ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. প্রবাস

মানুষ, সৃষ্টি ও দায়িত্ব

রহমান মৃধা | প্রকাশিত: ১১:২২ এএম, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এই মহাবিশ্বে আমরা একা নই। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে, দেখা বা না দেখা, জানা বা অজানা, সবই একটি বৃহত্তর সৃষ্টির অংশ। মানুষ, প্রকৃতি, জীবজন্তু, দৃশ্যমান জগৎ ও অদৃশ্য অস্তিত্ব সবকিছু মিলেই এই বিস্তৃত বাস্তবতা। প্রশ্নটি তাই শুধু পৃথিবীকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি পুরো সৃষ্টিজগতকে ঘিরে।

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অর্থ যদি সত্যিই বোঝা যায়, তবে তা কেবল উপাসনার ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের আচরণে, সিদ্ধান্তে, সীমা মানার ক্ষমতায় এবং সৃষ্টির প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

আল্লাহ এই জগত সৃষ্টি করেছেন একটি ভারসাম্যের ওপর। কোরআনের ভাষায় এটি মিজান, একটি সূক্ষ্ম ন্যায়সংগত পরিমাপ। এই ভারসাম্য শুধু প্রকৃতির নয়; এটি নৈতিকতার, দায়িত্বের এবং সীমা মেনে চলার ভারসাম্য। নদী তার সীমা জানে। গাছ জানে কখন পাতা ঝরাতে হয়। জীবজন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেয় না। অদৃশ্য সৃষ্টিরাও তাদের নির্ধারিত সীমার ভেতরেই আল্লাহর আদেশ পালন করে।

এই বিশাল সৃষ্টিজগতে মানুষই একমাত্র সত্তা, যে সীমা ভাঙার ক্ষমতা রাখে। এই ক্ষমতাই তাকে বিশেষ করেছে। এই ক্ষমতাই তাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে।

মানুষকে পৃথিবীতে খলিফা বলা হয়েছে। খলিফা মানে মালিক নয়। খলিফা মানে আমানতদার। এই আমানত শুধু ভূমি বা সম্পদের নয়; এই আমানত সমগ্র সৃষ্টির। যা আমরা দেখি, যা দেখি না। যা বুঝি, যা এখনো আমাদের জ্ঞানের বাইরে।

মানুষের দায়িত্ব শুধু প্রকৃতি বা জীবজন্তুর প্রতিই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মানুষের প্রতিই। অথচ আমরা এখানেই সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হই। আমরা অনেক সময় জেনে বা না জেনে মানুষকে কষ্ট দিই, অপমান করি, আঘাত করি। কিন্তু খুব কমই ভাবি এই আঘাতের জন্য কি আমাদের আরেকবার জন্ম হবে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ নিয়ে।

যদি জানিই যে কাউকে কষ্ট দিয়েছি, তাহলে ক্ষমা চাওয়াটা কি জরুরি নয়। একবার বলা কথা, একবার দেওয়া আঘাত সবকিছু আর ঠিক করা যায় না। অনেক মানুষ চুপ করে থাকে, মেনে নেয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙে যায়। আমরা সবাই ভুল করি, কিন্তু ইচ্ছা করে কষ্ট দেওয়া কখনোই ছোট বিষয় নয়। সময় চলে গেলে সুযোগ আর ফিরে আসে না। তাই কথা বলার আগে, খারাপ আচরণ করার আগে একবার ভেবে দেখা উচিত এই কষ্টটা কেউ হয়তো সারাজীবন বয়ে বেড়াবে।

মানুষের মন ভাঙা খুব সহজ, কিন্তু জোড়া লাগানো প্রায় অসম্ভব। তাই যতটা সম্ভব মানুষের সঙ্গে নরম থাকা উচিত। কারণ শেষমেশ আমাদের মনে থাকবে না আমরা কত বড় কী ছিলাম, মনে থাকবে আমরা কতটা মানুষ ছিলাম।

এই মানুষ হয়ে থাকার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আমাদের দায়িত্ব, আমাদের নৈতিকতা, আর আমাদের বিশ্বাসের আসল মানে। মানুষ হিসেবে আমরা যখন অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখি, ক্ষমা চাইতে জানি, আর নিজের আচরণের দায় নিতে পারি, তখনই আমাদের বিশ্বাস কথার গণ্ডি ছাড়িয়ে জীবনের ভেতরে প্রবেশ করে। এখানেই বিশ্বাসের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়।

যদি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস কেবল মুখের স্বীকারোক্তি হতো, তাহলে পৃথিবী, প্রকৃতি ও প্রাণ আজ এতটা বিপর্যস্ত হতো না। বিশ্বাসের সত্যতা প্রকাশ পায় আচরণে। মানুষ যখন লোভের সীমা মানে না, যখন ক্ষমতার মোহে সৃষ্টিকে ক্ষতবিক্ষত করে, তখন সে শুধু প্রকৃতি ধ্বংস করে না, সে আল্লাহর নির্ধারিত সামগ্রিক শৃঙ্খলাকেই অস্বীকার করে।

কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশ আছে, পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না। ফ্যাসাদ মানে শুধু যুদ্ধ নয়; ফ্যাসাদ মানে ভারসাম্য নষ্ট করা, সীমা লঙ্ঘন করা, দায়িত্ব ভুলে যাওয়া। পরিবেশ ধ্বংস, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার নষ্ট করা সবই এই ফাসাদের অংশ।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন এই দায়িত্ববোধের স্পষ্ট উদাহরণ। তিনি যুদ্ধের সময়ও গাছ কাটতে নিষেধ করেছেন। অকারণে প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। এমনকি বলেছেন, কিয়ামত উপস্থিত হলেও হাতে যদি একটি চারা থাকে, তা রোপণ করো। এই বাণী কোনো আবেগ নয়; এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি। সৃষ্টি রক্ষা ইবাদতের বাইরে কিছু নয়, বরং ইবাদতেরই বিস্তৃত রূপ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। এই বিশাল সৃষ্টিজগতে কে ভাগ্যবান? প্রকৃতি নয়, কারণ তার কোনো বেছে নেওয়ার ক্ষমতা নেই। জীবজন্তু নয়, কারণ তারা দায়মুক্ত। অদৃশ্য সৃষ্টিরাও নয়, কারণ তারা পরীক্ষার বাইরে। ভাগ্যবান হওয়ার সুযোগ শুধু মানুষের।

মানুষই একমাত্র সৃষ্টি, যে চাইলে আল্লাহর আমানতের রক্ষক হতে পারে, আবার চাইলে তার বিনাশের কারণও হতে পারে। মানুষ যখন নিজের অবস্থান বোঝে, সীমা মানে, দৃশ্য ও অদৃশ্য সব সৃষ্টির প্রতি সংযত থাকে, তখন সে আল্লাহর রহমতের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

আর মানুষ যখন ভাবে সবকিছু তার জন্য, তখন সে শুধু পৃথিবী নয়, পুরো সৃষ্টিজগতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। সবচেয়ে গভীর সত্যটি এখানেই।

আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত। আমরা তার সত্তা পুরোপুরি বুঝি না। সময়, সৃষ্টি ও পরিকল্পনার সঙ্গে তার সম্পর্ক আমাদের জ্ঞানের বাইরে। কোরআন নিজেই বলে, তোমাদের সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়। কারণ আল্লাহকে পুরোপুরি বোঝা না গেলেও, তার নির্দেশ মানা যায়। তার রহস্য না জানলেও, তার আমানত রক্ষা করা যায়।
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস মানে শুধু তাকে মানা নয়। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস মানে তার সৃষ্টির প্রতি ভীত শ্রদ্ধা রাখা। যা জানা, যা অজানা, যা দেখা, যা না দেখা সবকিছুর প্রতিই।

এই মহাবিশ্বে মানুষ শ্রেষ্ঠ নয় তার ক্ষমতার কারণে। মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে তার দায়িত্বের কারণে। এই দায়িত্ব পালন করলেই মানুষ ভাগ্যবান। না করলে, এই অসীম সৃষ্টিজগতে মানুষই হবে সবচেয়ে দুর্ভাগা। এটাই সেই সত্য, যা সময় বদলালেও বদলাবে না।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]

এমআরএম/এমএস