সংরক্ষিত নারী আসন
পরিবারের সদস্যদের এমপি হিসেবে পেতে চায় বিএনপির জোটসঙ্গীরা
জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তাসলিমা আখতার, আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রব, কাজী জাফরের মেয়ে জয়া কাজী ও এহসান হুদার স্ত্রী রোকসানা শারমিন (বাম দিক থেকে)
যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোটের বিভিন্ন শীর্ষ নেতার পরিবার থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন নিয়ে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভেতরে। জোটসঙ্গীদের মধ্য থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা ঘিরে চলছে অঘোষিত হিসাব-নিকাশ। জোটসঙ্গীদের অধিকাংশই নিজেদের পরিবারের সদস্যদেরই সংরক্ষিত আসনের এমপি হিসেবে পেতে চাইছেন।
ক্ষমতাসীন দলের জোটসঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংরক্ষিত আসনে গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে আলোচনায় রয়েছেন আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রব। গণসংহতি আন্দোলন থেকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তাসলিমা আখতারের নাম আলোচনায় এসেছে। একই দলের শীর্ষ নেতা আরিফুল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর তার স্ত্রী রেবাকা নীলকেও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের মেয়ে ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোশরেকা অদিতি হকের নামও আলোচনায় আছে।
আরও পড়ুন
সংরক্ষিত নারী আসনে এনসিপি থেকে আলোচনায় যারা
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির টিকিট পাচ্ছেন কারা?
১২ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) থেকে কাজী জাফরের মেয়ে জয়া কাজীর নাম উঠে এসেছে। পাশাপাশি জাতীয় দলের এহসান হুদার স্ত্রী রোকসানা শারমিনও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। অন্যদিকে সমমনা জোট থেকে ফরিদুজ্জামান ফরহাদের স্ত্রীর নামও বিবেচনায় রয়েছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদকের মেয়ে ড. মোশরেকা অদিতি হক ও এনপিপি চেয়ারম্যানের স্ত্রী ইমরান আক্তার কাকলি (বাম দিক থেকে)
সম্ভাব্য প্রার্থীদের একজন রোকসানা শারমিন বলেন, বিগত শাসনামলে তার স্বামী সৈয়দ এহসানুল হুদা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এবং হামলা-মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরাও পরিবার হিসেবে নানা প্রতিকূলতা সহ্য করেছি। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচন করেছেন। আমি নিজেও নারী সমাজকে সংগঠিত করতে কাজ করেছি। দল যদি আমাকে সুযোগ দেয়, তাহলে শহীদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করবো।’
এ বিষয়ে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে জোটসঙ্গীদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত আসনে প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে আমাদের দল থেকে একজনকে তিনি কেবিনেটে রাখবেন। প্রতিমন্ত্রী দিয়ে সেই প্রতিশ্রুতি তিনি পূরণ করেছেন। সে সময় তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে উচ্চকক্ষ অথবা সংরক্ষিত আসনেও গণধিকার পরিষদের প্রতিনিধি যুক্ত করা হবে। এক্ষেত্রে গণঅধিকারের দুই-তিনজন নারী সংরক্ষিত আসনের আলোচনায় আছে। এটা গণধিকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিকে জানানো হবে।
আরও পড়ুন
সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতের প্রার্থী চূড়ান্ত, ঘোষণা শিগগির
সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট ১২ মে
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, যুগপৎ আন্দোলনে শরিকদের অনেকেই জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন, কেউ নির্বাচিত হয়েছেন, কেউ দায়িত্বও পেয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে কেউ মনোনীত হবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
আমরাও পরিবার হিসেবে নানা প্রতিকূলতা সহ্য করেছি। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচন করেছেন। আমি নিজেও নারী সমাজকে সংগঠিত করতে কাজ করেছি। দল যদি আমাকে সুযোগ দেয়, তাহলে শহীদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করব।—রোকসানা শারমিন
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, জোট রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলনের স্বীকৃতি—এই দুই বিবেচনাকে সামনে রেখেই সংরক্ষিত নারী আসনের চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ সমীকরণে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এবার জাতীয় নির্বাচনে ১৪টি আসন শরিকদের জন্য ছাড়ে বিএনপি। এরমধ্যে ৯টি আসনে শরিকরা নিজস্ব প্রতীক নিয়ে লড়েছে। বাকিরা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের দল ছেড়েও ধানের শীষে নির্বাচন করেছেন। কিন্তু এই শরিকদের মধ্যে জিতেছেন মাত্র তিনজন। তারা আবার নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করেই জয় পেয়েছেন। তারা হলেন গণসংহতি আন্দোলন (জোনায়েদ সাকি), গণঅধিকার পরিষদ (নুরুল হক নুর), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি (আন্দালিব রহমান পার্থ)। এর মধ্যে জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুর মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পেয়েছেন। আবার নিজের দল ছেড়ে ধানের শীষে নির্বাচন করে জয় পেয়ে ববি হাজ্জাজ হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
সে সময় তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে উচ্চকক্ষ অথবা সংরক্ষিত আসনেও গণধিকার পরিষদের প্রতিনিধি যুক্ত করা হবে। এক্ষেত্রে গণঅধিকারের দুই-তিনজন নারী সংরক্ষিত আসনের আলোচনায় আছে। এটা গণধিকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিকে জানানো হবে।—আবু হানিফ
এরই মধ্যে বুধবার সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ২১ এপ্রিলের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে; বাছাই ২২ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল এবং প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল এবং ভোট হবে ১২ মে।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ভোটে জয়ী দলগুলোর আসন সংখ্যার অনুপাতে সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। বিএনপি জোট ৩৬, জামায়াত জোট ১৩ ও স্বতন্ত্র জোট ১টি আসনে পাবে।
এদিকে বিএনপির কাছ থেকে সংরক্ষিত কয়েকটা আসন পেতে তফসিলের অনেক আগ থেকেই জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জোটসঙ্গীরা। তবে সবাই নিজের পরিবারের সদস্যদেরই সংরক্ষিত আসনের এমপি বানানোর জন্য আগ্রহী।
কেএইচ/এসএইচএস