সবই আছে, তবু কিছু নেই
সন্ধ্যা ৬টায় ম্যাচ, পৌনে পাঁচটায় কনসার্টও শুরু হয়ে গেলো! আলো, শব্দ আর আয়োজন—সব মিলিয়ে মনে হওয়ার কথা ছিল ক্রিকেটের এক উৎসবমুখর সন্ধ্যা। কিন্তু গ্যালারির দিকে তাকালেই উৎসবের সেই অনুভূতি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। বিস্ময় জাগে, হতাশা ছুঁয়ে যায় মন। বাংলাদেশের শীর্ষ ক্রিকেটাররা মাঠে, ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে, বিনোদনের সব উপকরণই যেন সাজানো।
বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার ফাঁকা সময়ে দেশের সেরা তারকাদের তিন দলে ভাগ করে আয়োজন করা হয়েছে অদম্য টি–টোয়েন্টি কাপ। সবকিছুই আছে—ক্রিকেট, তারকা, আয়োজন, প্রচার। অথচ যে উপাদানটি ছাড়া ক্রিকেট কখনোই সম্পূর্ণ হয় না, সেই দর্শকই নেই।
আজ (শনিবার) টুর্নামেন্টের তৃতীয় দিন। এখন পর্যন্ত যা যা দরকার একটি জমজমাট টি–টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের জন্য, সবই দেখা গেছে। কিন্তু গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার সেই আবেগ, চিৎকার, উচ্ছ্বাস—সবই অনুপস্থিত। হাতে গোনা কয়েকজন দর্শকের সামনে খেলতে হচ্ছে দেশের সেরা ক্রিকেটারদের। ক্রিকেট মাঠে বল আর ব্যাটের লড়াই যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি দর্শকের উপস্থিতি। দর্শক ছাড়া ক্রিকেট কেবল একটি ম্যাচ—উৎসব নয়, আবেগ নয়, গল্পও নয়। তাই বলতেই হয়, অদম্য টি–টোয়েন্টি কাপে সবই আছে, তবু কিছু নেই।
নিরাপত্তা ইস্যুতে চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি বাংলাদেশ। ফাঁকা সময়ে ৪ দিনের অদম্য টি-টোয়েন্টি কাপ আয়োজন করেছে বিসিবি। গুঞ্জন আছে, বিশ্বকাপে না যাওয়ায় ক্রিকেটারদের ক্ষতিপূরণ ইস্যুতে এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাবদই আড়াই কোটি টাকার বেশি খরচ করছে বিসিবি। টুর্নামেন্টকে জমকালো করতে আয়োজনের অভাব নেই।
প্রতি ম্যাচের দিন ম্যাচ শুরুর আগে হচ্ছে কনসার্ট। উদ্বোধনী দিনে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ম্যাচের আগে গান গেয়েছে জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ। গতকাল (শুক্রবার) খেলার আগে মঞ্চ মাতিয়েছেন মিলা। আর আজ এসেছিলেন মাইলস। প্রথম দুদিনের মতো আজও গ্যালারি ছিল মরুভূমির মতো। দেশের শীর্ষ ব্যান্ড, শীর্ষ গায়কদের কনসার্ট অথচ দেখার কেউ নেই।
অবশ্য মূল জিনিস, ক্রিকেট দেখার লোকই তো পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের শীর্ষ ব্যান্ড, শীর্ষ শিল্পীদের লাইভ কনসার্ট—তবু দেখার কেউ নেই। আসলে মূল সমস্যা এখানেই—ক্রিকেটই যখন দর্শক টানতে পারছে না, তখন কনসার্ট দিয়ে কীভাবে প্রাণ ফেরানো যাবে গ্যালারিতে?
সাধারণত দর্শকদের উন্মাদনাই শিল্পীদের পারফরম্যান্সে প্রাণ যোগায়। এদিন হামিনও বারবার দর্শকদের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকশনের চেষ্টা করেছেন—হয়তো পেশাদারিত্বের দায়েই। তবে তাতে খুব একটা সাড়া মেলেনি। কারণ চারপাশের বিশাল গ্যালারিতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা দর্শকের সংখ্যা তখনও তিনশ’র বেশি নয়।
মাইলস, ওয়ারফেজ বা মিলা, এর আগে এমন পরিবেশে কেউ পারফর্ম করেছেন কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। একটু খোঁজ করলে না উত্তর আসার সম্ভাবনাই বেশি। শনিবার যখন ‘নীলা তুমি...’ দিয়ে শুরু করেন মাইলসের ভোকাল হামিন আহমেদ, গ্যালারিতে সর্বসাকুল্যে দর্শকের সংখ্যা ছিল দুইশোর কিছু বেশি। আর ফ্রি গ্যালারি (ক্লাব হাউস) যোগ করলে তিনশ ছুঁই ছুঁই।
এরপর ‘ধিকি ধিকি, নিঃস্ব করেছো আমায়’সহ আরও একাধিক জনপ্রিয় গান গেয়েছেন হামিন। স্টেজের আশেপাশে জনা ত্রিশেক সিকিউরিটি ছিলেন। তাদের মধ্যেই একজন বলে উঠলেন, ‘কারা শুনছেন গান?’ সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে জন উত্তর দিলেন ‘কেন, আমরাই শুনছি।’ এরপর অট্টহাসিতে মেতে উঠলেন সবাই। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা তখন আরও স্পষ্ট।
এর সঙ্গে ছিলেন গোটা পঞ্চাশের মতো সাংবাদিক। তারাই যা হামিনকে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে সেটাও অনেক দূর থেকে হওয়াই খুব একটা লাভজনক হয়নি। তবে এর মধ্যে কিছুটা বিনোদন দিয়েছেন দুরন্ত একাদশের ক্রিকেটাররা। হুট করে সবাই একসঙ্গে এসে মঞ্চের ঠিক সামনেই ওয়ার্মআপ করা শুরু করেন তারা। ৫ মিনিটের মতো তারা সেখানে ছিলেন এরপর চলে যান।
প্রতিদিন কনসার্ট, ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের পুরস্কার মটরসাইকেল শো করা। বিপিএল, আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য যত আয়োজন তার সিংহভাগই আছে এই টুর্নামেন্টে। অনেক ক্ষেত্রে বিপিএলেও যা নেই তা আছে এই অদম্য টি-টোয়েন্টি কাপে। তবু দর্শক টানতে পারছে না বিসিবি।
ক্লাব হাউসের দুই পাশ শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে। পুরো মাঠের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি দর্শকই দেখা যায় সেখানে। যদি সংখ্যাটা খুবই নগণ্য!।
বলা হয়, যে কোনো খেলাধুলার প্রাণ হলো দর্শক। যত আয়োজনই থাকুক, যত আলো–ঝলমলই হোক; গ্যালারিতে দর্শক না থাকলে সবই অর্থহীন। অদম্য টি–টোয়েন্টি কাপে তাই সত্যিই সবই আছে, তবু সবচেয়ে জরুরি জিনিসটাই নেই।
এসকেডি/এমএমআর