ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত অগ্রগতি
আহমাদ সাব্বির
মানুষ সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই উন্নতি ও অগ্রগতির প্রশ্নে নানা মানদণ্ড নির্মাণ করে এসেছে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে জাতি, রাষ্ট্র ও সভ্যতার অগ্রযাত্রা মূল্যায়নের জন্য মানুষ নির্দিষ্ট কিছু সূচক দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু এই মানদণ্ডগুলো কি প্রকৃত অর্থে সঠিক? নাকি এগুলো মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন?
বর্তমান বিশ্বে উন্নতির সবচেয়ে প্রচলিত মানদণ্ড হলো অর্থনৈতিক শক্তি ও ভোগবাদী সাফল্য। যে জাতি যত বেশি বিত্তশালী, প্রযুক্তিতে অগ্রসর এবং সামরিক ক্ষমতায় শক্তিশালী—তাকে তত বেশি উন্নত ও প্রগতিশীল বলে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্নতির অর্থ দাঁড়ায় সম্পদের পাহাড় গড়া, ক্ষমতার দাপট দেখানো এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করা। কিন্তু এই তথাকথিত উন্নতির পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের রক্ত, শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের ইতিহাস। তবুও বাহ্যিক চাকচিক্যে আচ্ছন্ন মানবসমাজ এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করে।
এই তথাকথিত উন্নত জাতিগুলো যখন তাদের বিত্ত ও ক্ষমতার অহংকারে সীমাহীন অন্যায়, অনাচার ও নৈতিক অবক্ষয়ে লিপ্ত হয়, তখন সেগুলোই ধীরে ধীরে তাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতার অংশে পরিণত হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উন্নতিকামী ও দুর্বল জাতিগুলো এই অবক্ষয়গ্রস্ত জীবনধারাকেই অনুসরণ করতে শুরু করে। তারা মনে করে, শক্তিশালী জাতির মতো হওয়াই অগ্রগতির চূড়ান্ত শর্ত। এখান থেকেই জন্ম নেয় আরেকটি কথিত মানদণ্ড—‘প্রগতিশীলতা’। প্রগতিশীল চিন্তা, প্রগতিশীল সমাজ, প্রগতিশীল প্রজন্ম—এই শব্দগুলো বাস্তবে অনেক সময় অন্ধ অনুকরণেরই পরিশীলিত নাম হয়ে দাঁড়ায়।
এই দুই ধরনের মানদণ্ড—অর্থনৈতিক শক্তি ও অন্ধ অনুকরণ—উভয়ই মানুষের সীমাবদ্ধ চিন্তা ও জ্ঞানের ফল। মানুষ মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের মধ্যেই আবদ্ধ। যা চোখে দেখা যায়, কানে শোনা যায় এবং বাহ্যিকভাবে অনুভব করা যায়—মানুষ তাকেই সত্য ও সাফল্যের চূড়ান্ত রূপ মনে করে। তাই বিত্তের ঝলকানি, ক্ষমতার দম্ভ এবং পরাশক্তির শক্তি প্রদর্শন মানুষের মনকে সহজেই আচ্ছন্ন করে ফেলে। দুর্বল মানবমন এই বাহ্যিক প্রভাবের সামনে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে এবং এগুলোকেই উন্নতি ও অগ্রগতির একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।
যদিও ইতিহাস ও বাস্তবতা প্রমাণ করে যে এই বাহ্যিক অগ্রগতির ভেতর লুকিয়ে আছে অসংখ্য ব্যর্থতা, অশান্তি ও ধ্বংস, তবুও মানুষ সেদিকে তাকাতে সাহস পায় না। কারণ তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ, চিন্তা সংকীর্ণ এবং আত্মিক উপলব্ধি প্রায় অনুপস্থিত। অথচ মানুষের সামনে মুক্তির পথ খোলা ছিল। মানুষ চাইলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের এই সংকীর্ণতা অতিক্রম করে আরও বিস্তৃত ও গভীর এক জ্ঞানজগতে প্রবেশ করতে পারত।
এই বিস্তৃত জ্ঞানজগতের দ্বার খুলে দিয়েছে মহান আল্লাহ প্রদত্ত ওহি। ওহি এমন এক জ্ঞানসূত্র, যা মানুষের দৃষ্টিকে দৃশ্যমান জগতের সীমা ছাড়িয়ে অদৃশ্য ও চিরস্থায়ী সত্যের দিকে নিয়ে যায়। ওহির বাহক হলেন নবী-রাসুলগণ। তাদের মাধ্যমেই মানবজাতি এমন জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছে, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার বাইরে অবস্থিত। নবীগণ মানুষের চিন্তার সীমানা প্রসারিত করেছেন এবং বুঝিয়ে দিয়েছেন যে বাহ্যিক অর্জনই চূড়ান্ত সাফল্য নয়।
ওহির আলোয় মানুষ যখন বাস্তবতাকে দেখতে শেখে, তখন ইন্দ্রিয়নির্ভর চিন্তার সীমাবদ্ধতা তার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন পার্থিব মানদণ্ডগুলো শিশুসুলভ ও হাস্যকর বলে মনে হয়—যেমন একজন পরিণত মানুষের কাছে শিশুর চিন্তা-ভাবনা তুচ্ছ মনে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির সর্বোচ্চ ও পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) শিক্ষা ও আদর্শে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তার উম্মতকে কেবল বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত করতে চাননি; বরং তিনি মানুষের চিন্তার দিগন্তকে আখিরাতমুখী ও আল্লাহকেন্দ্রিক করতে চেয়েছেন। লাভ-লোকসান, হার-জিত, অগ্রগতি ও পশ্চাৎপদতার যে সংজ্ঞা পার্থিব চিন্তায় গড়া হয়েছে, তিনি সেগুলোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তার হাদীস ও কর্মজীবনে বারবার এই সত্য তুলে ধরা হয়েছে যে, প্রকৃত সাফল্য ও অগ্রগামিতা আল্লাহর নৈকট্য লাভের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই প্রসঙ্গে বর্ণিত একটি হাদিস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সফরের সময় বাহিনীর সামনে যারা এগিয়ে যায়, সাধারণ দৃষ্টিতে তারাই অগ্রগামী বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিলেন অন্য এক বাস্তবতার দিকে। তিনি জানালেন, প্রকৃত অগ্রগামী তারা নয় যারা শারীরিকভাবে এগিয়ে গেছে; বরং প্রকৃত অগ্রগামী তারা, যারা আল্লাহর জিকিরে সদা মগ্ন। এই অগ্রগামিতা বাহ্যিক চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু চূড়ান্ত সত্যের বিচারে তারাই সবার আগে।
এই হাদিসের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) অগ্রগামিতার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। এখানে অগ্রসরতা মানে দূরত্ব অতিক্রম করা নয়, বরং আত্মিক উৎকর্ষ অর্জন করা। আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকা, তাঁর পরিচয় লাভ করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্যে অবিচল থাকা—এটাই প্রকৃত অগ্রগামিতা।
আজকের বস্তুবাদী যুগে মানুষ উন্নতি ও প্রগতির নামে যেসব বিষয়কে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করছে, ইসলামের দৃষ্টিতে সেগুলো প্রকৃত অগ্রগতি নয়। বরং এগুলো অনেক সময় আত্মিক অবক্ষয় ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইলমে ওহির আলোয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহকে ভুলে গিয়ে অর্জিত কোনো অগ্রগতি আসলে পশ্চাৎপদতারই আরেক রূপ।
এই ইসলামি মানদণ্ডকে অনেকেই প্রতিক্রিয়াশীলতা বলে আখ্যা দেয়। তারা উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে একে পশ্চাতে যাওয়ার আহ্বান বলে প্রচার করে। কিন্তু যারা ওহির জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত, তারা এসব অপবাদে বিচলিত হয় না। তারা জানে, আল্লাহ পথ দেখানোর পর পশ্চাতে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। শয়তানের দেখানো মরুভূমির পথে ঘুরে বেড়ানোই প্রকৃত পশ্চাৎপদতা।
সুতরাং ইসলামী দৃষ্টিতে অগ্রগামিতা মানে আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণ নয়, কিংবা অর্থ ও ক্ষমতার পেছনে দৌড়ানোও নয়। বরং অগ্রগামিতা মানে আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাওয়া, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং নৈতিক ও আত্মিক উৎকর্ষের পথে অবিচল থাকা। এই পথেই রয়েছে মানুষের প্রকৃত মুক্তি ও চূড়ান্ত সাফল্য।
ওএফএফ