যেভাবে কোরআনে ওয়াকফের ব্যবহার শুরু হয়
মওলবি আশরাফ
প্রাক-ইসলামি যুগে আরবি ভাষায় কোনো যতিচিহ্ন ছিল না। কোথায় থামতে হবে তা আরবরা বাক্যের অর্থ দেখে বুঝতে পারত। পবিত্র কোরআনেও কোনো যবর-যের-পেশ, নোকতা ও ওয়াকফের চিহ্ন ছিল না। কিন্তু যখন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনারবদের সুবিধার্থে যবর-যের-পেশ ও নোকতা যোগ করা হয়। তারও কয়েক শ বছর পরে, খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকের প্রথম দিকে কোরআনে দুই আয়াতের পার্থক্য স্পষ্ট করতে গোলাকৃতির ওয়াকফের ব্যবহার শুরু হয়। এর সূচনা করেন মুহাম্মদ ইবনে তাইফুর আস-সাজাওয়ান্দি (মৃত্যু ১১৬৫ খ্রি.)।
আনুমানিক ৮০১ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শার্লেমাইনের কাছে পাঠানো খলিফা হারুনুর রশিদের কোরআন। এখানে ওয়াকফের কোনো চিহ্ন নেই। ছবি: সংগৃহীত
তিনি ছিলেন তৎকালীন আফগানিস্তানের গজনবি সাম্রাজ্যের একজন বিখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ, কারী ও সুফি। তিনি ‘কিতাবুল ওয়াকফ ওয়া ইবতিদা’ নামে একটি বই লেখেন। তিনি সেখানে ওয়াকফের গুরুত্ব ও সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করেন। শুধু শেষে নয়, আয়াতের মাঝখানেও কোথায় থামা জরুরি কিংবা থামলে ভালো হয়—এর জন্য আলাদা আলাদা চিহ্ন তৈরি করেন। তিনি ওয়াকফকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন:
- লাযিম: থামা না হলে অর্থ অসম্পূর্ণ হয়।
- মুতলাক: থামা ভালো, থামলে অর্থ সুন্দরভাবে স্পষ্ট হয়।
- জায়িয: থামা যায়, তবে না থামলেও সমস্যা নাই।
- মুজাওয়ায: থামা যায়, কিন্তু না থামলেই ভালো হয়।
- মুরাখখাস: আগের বাক্যের সাথে সংযুক্ত, কিন্তু আয়াত লম্বা হলে কিংবা শ্বাস ফুরিয়ে গেলে থামা যায়।
ইবনে তাইফুর আস-সাজাওয়ান্দি তার বইয়ে লাযিম ওয়াকফের জন্য م (মিম), মুতলাকের জন্য ط (ত্ব), জায়িযের জন্য ج (জিম), মুজাওয়াযের জন্য ز (যা), মুরাখখাসের জন্য ص (সোয়াদ) চিহ্ন তৈরি করেন। সেই সাথে যেখানে থামা যাবে না সেখানে لا (লা) এবং সতর্কতার জন্য ق (ক্বফ) চিহ্ন—এভাবে সাতটি চিহ্ন প্রচলন করেন। তার বই খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে, এবং সব ধরনের হস্তলিখিত কোরআনে এই চিহ্ন ব্যবহৃত হতে শুরু করে। (Nematov Jahongir Tulqinovich, The History of the Emergence and Development of Waqf Symbols in the Quran Manuscripts)
তার এই সংযোজনের পরে আবুল আলা আত্তার, আবুল ফজল আর-রাজি ও অন্যান্য ব্যক্তিগণ আরও নানা রকমের চিহ্ন ও ওয়াকফের ধারণা দেন।
তবে বিশেষভাবে গোলাকৃত ওয়াকফ নিয়ে লোকমুখে আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে পারস্যে মানি (২১৬-২৭৪ খ্রি.) নামক এক লোক ছিলেন, যিনি পারস্যে প্রচলিত জরথুস্ত্রধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম থেকে উন্নততর নতুন এক ধর্ম তৈরির চেষ্টা করেছিলেন—যাকে Manichaeism বলা হয়। মানি ছিলেন শিল্পকর্মে ওস্তাদ। তিনি সিরীয় ভাষায় যে বইগুলো লিখে গেছিলেন, তা ছিল অলংকরণে পূর্ণ। পরবর্তীতে মানিধর্মের অনুসারীরাও একই নীতি অনুকরণ করে, পৃষ্ঠার চারপাশে ফুল-পাখি-লতাপাতা ও স্বর্ণ-রুপার কালির ব্যবহার শুরু করে। এই মানিধর্মের অনুসারীরা তাদের লেখায় যতিচিহ্নের ব্যবহার শুরু করে, এবং বাক্যের শেষ বোঝাতে লাল রঙে গোলাকৃতির চিহ্ন দিত। মুসলমানরা তাদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ঠিক সেই রকম গোল চিহ্নের ব্যবহার শুরু করে।
বর্তমানে ওয়াকফ কেবল সৌন্দর্য নয়, বরং প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ওয়াকফ ছাড়া কোরআনের কথা ভাবাই যায় না।
ওএফএফ