ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. রাজনীতি

উপদেষ্টা থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী: ড. খলিলকে ঘিরে প্রশ্ন-প্রত্যাশা

জেসমিন পাপড়ি | প্রকাশিত: ১০:০৩ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দীর্ঘ ২০ বছর পর সরকার গঠন করেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দলের কোনো নেতাকে নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে বেছে নিয়েছে বিএনপি। দলটির এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ চমক সৃষ্টি করেছে। গত দুদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘যাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাকে নিয়ে আগে বিএনপির আপত্তি ছিল। এখন সেই ব্যক্তিকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে দলটি অতিরিক্ত একটি বিতর্ক তৈরি করেছে।’

তিনি বলেন, ‘একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে যদি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার জায়গা তৈরি করতে পারে। বিএনপি চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারতো। অবশ্য সিদ্ধান্তটির পেছনে তাদের নিজস্ব কৌশল বা বৈদেশিক চাপ বা সমঝোতার হিসাবও থাকতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. খলিলুর রহমান। একই দিন বিকেলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।

পাশাপাশি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নতুন সরকারের মন্ত্রিপরিষদে স্থান পেয়েছেন ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা) আসনের সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম।

ড. খলিলুর রহমান এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর। তবে তিনি বলেন, ‘তার বিষয়ে স্টেকহোল্ডাররা কথা বলা শুরু করেছেন। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, এখানে যেমন সুবিধা আছে, তেমনি কিছু অসুবিধাও আছে। দেখা যাক।’

তবে ড. খলিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়াকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী।

‘নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও, এখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। খলিলুর রহমান আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার ছিলেন। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংবেদনশীল ট্যারিফ নেগোসিয়েশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।’

আরও পড়ুন

ড. ইউনূসের ‘পদত্যাগ ভাবনা’ নিয়ে বিএনপিতে মতপার্থক্য
আমি তো জোর করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হইনি: খলিলুর রহমান
দিল্লি যাচ্ছেন খলিলুর রহমান, বৈঠক হতে পারে অজিত দোভালের সঙ্গে
রোহিঙ্গা ইস্যুতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা আরোপে প্রস্তুত বিশ্ব সম্প্রদায়: ড. খলিলুর রহমান

আব্বাসী বলেন, ‘সম্ভবত সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিএনপি সরকারের কাজে লাগবে বলেই আশা করা যায়।’

তবে তাকে নিয়োগের ব্যাপারে বিদেশি কোনো চাপ বা সমঝোতার বিষয়ে জানতে চাইলে পারভেজ করিম বলেন, ‘আমরা যা সত্য বলে ধরে নিই, তার পক্ষে আমাদের কাছে দৃঢ় প্রমাণ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে জল্পনা-কল্পনাই বেশি হয়, বাস্তবতা কম। কোনো মন্ত্রী যদি একটি দেশের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন, মানুষ তখন তাকে সেই দেশের ঘনিষ্ঠ বলে ধরে নেয়—কেউ বলেন ভারতপন্থি, কেউ বলেন আমেরিকাপন্থি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্নও হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এমন ধারণা ছিল—একেকজন মন্ত্রী বা উপদেষ্টা নাকি একেকটি ‘ক্যাম্পে’। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত বোঝাপড়া বা যোগাযোগ ভালো থাকলে সেই দেশের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একটি মন্ত্রিসভায় যদি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে যাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা সম্পর্ক রয়েছে, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেটি কৌশলগত দিক থেকে ইতিবাচক হতে পারে।’

‘সুতরাং, এ নিয়ে যে জল্পনা-কল্পনা চলছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার খুব বেশি মিল আছে বলে মনে হয় না। আপাতত এতটুকুই বলা যায়,’ মন্তব্য করেন তিনি।

যা বলছেন খলিলুর রহমান

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মার সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি তো জোর করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হইনি। নির্বাচন ও নিয়োগ নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তারা চাইলে আবারও হিসাব মিলিয়ে দেখতে পারেন।’

ড. খলিলুর রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরে যেতে চায় সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন—‘সবার আগে বাংলাদেশ’। জাতীয় মর্যাদা, পারস্পরিক সুবিধা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেই আমরা পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবো।

তিনি বলেন, অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা হবে। সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা হবে, তবে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। পররাষ্ট্র কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি, যেন গুজব বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ না থাকে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে সরকারের নজর কমবে না, বরং আরও জোরদার হবে। আরাকান অঞ্চলের পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে এবং দ্রুত ও টেকসই সমাধানের চেষ্টা চলবে।

গত বছরের ১৭ মে খুলনার সার্কিট হাউজ ময়দানে এক সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ ছিল— একজন ‘বিদেশি নাগরিককে’ জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি আরও দাবি করেন, রোহিঙ্গা ইস্যুকে ঘিরে ‘মানবিক করিডর’ ধারণার আড়ালে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার আশঙ্কা রয়েছে। সে সময় তিনি খলিলুর রহমানকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে পরবর্তীসময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফরের প্রেক্ষাপটে লন্ডনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পেছনে খলিলুর রহমানের ভূমিকা ছিল বলে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা হয়।

একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর ঢাকা–ওয়াশিংটন সম্পর্ক পুনর্গঠনে তার সম্পৃক্ততার কথাও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে মার্কিন শুল্ক ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হয়।

রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও মিয়ানমারের সঙ্গেও সংলাপ অব্যাহত রাখার উদ্যোগের সঙ্গেও তার নাম যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং বেইজিংয়ে আয়োজিত এক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে তার অংশগ্রহণ—এসব ঘটনাও তাকে আলোচনায় রাখে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে তার শপথ নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, খলিলুর রহমানের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণ করে—তিনি আগেই একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন কি না, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তবে সমালোচনা থাকলেও ড. খলিলুর রহমানের পেশাগত জীবন দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ১৯৭৯ সালে তিনি বিসিএস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও কূটনীতিতে স্নাতকোত্তর এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ, নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (আঙ্কটাড)-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

জেপিআই/এএসএ