অথচ এই ঘটনায় তারেক রহমানসহ সংশ্লিষ্ঠ কাউকে জরিমানা করা হয়নি।
তারেক রহমানের আগে বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী ও বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি-সমর্থিত জোটের প্রার্থী ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমী। কাউকেই জরিমানা করেনি ইসি। একাধিক মাইক ব্যবহারের পাশাপাশি সময়ের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিলেন না কোনো প্রার্থীই।
শুধু তারেক রহমান নয়, মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসির আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও। গত ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় চট্টগ্রাম নগরের বন্দর স্কুল মাঠে নগর জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। এ সময় তিনটির অধিক মাইক ব্যবহার করা হয়। জনসভা ৮টার পরে শেষ হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনায় কাউকে জরিমানা করেনি ইসি। এমনকি ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী এনসিপির চট্টগ্রাম অঞ্চল তত্ত্বাবধায়ক মো. জুবাইরুল হাসান আরিফ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের এ কে এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম-১০ আসনের মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, চট্টগ্রাম-১১ আসনের মোহাম্মদ শফিউল আলম, খাগড়াছড়ি আসনের প্রার্থী ইয়াকুব আলীকেও জরিমানা করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, উনাদের (তারেক রহমান-ডা. শফিকুর রহমান) বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। স্থানীয় তদন্ত কমিটিও আমাদের কাছে উনাদের বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেয়নি।
তবে রাত ৮টার পর মাইক ব্যবহার করে নির্বাচনি পথসভা করায় ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী ও এনসিপি নেতা সারজিস আলমের প্রতিনিধিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টার পর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি বাজার এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় উপজেলা সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (ভূমি) এসএম আকাশ নির্বাচনি আচরণবিধি ১৭ এর ২ ধারা লঙ্ঘনের দায়ে সারজিস আলমকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করলে তার নির্বাচনি প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান হাবিব জরিমানার ৫ হাজার টাকা তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করেন। একইসঙ্গে আগামীতে নির্বাচনি সভায় নির্ধারিত সময়ে মাইক ব্যবহারে সতর্ক করা হয়।
এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, সার্জিস আলম রাত ৮টার পর মাইক ব্যবহার করলে জরিমানা করা হয়। অথচ তারেক রহমান এতদিন ধরে রাতের বিভিন্ন সময়ে শত শত মাইক ব্যবহার করলেও সতর্কীকরণ পর্যন্ত নেই।
এ দিকে, আচরণবিধি মেনে প্রচার প্রচারণা করার জন্য প্রার্থীদের আহ্বান জানিয়েছে ইসি। আচরণবিধি লঙ্ঘনকে নিন্দনীয় দাবি করে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সব প্রার্থীকে প্রচারণা চালানোর অনুরোধ রইলো। অনেকে আচরণবিধি মানছেন না, বিষয়টি নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। অনেক প্রার্থী পরিবেশ নষ্ট করছে। আমরা বারবার বলছি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। সবাইকে আচরণবিধি মেনে চলার অনুরোধ করছি।
বড় দলের প্রার্থীর ক্ষেত্রে না কি আচরণবিধি শিথিল করা হচ্ছে— আসিফ মাহমুদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসি সচিব বলেন, আমরা ঢাকায় বসে দূরের ঘটনা দেখতে পারবো না। স্থানীয়ভাবে তারা অভিযোগ দিতে পারে। আমাদের তদন্ত কমিটি যারা আছে তারা আমাদের কাছে পাঠালে আমরা বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা নেবো।
গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার স্লিপ, মাইক্রোফোন ও লাউড স্পিকারের ব্যবহারে নতুন বিধিনিষেধ এনে নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর সংশোধিত আচরণ বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। এতে মাইক ব্যবহারের নির্দিষ্ট সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রার্থীরা প্রয়োজনীয় সংখ্যাক মাইক ব্যবহার করে প্রচারণা চালাতে পারবে।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এ গেজেট বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর অধিকতর সংশোধন করা হয়েছে।
(ক) বিধি ৮ এর দফা (খ) এর পরিবর্তে নিম্নরূপ দফা (খ) প্রতিস্থাপিত হইবে ‘(খ) দফা (ক) তে উল্লিখিত ভোটার স্লিপ ১২ (বারো) সেন্টিমিটার × ৮ (আট) সেন্টিমিটার আকারের অধিক হতে পারবে না।
বিধি ১৭-এর উপ-বিধি (১)-এর পরিবর্তে নিম্নরূপ উপ-বিধি (১) প্রতিস্থাপিত হইবে, (১) কোনো প্রার্থী বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কোনো নির্বাচনি এলাকার একক কোনো জনসভায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করতে পারবেন।
তবে আগের মতোই কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা তৎকর্তৃক মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি প্রচারণার সময় কোনো নির্বাচনি এলাকায় মাইক বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী অন্যবিধ যন্ত্রের ব্যবহার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখবেন। নির্বাচনি প্রচারকাজে ব্যবহৃত মাইক বা শব্দ বর্ধনকারী যন্ত্রের শব্দের মানমাত্রা ৬০ ডেসিবেলের অধিক হতে পারবে না।
এমওএস/এমএমকে