রোমাঞ্চকর ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ
মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে টানটান উত্তেজনার এক ম্যাচে পাকিস্তানকে ১১ রানে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে নিল বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান তামিমের অভিষেক সেঞ্চুরি এবং তাসকিন-নাহিদ রানার তোপ দাগানো বোলিংয়ের পর শেষ ওভারের স্নায়ুযুদ্ধে রিশাদ হোসেনের বীরত্বে জয় নিশ্চিত করে টাইগাররা। এই জয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টপকে ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বরে উঠে এল বাংলাদেশ।
রোববার সিরিজ নির্ধারণী এই ম্যাচে জয়ের পথে কাটা হয়ে থাকা সালমান আলী আঘাকে তাসকিন উপড়ে ফেলার পর মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের জয়টা সময়ের ব্যাপার। শেষ দুই ওভারে প্রয়োজন ছিল ২৮ রান। তবে ৪৯তম ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানকে দুই ছক্কা মেরে টাইগার শিবিরে ভয় ধরিয়েছিলেন পাকিস্তান অধিনায়ক শাহিন। এমনকি ওভারের পঞ্চম বলে শাহিনের শটেই মারাত্মকভাবে আহত হওয়া ফিজ, ওভার শেষ করতে পারবেন কিনা তা নিয়েও দেখা দেয় শঙ্কা। কিন্তু ফিজ ফিরে শেষ বল তো করলেনই হারিস রউফের উইকেটও তুলে নেন।
ফলে শেষ ওভারে সমীকরণ দাঁড়ায় ১৪ রানের। ৩ পেসারের কোটা শেষ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে লেগ স্পিনার রিশাদ্কেই আক্রমণে আনতে হয়। যিনি আগের ৬ ওভারে দিয়েছিলেন ৫৪ রান। তবে শেষ ওভারে দারুণভাবে ফিরে আসেন তিনি। যদিও ওভারের দ্বিতীয় বলেই উইকেট ম্যাচ শেষ করতে পারতেন, তবে নিজেই ক্যাচ ফেলেন। তারপরও ১৩ রান ডিফেন্ড করতে গিয়ে রিশাদ খরচ করেন মাত্র ২ রান। আর পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা ম্যাচে ১১ রানের রোমাঞ্চকর জয়ে সিরিজ নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ।
এর আগে তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি ও বাকিদের ছোট ছোট ইনিংসে বড় সংগ্রহই পেয়েছিল বাংলাদেশ। তাসকিন আর নাহিদ রানার তোপের ফিল্ডিংয়েও শুরুটা হয় দুর্দান্ত। তবে সালমান আলী আঘা একদিক সামলে রেখে পাকিস্তানকে জয়ের দিকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন। ৪৭তম ওভারে সেঞ্চুরি করা এই ব্যাটারকে তুলে নেন তাসকিন আহমেদ। তবে শেষদিকে ম্যাচ জমিয়ে তোলেন শাহিন শাহ আফ্রিদি। যদিও শেষ ওভারে রিশাদের ঘূর্ণিতে ১৪ রানের হিসেব মিলাতে পারেনি পাকিস্তান।
রান তাড়ায় শুরুতেই বিপদে পড়ে পাকিস্তান। ১৭ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারায় তারা। আগের ম্যাচের ম্যাচসেরা মাজ সাদাকাতকে তুলে নেন নাহিদ রানা। আর সাহিবজাদা ফারহান ও মোহাম্মদ রিজওয়ানকে ফেরত পাঠান তাসকিন আহমেদ। এরপর গাজী ঘড়ি ও আব্দুল সামাদ মিলে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেন। ১০ ওভারের পাওয়ার প্লেতে ৩ উইকেট হারিয়ে ৪১ রাব তোলে পাকিস্তান। তবে তাদের জুটিও বেশিক্ষণ টিকতে দেয়নি বাংলাদেশ। দলীয় ৬৭ রানে ঘড়ির উইকেট তুলে ৫০ রানের জুটি ভাঙেন নাহিদ রানা। ২৫ রানের ব্যবধানে আরেক সেট ব্যাটার মাসুদের উইকেট তুলে নেন মোস্তাফিজুর রহমান।
৮২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানের হাল ধরেন সালমান আলী আঘা ও সাদ মাসুদ। দুজনে মিলে পাকিস্তানের চাপ বাংলাদেশকে ফেরত দিতে থাকেন। ২১তম ওভারে পাকিস্তানের দলীয় শতরান পূর্ণ হয়। ৩২তম ওভারে এই দুজনের ৭৯ রানের জুটি ভাঙেন তাসকিন আহমেদ। ফেরার আগে ৪৪ বলে ৩৮ রান করেন মাসুদ। অন্যপ্রান্তে বাকিরা নিয়মিত বিরতিতে ফিরলেও একপ্রান্ত আগলে ছিলেন সালমান। রিশাদকে লং অফের ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে ফিফটি পূর্ণ করেন এই ডানহাতি ব্যাটার।
বাংলাদেশের মতো ৩৮তম ওভারে দুই শর মাইলফলক স্পর্শ করে পাকিস্তানও। পার্থক্য হচ্ছে বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তান ৩ উইকেট বেশি হারিয়েছে। শেষ ১০ ওভারে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৮০ রান। ৮৯তম বলে নাহিদ রানাকে ছক্কা মেরে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন সালমান। তার ব্যাটেই এগোতে থাকে পাকিস্তান। শেষ ৫ ওভারে সমীকরণ দাঁড়ায় ৪৫ রানের। ৪৮তম ওভারে সালমানকে দারুণ এক স্লোয়ারে বিদায় করে বাংলাদেশকে স্বস্তি এনে দেন তাসকিন আহমেদ। ফেরার আগে ১০৬ রান করেন সালমান। ৯৮ বলের ইনিংসে ৯ চার ও ৪ ছক্কা হাঁকান এই ডানহাতি ব্যাটার। শেষদিকে শাহিন শাহ আফ্রিদি মোস্তাফিজকে দুই ছক্কা মেরে ম্যাচ জমালেও শেষ ওভারে বাজিমাত করেন রিশাদ হোসেন।
এর আগে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের শুরুটা দুর্দান্ত করেন দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম। পাওয়ার প্লের ১০ ওভারেই স্কোরবোর্ডে জমা হয় ৫০ রান। দলীয় ১০৫ রানে সাইফের বিদায়ে ভাঙে ওপেনিং জুটি। ৫৫ বলে ৩৬ রান করে ফেরেন সাইফ। ৪৭ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন তামিম। এরপর দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে নতুন জুটি গড়েন তামিম। যদিও রানের গতি অনেকটাই কমে যায়। ৩০তম ওভারে শান্তর বিদায়ে ভাঙে ৫৩ রানের জুটি।
সালমান আগাকে ছক্কা মেরে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তানজিদ হাসান তামিম। এটি ওয়ানডেতে তাঁর প্রথম সেঞ্চুরি। ৯৮ বলে ৭ ছক্কা আর ৬ চারে এসেছে সেঞ্চুরিটি। প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরির আগে তানজিদের সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ৮৪ রান, ২০২৪ সালের মার্চে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। তবে সেঞ্চুরির পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তিনি। আবরার আহমেদের করা নিরীহ এক শর্ট ডেলিভারিতে কাভারে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি।
ফেরার আগে ১০৭ রানের ইনিংস খেলেন তামিম। সমান বলের ইনিংসে ৬টি চার ও ৭টি ছক্কা হাঁকান এই বাঁহাতি ওপেনার। এ নিয়ে ৩০ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ২৮ ছক্কা হয়ে গেলো তামিমের। তার উপরে আছেন ১৪ জন। তবে এর মধ্যে এখনো খেলছেন এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা মাত্র ২! ৯৮ ম্যাচে লিটন কুমার দাসের ছক্কা ৪৮টি আর অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ২৯ ছক্কা মেরেছেন ১১৭ ম্যাচে।
তামিম আউট হয়ে ফেরার পর রানের গতি আরও কমে যায়। লিটন কুমার দাস আর আফিফ হোসেন মিলে ৬৮ রানের জুটি গড়লেও স্কোরবোর্ডে রান ওঠার গতি ছিল খুবই কম। শেষ ১০ ওভারে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে জমা হয় মাত্র ৭৩ রান। ৪৭তম ওভারে আউট হওয়ার আগে ৫১ বলে ৪১ রান করেন লিটন। আর ৪৪ বলে ৪৮ রানে অপরাজিত থাকেন হৃদয়। পাকিস্তানের হয়ে ৩ উইকেট নেন হারিস রউফ।
এসকেডি/কেএইচকে