শেষ ম্যাচে কি দেখা মিলবে প্রথম ওয়ানডের বাংলাদেশের?
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের যেন এখন একই অঙ্গে দুই রূপ। প্রথম দিন দেখে মনে হলো টাইগাররা টগবগ করে ফুটছেন। নাহিদ রানা, মেহেদী হাসান মিরাজ, তানজিদ হাসান তামিম, নাজমুল হোসেন শান্তদের দুর্বার পারফরম্যান্সের সামনে রীতিমত পর্যুদস্ত হয় পাকিস্তানিরা। নাহিদ রানার ২৪ রানে ৫ উইকেট, মিরাজের ৩ উইকেট এবং তানজিদ তামিমের টি-টোয়েন্টি মেজাজের হার না মানা ফিফটি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে ১১ মার্চ শেরে বাংলায় প্রথম ওয়ানডেতে দাঁড়াতেই পারেনি পাকিস্তানিরা। হেরেছে ৮ উইকেটে, খেলা শেষ হয়েছে ২০৯ বল আগে। পাকিস্তানের ১১৪ রান তাড়া করে বাংলাদেশ মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে ১৫ ওভারের মধ্যেই খেলা শেষ করে দেয়।
অমন এক আলো ছড়ানো পারফরম্যান্স, উজ্জীবিত নৈপুণ্য এবং দুর্দান্ত জয়ের পর মনে হয়েছিল আকাশছোঁয়া আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে পাকিস্তানকে দ্বিতীয় ম্যাচে হারাবে মিরাজের দল, এক ম্যাচ আগেই জিতবে সিরিজ। কিন্তু হায়! মাঠে তার উল্টোটা ঘটলো। প্রথমেই উইকেট চিনতে ভুল করা। প্রথম দিন হার্ড ট্র্যাকে নাহিদ রানা থ্রি-কোয়ার্টার লেন্থ থেকে বারবার বল ঠুকে পাকিস্তানিদের বিভ্রান্ত করেছেন, তারা বলের উচ্চতা এবং মুভমেন্টে পরাস্ত হয়েছেন। লাফিয়ে ওঠা বল ঠিকমতো মাটিতে নামিয়ে খেলতে পারেননি, কেউ পয়েন্টে কিংবা কেউ শর্ট লেগে ক্যাচ দিয়েছেন।
কিন্তু গতকাল সেই একই মাঠের পাশের পিচে সবুজ অংশ বেশি থাকায়, অর্থাৎ ঘাস বেশি থাকায় বাংলাদেশের ফাস্ট বোলারর বল করেছেন গুড লেন্থ স্পটের কাছাকাছি। ভেবেছিলেন সবুজ উইকেটে গুড লেন্থে বল করলেই বোধহয় ব্যাটারকে সুইংয়ে পরাস্ত করা যাবে, বল ব্যাটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে কিংবা ভেতরে আসবে। কিন্তু সে আশায় গুঁড়ে বালি। সে অর্থে উইকেটে কোনো মুভমেন্ট ছিল না। কাল শুক্রবারের উইকেটটি ছিল ফ্ল্যাট, সে উইকেটে বাংলাদেশের নাহিদ রানা নিজেকে খুঁজে পাননি।
উইকেটের সহায়তার আশায় প্রথম দিনের তুলনায় শর্ট বল কমিয়ে ভালো লেন্থে বল ফেলতে গিয়ে অকাতরে মাজ সাদাকাত আর সালমান আগার কাছে মার খেয়েছেন এ দীর্ঘদেহী ছিপছিপে ফাস্ট বোলার।
তাসকিনের অবস্থাও তথৈবচ। উইকেটের সহায়তা না পেয়ে মোস্তাফিজও কিছুই করতে পারেননি। কাটার মাস্টারের বলেও কোনো ধার চোখে পড়েনি।
অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ তার অফস্পিন দিয়ে চেষ্টা করেছেন। ২টি উইকেটও পেয়েছেন। লেগি রিশাদ হোসেন ৩ উইকেট পেলেও রানগতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। বাংলাদেশের ৫ বোলারের মধ্যে মিরাজ ছাড়া সবাই আলগা বল করায় পাকিস্তানিরাও পৌঁছে যায় পৌনে তিনশ’তে।
কিন্তু ওই ২৭৫ রান তাড়া করতে গিয়ে বাংলাদেশের যে ব্যাটিংটা হলো, তা ছিল চরম হতাশার এবং গ্লানির। একজন ব্যাটারও দায়িত্ব নিয়ে খেলেননি, খেলার চেষ্টাও করেননি। লক্ষ্যের আশপাশ দিয়েও তারা যেতে পারেননি। নিজের মতো করে খেলেছেন।
তানজিদ তামিম উইকেটের গতি এবং বাউন্স না ঠাওরাতে পেরে, তাকে ট্র্যাপ করা হয়েছে জেনেও ডিপ স্কয়ার লেগের উপর দিয়ে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন। সাইফ হাসান সোজা ব্যাটে খেলা যেন ভুলেই গেছেন। ক্রস খেলাই যেন তার এখন ব্যাটিংয়ের সহজাত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই কালকেও সফল হননি। নাজমুল হোসেন শান্ত প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে কালকে জায়গায় দাঁড়িয়ে বোল্ড হয়েছেন।
লিটন দাসের ইনিংসটাও বলার মতো ভালো ছিল না। তাওহিদ হৃদয় খানিকক্ষণ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তার ব্যাটিংয়ের গতি এবং রান তোলার স্ট্রাইক রেট ছিল খুবই মন্থর ও কম। অনেকদিন পর দলে ফিরে আফিফ হোসেনও প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি। তার ব্যাট থেকেও রান আসেনি। সব মিলিয়ে অধিনায়ক মিরাজও ব্যাটে ব্যর্থ হয়েছেন। সব মিলিয়ে ব্যাটিং-বোলিং ব্যর্থতার এক চরম নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকল ১৩ মার্চ শেরে বাংলায় বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের ম্যাচটি।
প্রথম দিন চরমভাবে পর্যুদস্ত পাকিস্তানিরা। দ্বিতীয় দিন উল্টো বাংলাদেশকে বিরাট ব্যবধানে হারিয়ে সিরিজে দাপটে ফিরে এসেছে। এখন দেখার বিষয় আগামীকাল তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে কী হয়। তিন ম্যাচের এই সিরিজের শেষ ম্যাচটি রূপ নিয়েছে সিরিজ নির্ধারণী লড়াইয়ে। অর্থাৎ রোববার শেরে বাংলায় যে জিতবে, সেই দলই এই চলতি সিরিজের বিজয়ী হবে।
বাংলাদেশকে অবশ্যই জিততে হলে তাদের সামর্থ্যের সেরাটা দিতে হবে, বোলারদের দায়িত্বটা যথাযথভাবে পালন করতে হবে, ব্যাটারদেরও লক্ষ্য যাই থাকুক সেই অনুযায়ী ব্যাট করতে হবে। ২৭৫ করতে গিয়ে এলোমেলো ব্যাট চালিয়ে শুরুতে তিন উইকেট হারিয়ে ফেললে আর ম্যাচে ফেরা যায় না। কালকেও ঠিক তাই হয়েছে।
যদিও বৃষ্টি চলে আসায় বাংলাদেশের ওভারপিছু রানের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেড়ে যায় এবং টার্গেটটাও (৩২ ওভারে ২৪৩) বাংলাদেশের জন্য বেশি হয়ে যায়। কারণ বৃষ্টির আগে বাংলাদেশ তিন উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল। এই সমস্ত ক্ষেত্রে ডিএল মেথডে বৃষ্টি শুরুর আগে ব্যাটিংয়ে থাকা দল শুরুতে বেশি উইকেট হারালে রানের মাত্রাটা বেশি থাকে, ওভার তুলনামূলক কমে যায়। ওই বেড়ে যাওয়া টার্গেট ছুঁতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশ।
এখন রোববার জিততে দরকার প্রথম দিনের মতো একটি বা দুটি ব্যক্তিগত অবিস্মরণীয় সাফল্য। এখন দেখা যাক রোববার শেষ ম্যাচে আবার প্রথম খেলার বাংলাদেশের দেখা মেলে কিনা।
এআরবি/এমএমআর