ট্রানজিটের দশ ঘণ্টায় জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট ঘুরে দেখা
ট্রানজিটের দশ ঘণ্টায় জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট, মাইন নদীর তীরে হঠাৎ পাওয়া শহরভ্রমণ, ইতিহাস আধুনিকতার মেলবন্ধন, ছোট ভাই মারুফের সঙ্গ, নীরব গির্জা, সেতু, মেলা আর স্মৃতিতে গাঁথা এক অনন্য অভিজ্ঞতা ভ্রমণকথার রঙিন মানবিক প্রথম পরিচয়। আর্জেন্টিনার চমৎকার, রঙিন আর গভীর অনুভূতির দিনগুলো শেষ করে যখন আমি লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি; তখন সামনে আরও একটি গন্তব্য অপেক্ষা করছিল ফিনল্যান্ড। কিন্তু সেই যাত্রাপথে মাঝখানে ছিল জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে প্রায় দশ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রানজিট। প্রথমে মনে হচ্ছিল, এয়ারপোর্টেই হয়তো সময়টা কাটিয়ে দিতে হবে একটু বসে থাকা, কিছু হাঁটাহাঁটি, কফি খাওয়া, জানালার বাইরে বিমান ওঠানামা দেখা। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় সেই দশ ঘণ্টা পরিণত হলো স্মরণীয় শহরভ্রমণের গল্পে।
স্কুলজীবনের ছোট ভাই মারুফ মাত্র কয়েকদিন হলো জার্মানিতে এসেছে। যোগাযোগ করতেই সে জানালো, চাইলে সে এয়ারপোর্টে এসে আমাকে নিয়ে যাবে শহর ঘুরতে। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিলাম এয়ারপোর্টের চার দেওয়ালের ভেতর সময় নষ্ট না করে সুযোগটাকে কাজে লাগানোই ভালো। মারুফ ঠিক সময়েই এয়ারপোর্টে হাজির হলো, আর সেখান থেকেই শুরু হলো ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের সঙ্গে আমার প্রথম বাস্তব পরিচয়। এতবার এই এয়ারপোর্টে এলেও কখনো শহরে ঢোকার সুযোগ হয়নি; এবার যেন শহর নিজেই আমাকে ডেকে নিয়েছে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরটি জার্মানির মাইন নদীর তীরে অবস্থিত। এই নদীর নামের কারণেই শহরটির পূর্ণ নাম ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট অ্যাম মাইন’। শহরে ঢুকতেই প্রথম যে বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল, তা হলো নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই শহরের শান্ত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি। মাইন নদী শুধু একটি জলধারা নয়, এটি যেন পুরো শহরের প্রাণ। নদীর দুপাশে বিস্তৃত আধুনিক ভবন, পুরোনো স্থাপনা, হাঁটার পথ, সাইকেল লেন সব মিলিয়ে অসাধারণ দৃশ্যপট তৈরি করেছে। এই নদী রাইন নদীর একটি প্রধান উপনদী, আর এর মাধ্যমেই ফ্রাঙ্কফুর্ট বহু শতাব্দী ধরে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

মাইন নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, শহরটা খুব সচেতনভাবে তার ইতিহাস আর আধুনিকতাকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। একদিকে কাচে মোড়া উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপার, অন্যদিকে শত শত বছরের পুরোনো ভবন দুটোই যেন সমান মর্যাদায় দাঁড়িয়ে আছে। এই বৈপরীত্যই ফ্রাঙ্কফুর্টকে অনন্য করে তোলে। তাই অনেকেই মজা করে শহরটিকে ‘মাইন-হাটান’ নামে ডাকেন নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের সঙ্গে তুলনা করে।
মাইন নদীর ওপর দিয়ে যেসব সেতু শহরকে যুক্ত করেছে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো আইজারনার স্টেগ। এটি একটি পথচারী সেতু, আর ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে এখানে অসংখ্য ‘লাভ প্যাডলকস’ ঝুলতে দেখা যায়। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালে মনে হয়, সময় যেন একটু থেমে যায়। মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ নদীর ধারে বসে গল্প করছে। সব মিলিয়ে এক শান্ত, মানবিক দৃশ্য। এ ছাড়াও আল্টে (পুরোনো ব্রিজ) আর হোলবাইনস্টেগের মতো সেতুগুলো শহরের ইতিহাস বহন করে চলেছে নিঃশব্দে।
নদী পেরিয়ে আমরা পুরোনো শহরের দিকে এগোলাম। এখানকার রাস্তাঘাট, গলি, পুরোনো বাড়িঘর সবকিছুতেই একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। মনে হচ্ছিল, এই শহরের প্রতিটি ইটের ভেতর লুকিয়ে আছে শতাব্দীর গল্প। পুরোনো গির্জাগুলোতে ঢুকে এক ধরনের শান্ত নীরবতা অনুভব করলাম। বাইরে আধুনিক শহরের ব্যস্ততা, আর ভেতরে নিস্তব্ধতা এই বৈপরীত্য আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিলো। গির্জার ভেতরের আলো-ছায়া, কাঠের বেঞ্চ, উঁচু ছাদ সব মিলিয়ে মনটা অজান্তেই ধীর হয়ে এলো।

আরও পড়ুন
পর্তুগিজ আমলের রাস্তায় একদিন
নীরব সৌন্দর্যের শহর স্ট্যানলি
ফ্রাঙ্কফুর্ট শুধু আর্থিক কেন্দ্রই নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক মেলার শহর হিসেবেও বিশ্ববিখ্যাত। প্রতি বছর এখানে অনুষ্ঠিত হয় অসংখ্য বাণিজ্যমেলা। এর মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম বড় বইমেলা ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট বুক ফেয়ার’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যারা বই ভালোবাসেন, সাহিত্যকে হৃদয়ে ধারণ করেন, তাদের জন্য এই শহর যেন এক স্বপ্নের জায়গা। এ ছাড়া ‘ইন্টারন্যাশনাল মোটর শো’, ‘মিউজিক মেসে’র মতো বিশাল আন্তর্জাতিক আয়োজন শহরকে বৈশ্বিক মানচিত্রে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট ট্রেড ফেয়ার’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মেলার স্থানগুলোর একটি, এ কথা শুনে শহরটার গুরুত্ব আরও ভালোভাবে বুঝতে পারলাম।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ফ্রাঙ্কফুর্ট পিছিয়ে নেই। এখানে অবস্থিত গ্যেটে ইউনিভার্সিটি ফ্রাঙ্কফুর্ট জার্মানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শহরটির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, জাদুঘর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান সবকিছু মিলিয়ে এটি শুধু ব্যবসার শহর নয় বরং জ্ঞানচর্চারও এক বড় কেন্দ্র।
আমরা রোমার স্কয়ারের দিকে গেলাম এটি ফ্রাঙ্কফুর্টের ঐতিহাসিক হৃদয় বলা যায়। চারপাশে ঐতিহ্যবাহী ভবন, ছোট দোকান, ক্যাফে সব মিলিয়ে এক পোস্টকার্ডের মতো দৃশ্য। কাছেই সেন্ট বার্থোলোমিউস ক্যাথেড্রাল, যার উঁচু টাওয়ার আকাশ ছুঁয়ে আছে। গ্যেটে হাউজেও ঢুঁ মারলাম জার্মান সাহিত্যের মহান ব্যক্তিত্ব গ্যেটের স্মৃতিতে ঘেরা জায়গাটি ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা।

এরপর পালমগার্ডেন শহরের ভেতরে এক সবুজ স্বস্তির জায়গা। গাছপালা, ফুল, প্রশান্ত পরিবেশ এখানে এসে মনে হলো, শহরের কোলাহলের মাঝেও প্রকৃতির জন্য জায়গা রাখা কতটা জরুরি। মাইন নদীর ধারে মিউজিয়ামসুফার এলাকাও দেখলাম নদীর তীরজুড়ে জাদুঘর আর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের এক দীর্ঘ সারি, যা শহরের সাংস্কৃতিক গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
পরিবহনের দিক থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার বিমানবন্দর জার্মানির সবচেয়ে বড়, আর ইউরোপেরও ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি। বিশাল রেলওয়ে স্টেশন, সুবিন্যস্ত সড়ক ব্যবস্থা সবকিছুই শহরের পরিকল্পিত চরিত্রের প্রমাণ দেয়। সংস্কৃতির কথা বলতে গেলে, এখানে অসংখ্য জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি আর ঐতিহ্যবাহী আপেল ওয়াইনের বার আছে। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক জীবনের এক সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায় সর্বত্র।
আমি এই শহরে বহুবার এসেছি কিন্তু সবই ছিল কেবল এয়ারপোর্টে সীমাবদ্ধ। এবার প্রথমবার শহরের রাস্তায় হাঁটলাম, নদীর ধারে দাঁড়ালাম, পুরোনো দোকানে ঢুকলাম, চার্চের নীরবতা অনুভব করলাম। আবহাওয়া ছিল একটু ঠান্ডা আর হালকা বাতাস ছিল, তবুও সময় কীভাবে যে ছয়-সাত ঘণ্টা পেরিয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি। শহরটা ভীষণ গোছানো, পরিষ্কার, শান্ত একটা মনোরম পরিবেশ পুরো সময়টাই আমাকে ঘিরে রেখেছিল।

শেষমেশ আবার এয়ারপোর্টে ফেরার সময় মনে হলো, ট্রানজিটটা যেন এক উপহার। হঠাৎ পাওয়া এই ভ্রমণ, মারুফের সঙ্গে কাটানো সময়, আর ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর পরিচয় সব মিলিয়ে স্মৃতিতে গেঁথে রইল। এরপর আবার লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম, মনে মনে ভাবলাম কখনো যদি সময় নিয়ে আবার আসা যায়, এই শহরের গল্প নিশ্চয়ই আরও গভীর হবে।
এসইউ