ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. খেলাধুলা

বিসিবিতে পদত্যাগের হিড়িক, কী বার্তা দিচ্ছে?

আরিফুর রহমান বাবু | প্রকাশিত: ০৯:৪৩ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০২৬

বেশ কিছুদিন পর আজ শনিবার (৪ এপ্রিল) বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের সভা; কিন্তু সে সভার আলোচ্যসূচি ও সিদ্ধান্ত ছাপিয়ে বড় খবর- বোর্ড পরিচালক ফাইয়াজুর রহমান মিতুর পদত্যাগ।

আজ বোর্ড সভা শেষ না হতেই আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন বিসিবি পরিচালক মিতু। মিতু একা নন। এখন বিসিবিতে রীতিমতো পদত্যাগের হিড়িক। যত সময় গড়াচ্ছে, ততই বড় হচ্ছে পদত্যাগের মিছিল।

সবার আগে বিসিবি পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন ইশতিয়াক সাদেক। তারপর পদত্যাগ করেন পরিচালক ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন। তিনি সরে না যেতেই পদত্যাগ করেন আরেক পরিচালক ইয়াসির ফয়সাল। আজ চতুর্থ পরিচালক হিসেবে পদত্যাগ করলেন ফাইয়াজুর রহমান মিতু।

২৫ জনের বোর্ডে এরই মধ্যে ৬ ভাগের একভাগ স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াল। এতগুলো পদত্যাগ আসলে কী বার্তা দিচ্ছে? এতগুলো পদত্যাগ কীসের আলামত? তবে কি পরিচালকদের কেউ কেউ এখন আর বোর্ডে থাকাটা যুক্তিপূর্ণ মনে করছেন না? তাই পদত্যাগ করছেন? নাকি তাদের কোনো রকম চাপ দিয়ে পদত্যাগ করানো হচ্ছে?

খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত যে চার পরিচালক পদত্যাগ করেছেন, তাদের কাউকে বাইরে থেকে কোনো রকম চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। কাউকে কোনো ভীতিও প্রদর্শন করা হয়নি।

সবাই পরিবেশ-পরিস্থিতি ঠাওর করে এবং ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই বোর্ডে থাকার চেয়ে না থাকাকে যুক্তিযুক্ত ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, যে চার পরিচালক বিসিবি থেকে পদত্যাগ করেছেন, তারা প্রায় সবাই পদত্যাগের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ইচ্ছেমতো ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারাকে চিহ্নিত করেন।

তবে কথা বলে জানা গেছে, আসলে পরিচালকদের স্বেচ্ছা পদত্যাগের কারণ ভিন্ন এবং সেগুলোর পেছনে ঠিক একটি কারণই নেই; বেশ কিছু কারণের সমাহার এই চার পদত্যাগ।

কী সেই সব কারণ?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বোর্ড পরিচালকদের অনেকেই বুঝে গেছেন- এ বোর্ডের ভবিষ্যৎ ভালো নয়। যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয়েছিল, সেই নির্বাচনটাই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে রয়েছে বহু প্রশ্ন। নির্বাচনে তখনকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ হয়েছে। বিসিবি ও এনএসসির গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো আইনের ব্যবহার করা হয়েছে।

যার প্রতিবাদে এক পক্ষ নির্বাচন বয়কটও করেছে। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে যে অংশটি নির্বাচনে কারচুপির শঙ্কা প্রকাশ করে এবং নির্বাচনে স্বচ্ছতা নেই ও সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনে নির্বাচন বয়কট করেছিল, তাদের দল বিএনপি এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় লাভ করেছে এবং সরকার গঠন করেছে।

বিএনপি সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রী, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল হক নির্বাচন প্রক্রিয়া খুঁটিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। যে নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি একে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে গড়া পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজও করে যাচ্ছে।

ধারণা করা হচ্ছে, বোর্ডের অভ্যন্তরে অনেক পরিচালকের মাঝেই এখন সেই তদন্ত কমিটি-ভীতি কাজ করছে।

তারা (পরিচালকরা) খুব ভালো জানেন যে, নির্বাচন স্বচ্ছ ছিল না, অনিয়মে পরিপূর্ণ ছিল এবং তাতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

কাজেই পরিচালকদের অনেকের মনেই সংশয় দেখা দিয়েছে যে, তদন্ত কমিটি যদি বিসিবি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিহিত করে, তাহলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এই বোর্ড ভেঙে দিতে পারে। তখন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সম্ভাবনা থাকবে প্রবল।

কাজেই বলা যায়, নিজেদের গা বাঁচানোর তাগিদ এখন বোর্ডের অনেক পরিচালকের মধ্যেই কাজ করছে। তারা বুঝে গেছেন, আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে এ বোর্ডের বিদায় আসন্ন। তাই অনেকেই নিজেকে বিতর্কিত করে তোলার আগেই সরে যেতে চাইছেন।

বোর্ড টিকবে না- এ সত্য উপলব্ধির পাশাপাশি আরও একটি বিষয় পরিচালকদের মধ্যে কাজ করছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তা হলো, শুধু বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বোর্ডে আসাই নয়, এ বোর্ড সে অর্থে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরোনো, জনপ্রিয় ও প্রয়োজনীয় আসর ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ আয়োজন করতে পারেনি। ক্লাবগুলোর সমর্থন না থাকায় প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন সম্ভবও হয়নি।

এই প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন করতে না পারা বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে পরিগণিত হবে এবং এটা কাজ করতে না পারার বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। সেটাও অনেকের ভেতরে ‘গিল্টি ফিল’র জন্ম দিয়েছে।

তারা ভাবছেন, বোর্ডের জন্মটাও বিতর্কের মধ্য দিয়ে, আর বোর্ডের কাজকর্মেও গতি নেই। যে বোর্ড ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন করতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে, সেই বোর্ডে থাকার অর্থ ভবিষ্যতে আরও বিতর্কে জড়ানো এবং নিজের ক্যারিয়ারের ক্ষতি। এমন অনুভব থেকেও কেউ কেউ পদত্যাগ করেন।

এর বাইরে আরও একটি কারণও আছে। এই বোর্ডের ২৫ পরিচালকের বেশ কয়েকজন জাতীয়তাবাদী ঘরানার। তারা পড়েছেন বিপাকে। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল যদি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতেন, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।

কিন্তু নির্বাচনের সময় সরাসরি ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পছন্দের মানুষ হিসেবে কাজ করেছেন বুলবুল। পরবর্তীসময়েও তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে বিরোধী শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এতে তিনি সরকারের অনেকেরই বিরাগভাজন হয়েছেন।

বোর্ডে বিএনপি-সমর্থক অনেকেই মনে করছেন, এই বোর্ডে থাকা মানে নিজের ইমেজ ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করা। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হলে ভবিষ্যতে নির্বাচন করে আসার সুযোগ থাকবে। আর এখন এই বোর্ডে থেকে যাওয়া মানেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়া।

তাই বিএনপি সমর্থকদের কেউ কেউ পদত্যাগ করে প্রকারান্তরে নিজের বা নিজেদের ভবিষ্যতের দরজা খোলা রাখার কথাও ভাবছেন এবং ধারণা করা হচ্ছে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই পদত্যাগী পরিচালকের সংখ্যা আরও বাড়বে।

এআরবি/আইএইচএস/