ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. প্রবাস

‘আমাকে ক্রীতদাসের মতো দেখা হয়’

প্রবাস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০:৪০ এএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২০২৫ সালে ভারতের চণ্ডীগড়ের বাড়ি ছেড়ে ক্রোয়েশিয়ায় আসেন ডিডি। অবশ্য তিনি জানতেন, বিদেশে শুরুতে রুটিরুজির জোগান করা মুশকিল হবে। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হবে এবং বেতনও কম হবে। কিন্তু কেউ তাকে রাস্তায় দেখে থুতু ছেটাতে পারেন, এ কথা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি ওই ভারতীয়।

২০২৫ সালে দুইবার ২৭ বছর বয়সি ডিডিকে কাজের সময় হেনস্তা করেন একদল যুবক। কেউ কেউ তার দিকে লক্ষ্য করে থুতু ছেটান, কেউ কেউ তাকে ‘নিজের দেশে ফিরে যান’ বলে চিৎকার করেন। সেই সময় তার ডেলিভারি-ব্যাগ চুরি করার চেষ্টাও করা হয়।

ভাগ্যবদলের আশায় ইউরোপে আসা হাজারো মানুষের একজন ডিডি। তবে তার হেনস্তার ঘটনা কিন্তু খুব একটা নতুন নয়। বরং এ ধরনের ঘটনা ক্রোয়েশিয়ায় বেড়েই চলেছে।

ইউরোপের দেশ ক্রোয়েশিয়ায় শ্রমঘাটতি একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে পর্যটন খাতে কর্মী ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মী সংকট থাকার পরও বিদেশি কর্মীরা সহিংসতা এবং শোষণের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ফরাসি সংবাদসংস্থা এএফপিকে ডিডি বলেন, ‘আমি শুধু কাজ করতে এবং শান্তিতে বসবাস করতে এসেছিলাম।’

বিশ্বব্যাংকের মতে, গত দশকে জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাওয়া পাঁচটি দেশের মধ্যে একটি ক্রোয়েশিয়া। গত দশকে দেশটিতে জনসংখ্যা হ্রাসের পরিমাণ প্রায় চল্লিশ লাখ।

এই ঘাটতির কারণে এশিয়া থেকে আসা শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে ক্রোয়েশিয়া ইউরোপের পাসপোর্ট মুক্ত অবাধ চলাচলের শেনজেন অঞ্চলে যোগ দেওয়ার পর থেকে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে।

গত বছর, প্রতি দশজনের মধ্যে চারটি কাজ এবং বসবাসের অনুমতিপত্র পেয়েছেন নেপাল, ফিলিপিন্স, ভারত এবং বাংলাদেশের নাগরিকেরা। তারা বেশিরভাগই পর্যটন, ক্যাটারিং এবং নির্মাণশিল্পে যুক্ত। ক্রোয়েশিয়ার মতো রক্ষণশীল সমাজের জন্য এটা বিরাট পরিবর্তন। কারণ ইউরোপের বাইরে থেকে অভিবাসন এ দেশে খুব একটা বেশি হয়নি।

গত আদমশুমারি অনুসারে, ক্রোয়েশিয়ার ৩৮ লাখ মানুষের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি জাতিগতভাবে সেখানকারই মানুষ অর্থাৎ ক্রোয়াটস, যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক।

ডিডির সহকর্মী ডেলিভারি রাইডারদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। যেখানে অনেকেই প্রায় সাপ্তাহিক হেনস্তা ও হামলার কথা জানান। এর মধ্যে মেরে চোয়াল ভেঙে দেওয়া এবং বুকের পাঁজর ফাটিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে।

যদিও জাতীয় অপরাধের তথ্যে, ভুক্তভোগীদের জাতীয়তার ভিত্তিতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ থাকে না। তবে ২০২৪ সালে নেপালি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ক্রোয়েশিয়ায় নেপালি প্রবাসীদের প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির হারকেও ছাড়িয়ে গেছে।

ভারতীয়, ফিলিপিনো এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে বলে রেকর্ড করা হয়েছে।

খাদ্য সরবরাহকারী সংস্থা ওল্ট জানিয়েছে, ডেলিভারি রাইডারদের হামলা চালায় মূলত সুবিধাবাদী তরুণরা, তবে সে সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয় না।

ইউনিয়নগুলোর মতে, বেশিরভাগ বিদেশিকর্মী বেসরকারি সংস্থা বা নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে আসেন যারা এসব ক্ষেত্রে সাধারণত খুব একটা বেশি সাহায্য করেন না।

কিছু নিয়োগকর্তা অনিরাপদ আবাসনেই থাকতে বাধ্য করেন কর্মীদের। অনেক ক্ষেত্রেই আবাসনে গাদাগাদি ভিড় থাকে।

চাকরি হারানোর ভয়ে নিজের পদবি বলতে চাননি আরেক ডেলিভারি রাইডার হাসান। তিনি বলেন, পাঁচজন পুরুষের সঙ্গে ‘বসবাসের অযোগ্য’ ঘর ভাগ করে নেওয়ার জন্য প্রতি মাসে ২৭০ ইউরো দিতে হয়েছিল।

কেউ ওই বাড়িতে আসতে পারবেন না, এ জাতীয় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিলো। ওই ‘নিয়ম’ লঙ্ঘনের জন্য পূর্ববর্তী নিয়োগকর্তা তাকে বড় অংকের ‘জরিমানা’ করতে পারেন। তিনিই এই ঘর ভাড়া দিয়েছিলেন।

ভারতের ২৭ বছর বয়সী এই যুবক বলেন, ‘এটা পুরো চাঁদাবাজি।’ তাকে সপ্তাহে সাত দিন, দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়েছে। তার কথায়, ‘একেবারে ক্রীতদাসের মতো দেখা হয়।’

অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশটির সাধারণ মানুষের মনোভাব আরও নেতিবাচক হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ইনস্টিটিউট ফর মাইগ্রেশন রিসার্চের (আইএমআর) একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৬০ শতাংশেরও বেশি ক্রোয়েশিয়ান বিদেশি কর্মীদের উপস্থিতিতে অসন্তুষ্ট, যা এক বছর আগে ৪৬ শতাংশ ছিল।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগের মধ্যে অপরাধের হার বৃদ্ধি, স্থানীয় মজুরির ওপর প্রভাব, চাকরি হারানো এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যের আশঙ্কা ছিল।

সমাজবিজ্ঞানী ইভান বালাবানিক বলেন, ‘যখন মানুষ জীবিকা হারানোর ভয় পান, তখন উগ্রবাদী অবস্থানের প্রতি সমর্থনের শঙ্কা আরও বাড়ে।’

বালাবানিক বলেন, রাজনীতিবিদদের এই বিষয়টিকে ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে দেখা বন্ধ করে বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। তার কথায়, ‘এটা বাস্তব পরিস্থিতি এবং এই পরিস্থিতিকে মেনে নিতে হবে।’

কিছু ডানপন্থি রাজনীতিবিদ অভিবাসীবিরোধী বক্তব্যের অংশ হিসেবে এই বিষয়টিকে কাজে লাগাচ্ছে। তারা প্রচার করছেন, বিদেশি কর্মীদের মাধ্যমে ইউরোপীয় জনসংখ্যাকে ‘‌প্রতিস্থাপন’ করার চক্রান্ত হচ্ছে।

বিদেশি কর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নিন্দা করা রক্ষণশীল সরকার সম্প্রতি সুরক্ষা উন্নত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কর্মীদের জন্য ভাষা পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।

ডিডি বলেন, বেশিরভাগ ক্রোয়েশিয়ান ‌‘সাধারণত বন্ধুপরায়ণ’, কিন্তু স্থানীয় ভাষায় কথা বলতে না পারায় তিনি সেখানে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

*ওই ভারতীয় অভিবাসী কর্মীর অনুরোধে তার প্রকৃত নামটি গোপন রাখা হয়েছে। শুধু নামের আদ্যক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।

সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস

এমআরএম