নির্বাচনের মাসে লাগামছাড়া ভুল তথ্য, দিনে গড়ে ৩৩টি শনাক্ত
ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৯২৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার, ছবি: বিজ্ঞপ্তি
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৯২৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার, যা এ যাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্তের পরিমাণ।
রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ৬৫৬টি প্রতিবেদন ও পাঁচটি লাইভ আপডেটের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে অপতথ্যের প্রবাহ বৃদ্ধি প্রভাব রেখেছে ফেব্রুয়ারির সামগ্রিক ভুল তথ্যের পরিমাণ বৃদ্ধিতে। গেল মাসে দিনে গড়ে প্রায় ৩৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্লেষণ বলছে, ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (৮০৯) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৮৭ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৪৮টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ২০টি, খেলাধুলা বিষয়ে ১১টি, ধর্মীয় বিষয়ে ১৪টি, বিনোদন বিষয়ে ৭টি এবং শিক্ষা বিষয়ে ৫টি ও প্রতারণা বিষয়ে ১১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত মাসে।
এসব ঘটনায় তথ্য কেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ৬০৬টি। এছাড়া ভিডিও কেন্দ্রিক ভুল ছিল ২২০টি এবং ছবি কেন্দ্রিক ভুল ছিল ৯৯টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ৬২০টি, বিকৃত ২৪৫টি, বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৬০টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে পুরুষদের জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে ৭২৭টি এবং নারীদের জড়িয়ে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ১৩৩টি।
একই সময়ে বয়সের ধরণ অনুযায়ী পুরুষ ও নারীদের চারটি করে ভাগে ভাগ করা হয়েছে ভুল তথ্যগুলোকে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষদের মধ্যে শিশুদের নিয়ে ২টি, যুবদের নিয়ে ১২৮টি, মধ্যবয়সীদের নিয়ে ১৫৬টি এবং প্রবীণদের নিয়ে ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া, নারীদের মধ্যে শিশুদের নিয়ে ২টি, যুবদের নিয়ে ৫৫টি, মধ্যবয়সীদের নিয়ে ৪১টি এবং প্রবীণদের নিয়ে ৩৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
প্লাটফর্ম হিসেবে এ মাসে ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সংখ্যার হিসেবে যা ৮২০টি। এছাড়া ইনস্টাগ্রামে ১০৫টি, ইউটিউবে ৪০টি, এক্সে ১৭টি, টিকটকে ১৪৮টি ও থ্রেডসে অন্তত ১০টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ১৭টি ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে ৪টি।
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি গেল বেশ কয়েক মাস ধরে আলোচনায়। ফেব্রুয়ারিতে ১২টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ৮টি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গত মাসেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নিয়ে বেশ আলোচনা চলছিল সর্বত্র। গেল বেশ কয়েক মাসে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপতথ্যের প্রচার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এ সংক্রান্ত ৪৯১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে গণভোট নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ১৯টি অপতথ্য। সবমিলিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই নির্বাচনকে জড়িয়ে ১ হাজার ৭১টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শপথ নেওয়ার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছে নতুন সরকার। প্রথম ১২ দিনেই এই সরকারকে জড়িয়ে ৬৩টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে জড়িয়ে ২৮টি অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৬১ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রীদের নিয়ে ২৯টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৭টি, সবগুলোতেই নেতিবাচক উপস্থাপন) শিকার হয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রিউমর স্ক্যানার টিমের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে জড়িয়ে ১২টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। একই সময়ে বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িয়ে প্রচার হয়েছে ২৯টি ভুল তথ্য। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সবমিলিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সরকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জড়িয়ে ৮৮৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
রিউমর স্ক্যানার ফেব্রুয়ারি মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, এই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৪৮০টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ১৬১টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এছাড়া, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে ১৫৭টি অপতথ্য (প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক উপস্থাপন) প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রদলকে জড়িয়ে এই সময়ে ২১টি ও যুবদলকে জড়িয়ে ৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ফেব্রুয়ারিতে ২৬৪টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ১৩৫টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। একই সময়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ৫১টি অপতথ্য (প্রায় ৮০ শতাংশই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ৩৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এছাড়া, ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৭৯টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে ১৪টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়েও ৬টি অপতথ্য (সবগুলোই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে ১৩৫টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে ৬৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে যার প্রায় ৫৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এই সময়ে ৩১টি অপতথ্য (প্রায় ৬৮ শতাংশই ইতিবাচক) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
ভুল তথ্যের রোষানল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোও। ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে জড়িয়ে ১০টিসহ এই বাহিনীকে নিয়ে ৪৭টি ভুল তথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার, যা বাহিনীটিকে নিয়ে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ শনাক্তের পরিমাণ। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়ে ২৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। একই সময়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, র্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে জড়িয়ে একটি করে ভুল তথ্যের প্রচার দেখা গেছে।
ফেব্রুয়ারিতে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ৮৯টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে ১৪টি।
ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ৭টি ঘটনা বা ইস্যুতে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। এর মধ্যে এপস্টিন ফাইলস ইস্যুতে ১৩টি, ইনকিলাব মঞ্চের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ইস্যুতে ১২টি, ডা. শফিকুরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক দাবি ইস্যুতে ১১টি, শহীদ দিবসকে নিয়ে ৮টি ভুল তথ্যের প্রচার ছিল।
গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচারের পরিমাণ আবার বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে এই পদ্ধতির ব্যবহার করে ৩০৬টি ঘটনায় দেশ-বিদেশি ৪৭টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ৩১২টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এমএমএআর