বিজয়ের আনন্দে মহিমান্বিত হলে বুঝবেন গণতন্ত্র এসেছে
ছবিতে রহমান মৃধা ও তার সহধর্মিণী
বিজয়ের আনন্দে যখন শুধু বিজয়ী নয়, পরাজিত পক্ষও সম্মানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকে, তখনই বোঝা যায় গণতন্ত্র এসেছে। কারণ গণতন্ত্র কোনো উৎসব নয়। এটি একটি কঠিন এবং অনেক সময় নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া।
গণতন্ত্রের বাস্তবতা হলো, মাত্র একটি ভোটের ব্যবধানে আপনি পরাজিত হতে পারেন। জনসমর্থনের প্রায় সমান ভাগ পেয়েও আপনাকে মেনে নিতে হয় আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীকে বিজয়ী হিসেবে। এই মেনে নেওয়ার শক্তিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এখানে অহংকার নেই, আছে নিয়ম মানার শালীনতা এবং আত্মসংযম।
খেলাধুলায় আমরা এই নৈতিকতা সহজে বুঝি। ১০০ মিটার দৌড়ে বিজয়ী ও পরাজিতের ব্যবধান কখনো কখনো সময়ের শতভাগের একভাগেরও কম। তবু সেখানে কেউ ফলাফল অস্বীকার করে না। পরাজিত জানে, আজ সে হারলো, আগামী দিনে আবার সুযোগ আসবে। গণতন্ত্রও ঠিক তেমনই একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, যেখানে নিয়মই শেষ কথা।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, একটি দেশ কীভাবে এই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো কেমন হলে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আর কীভাবে বুঝব আমরা আদৌ একটি গণতান্ত্রিক দেশে বাস করছি কি না।
বিশ্বের কিছু সফল গণতন্ত্রের দিকে তাকালে কয়েকটি সাধারণ নীতির সন্ধান পাওয়া যায়।
সুইডেনে নির্বাচন মানে কেবল ভোটের দিন নয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যেখানে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সবাই জানে তাদের সীমা কোথায়। ক্ষমতা হস্তান্তর এখানে একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় ঘটনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো দলের নয়, জনগণের।
জার্মানির অভিজ্ঞতা দেখায় যে শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। আদালত, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সংসদ সেখানে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে কোনো একক শক্তি রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি বানাতে না পারে।
নিউজিল্যান্ড প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ক্ষমতাকে বিনয়ী রাখে, তখন গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজেকে রাষ্ট্রের মালিক নয়, জনগণের কর্মচারী হিসেবে উপস্থাপন করেন।
কানাডা দেখিয়েছে যে গণতন্ত্র শুধু ভোট নয়, সংলাপও। ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণের অংশ হিসেবে দেখা হয়।
এই উদাহরণগুলো আমাদের বলে দেয়, গণতন্ত্র টিকে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপর। শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এবং সচেতন নাগরিক সমাজ।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি অপ্রিয় সত্য সরাসরি বলা জরুরি।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি কোটা আন্দোলনের পক্ষে সংঘটিত একটি নৈতিক বিদ্রোহ। এর মূল দাবি ছিল একটাই। মেধা যেন ক্ষমতা, পরিচয় বা প্রভাবের কারণে পিছিয়ে না পড়ে। এই আন্দোলন রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে নাগরিকের অধিকার বংশগত নয়, অর্জিত।
ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তেই দেশের রাজনৈতিক পরিসরে একটি গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তারেক রহমানের কন্যার রাজনীতিতে আগমন নিয়ে আলোচনা। তিনি রাজনীতিতে আসতেই পারেন। এটি তার নাগরিক অধিকার। গণতন্ত্র কাউকে নিষিদ্ধ করে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি কীভাবে আসবেন।
যদি তিনি বাবার পরিচয়ে বিএনপির অন্যান্য নেতাকর্মীদের পেছনে ফেলে সামনের সারিতে উঠে আসেন, যদি ত্যাগ, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে না গিয়ে সহজ পথে জায়গা করে নেন, তাহলে সেটি কেবল একটি দলীয় সিদ্ধান্ত হবে না। সেটি হবে জুলাইয়ের চেতনার সরাসরি অস্বীকার।
এখানে সুইডেনের একটি ঘটনা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডরিক রাইনফেল্টের ছেলে একসময় দলের কিছু নিয়ম ভঙ্গ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য শীর্ষ প্রার্থীদের তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সেটি বাতিল করা হয়। সেখানে কোনো পারিবারিক পরিচয় বিবেচনায় আনা হয়নি। বার্তাটি ছিল পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর সন্তানও নিয়মের ঊর্ধ্বে নয়।
এটাই প্রকৃত রাজনৈতিক বাস্তবতা। এটাই গণতন্ত্রের শৃঙ্খলা।
যদি তারেক রহমানের পরিচয়ে তার কন্যা দলের ভেতরে অন্যদের পেছনে ফেলে সামনে চলে আসেন এবং জাতি ও মিডিয়া যদি এর প্রতিবাদ না করে, তাহলে এখানেই গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাকটিস ধ্বংস হয়ে যাবে। ধ্বংস হবে জুলাইয়ের চেতনা। হতাশ হবে তরুণ সমাজ। হারাবে অনুপ্রেরণা সেই শিক্ষার্থী, যে বিশ্বাস করেছিল মেধা একদিন পরিচয়ের চেয়ে শক্তিশালী হবে।
এই মুহূর্তে যদি আমরা নীরব থাকি, তবে তার মূল্য আগামী প্রজন্মকে দিতে হবে এমন এক রাষ্ট্রে, যেখানে মেধা নয়, পরিচয়ই হবে ভবিষ্যতের একমাত্র যোগ্যতা।
গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন কঠিন প্রশ্ন তোলা হয় আপন মানুষের বিরুদ্ধেও। যখন বলা যায়, তুমি আসবে, কিন্তু অন্য সবার মতোই। তুমি নেতৃত্ব দেবে, কিন্তু আগে নিজেকে প্রমাণ করবে।
তাহলে কীভাবে বুঝবেন আপনি গণতন্ত্রের দেশে বাস করছেন। যখন নির্বাচন শেষে বিজয়ী ও পরাজিত উভয়েই একই নিয়মের অধীন থাকে। যখন আদালত ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও রায় দিতে পারে। যখন সাংবাদিক প্রশ্ন করলে রাষ্ট্র ভয় পায় না। যখন নাগরিক জানে, আজ সে বিরোধী হলেও আগামীকাল রাষ্ট্র তার সুরক্ষা দেবে।
গণতন্ত্র নিখুঁত নয়। কিন্তু এটি সংশোধনের সুযোগ দেয়। বিজয়ের দিনে যদি পরাজিতের মুখেও শান্তি থাকে, যদি কেউ বলতে পারে আমি হেরেছি, কিন্তু রাষ্ট্র হারেনি, তখনই বুঝবেন গণতন্ত্র এসেছে।
ক্ষমতা সাময়িক। নিয়ম স্থায়ী। এই সত্য মেনে নেওয়ার মধ্যেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]
এমআরএম/জেআইএম