রংপুরে কবির মরদেহ ভাইরাল, ছড়াচ্ছে ভুল তথ্য
ফাইল ছবি
রংপুরে বেড়াতে গিয়ে মারা গেছেন কবি ও সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান নিজামী। তার মরদেহের একটি ছবি ও ভিডিওকে ঘিরে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, কবির মরদেহ পড়ে আছে রাস্তায়। তার পাশে নেই আত্মীয়-স্বজন। মূলত মেডিকেল কলেজ থেকে লাশ মর্গে নেওয়ার সময় ছবিটি কেউ তুলেছেন বা ভিডিও করেছেন। পরে মনগড়া তথ্য দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করে সবাইকে বিভ্রান্ত করছেন।
জানা যায়, ৫ মার্চ সকালে রংপুরের তারাগঞ্জে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি তারাগঞ্জে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হতে রংপুরের দিকে আসার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে স্থানীয় দুজন হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তবে মৃত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জানান সেখানকার দায়িত্বরতরা।
রংপুরের সাংবাদিক ফরহাদুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘নিজামী রংপুরের তারাগঞ্জে প্রায়ই বেড়াতে আসতেন। বৃহস্পতিবার সকালে তারাগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাস ধরার জন্য বের হন। এ সময় অসুস্থ হলে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘মারা যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পর আমরা বিভিন্ন মারফতে জানতে পারি। মাহমুদুল হাসান নিজামী সকালে যখন মারা যান; তখন তার পাশে পরিচিত কেউ ছিল না। রংপুরের কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরা তার মৃত্যুর খবর জানতে পেরে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ মর্গে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আজ সকালে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
মাহমুদুল হাসান নিজামীর মরদেহ নিয়ে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন তথ্য ছড়াচ্ছেন, বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো সামঞ্জস্য নেই। অহেতুক মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এবং কবির পরিবারকে হেয় করার জন্য এমন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বরং তাকে কোনো ধরনের অবহেলা ছাড়াই চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। স্বজনদের খবর জানানো হয় এবং স্বজনরা আসা পর্যন্ত লাশ মর্গে রাখা হয়।
ফেসবুক পোস্টে কেউ কেউ লিখেছেন, ‘ফেসবুক ভরে গেছে শোকে কিন্তু কবির নিথর দেহটা কি সাংঘাতিক অবহেলায় হাসপাতালের বাইরের রাস্তায় পড়ে ছিল, কেউ ছিল না পাশে, পথচারীরা জানেও না এটা কার লাশ, যে যার মতো খুলে মুখের কাপড় সরাচ্ছে। শুনেছি তার পরিবার নাকি লাশ নিনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, কেন, তা জানি না। তবে একটা কবির লাশের এতটা নির্মম অবহেলা সহ্য করার মতো না!’
কবি রফিকুল ইসলাম সাবুল লিখেছেন, ‘মোবাইল করছেন যিনি, তার নাম রাশেদুল, বাসা আলমপুর তারাগঞ্জ। নিজামী ভাইকে তিনি নিয়ে আসেন মেডিকেলে। আমি ঢাকা থেকে ফোন পেয়ে বিকাল ৩টায় মেডিকেলে পৌঁছালে তার সঙ্গে দেখা হয়। পরবর্তীতে আর দেখা হয়নি। পরে জানতে পারি, তার মোবাইল নাম্বার ও ঠিকানা দিয়ে তিনি বাসায় চলে গেছেন। বিস্তারিত আমি অবগত করছি।’
তিনি লিখেছেন, ‘রংপুরের কোনো লেখক যদি জানতেন তিনি রংপুরে এ অবস্থায়, তাহলে সবাই ছুটে আসতেন। আমি এবং রাজ ভাই শোনার পর তখন থেকে তার পাশে আছি। আপনারা বাস্তবতা না জেনে রংপুরের লেখকদের দোষারোপ করছেন। আগে জানতে হবে তিনি কেন রংপুরে?’
অন্য একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘গণমাধ্যমের তোলা ভিডিওটি সকালে যখন মরদেহ মর্গে নিয়েছিল তখনকার। আমি অদ্য বেলা ৩টার সময় এসে গণমাধ্যমকর্মীর কাছ থেকে নিয়ে আপলোড করি। ওনার মরদেহ বরফজাত করে মর্গে রাখা আছে। আমি এখনো মর্গের সামনে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘কবি গবেষক মাহমুদুল হাসান নিজামীর মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে বরফজাত করে রাখা আছে, ওনার সন্তান চট্টগ্রাম থেকে রওয়ানা হয়েছেন।’
নিঃসন্দেহে বলা যায়, স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরা তার পাশে ছিলেন। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা পর্যন্ত তারা পাশেই ছিলেন। ফলে ঘটনাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। একটি ছবি কিংবা ক্ষণিকের ভিডিও সব সময় মূল ঘটনার সাক্ষ্য হতে পারে না। ফলে অনেকেই এমন বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
- আরও পড়ুন
হঠাৎ কেন আলোচনায় এহছানুল হক মিলন
মাহমুদুল হাসান নিজামীর লেখা ৫ হাজারের বেশি কবিতা-গান আছে। এখন পর্যন্ত তার প্রকাশিত বই ১৪০টি। কবিতা, ছড়া, ইতিহাস ও গবেষণাসহ বিশ্ব সাহিত্যের শেখ সাদী, ফরিদ উদ্দিন আত্তার ও ইমরুল কায়েসের কবিতাগুলোর বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম কাব্যানুবাদ তাকে অনন্য করে তুলেছে।
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পর আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংরেজিসহ বহু ভাষা জানা মানুষ মাহমুদুল হাসান নিজামী ছাড়া দ্বিতীয়জন পাওয়া দুষ্কর। বহু ভাষার অলংকারে মাহমুদুল হাসান নিজামীর লেখা কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যে নবসংযোজন সৃষ্টি করেছে। জাতীয় কবিতা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান নিজামী বাংলা সাহিত্য ও বানান সংস্কারের নবধারা তৈরিতে অনিবার্য প্রাণপুরুষ। তিনি জাতীয় সাংবাদিক মঞ্চের সভাপতি ছিলেন।
মাহমুদুল হাসান নিজামী ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার কালাপানিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম মাওলানা আবদুল্লাহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। মা মরহুমা মায়মুনা খাতুন গৃহিণী ছিলেন। মাহমুদুল হাসান নিজামীও নিজ এলাকার স্কুল-কলেজসহ অসংখ্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা।
এসইউ