বাসভাড়া বাড়ালেও যাত্রীসেবায় উদ্যোগ নেই

আশিকুজ্জামান
আশিকুজ্জামান আশিকুজ্জামান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৪ এএম, ০৬ মে ২০২৬

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয় ও নীতিগত সমন্বয়ের কারণ দেখিয়ে দেশের গণপরিবহনে নতুন ভাড়া কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে ভাড়া বাড়লেও যাত্রীসেবার মান কতটা উন্নত হচ্ছে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

প্রতিদিন রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে যাত্রীদের ভোগান্তির চিত্র প্রায় একই রকম; গরমে ফ্যান অচল, বাসে পর্দার অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভাঙাচোরা আসন। সব মিলিয়ে সেবার মান নিয়ে যাত্রীদের অসন্তোষ বাড়ছে। ফলে ভাড়া বৃদ্ধি ও সেবার মানের মধ্যে ভারসাম্য আছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে গণপরিবহন খাতের সার্বিক পরিস্থিতি, যাত্রীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, মালিকপক্ষের ভূমিকা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। তিনি বর্তমান ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, যাত্রী প্রতিনিধিত্বের অভাব এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক

বাসভাড়া বাড়ালেও যাত্রীসেবায় উদ্যোগ নেইরাজধানীতে চলাচলরত একটি বাসের ভেতরের দৃশ্য, ছবি: জাগো নিউজ

জাগো নিউজ: সামগ্রিকভাবে দেশের গণপরিবহনে যাত্রীসেবার বর্তমান চিত্র আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোজাম্মেল হক: সামগ্রিকভাবে যদি বলি, যাত্রীসেবার মান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। আমরা নিয়মিত বিভিন্ন রুট ও পরিবহনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করি এবং গণমাধ্যমেও এসব বিষয় তুলে ধরি। কিন্তু সমস্যা হলো এগুলো অনেকটা দীর্ঘদিনের চর্চিত দুর্বলতা, যা সহজে কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। শহরাঞ্চলে যাত্রীসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সেবার মান বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটছে না। ফলে যাত্রীরা প্রতিদিনই নানা ধরনের ভোগান্তির মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জাগো নিউজ: সম্প্রতি ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সেবার মান বাড়েনি, এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

মোজাম্মেল হক: এটি আসলে যাত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষের জায়গা। ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাধারণত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়, কিন্তু একই সঙ্গে সেবার মান উন্নয়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকে না। অর্থাৎ, ভাড়া বৃদ্ধি এবং সেবার মানের মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। এতে যাত্রীরা মনে করেন, তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বিনিময়ে কোনো উন্নত সেবা দেওয়া হচ্ছে না। এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে যাত্রী ও পরিবহন খাতের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।

জাগো নিউজ: যাত্রীদের প্রধান ভোগান্তিগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?

মোজাম্মেল হক: ভোগান্তিগুলো খুবই বাস্তব এবং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত। যেমন গরমের সময় বাসে ফ্যান চলে না বা কার্যকর থাকে না, যা যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। অনেক বাসে পর্দা না থাকায় সরাসরি রোদ লাগে, বিশেষ করে দীর্ঘ রুটে এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া সিটের কাভার ছেঁড়া, ভেতরে ময়লা-আবর্জনা, জানালার কাচ ভাঙা। এসব তো নিয়মিত দৃশ্য। বর্ষাকালে আবার দেখা যায়, বাসের ছাদ বা জানালা দিয়ে পানি ঢুকে পড়ে। এই সমস্যাগুলো ছোট মনে হলেও প্রতিদিনের যাত্রাকে অস্বস্তিকর করে তোলে এবং সামগ্রিকভাবে সেবার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাসভাড়া বাড়ালেও যাত্রীসেবায় উদ্যোগ নেইরাজধানীতে চলাচলরত একটি বাসের ভেতরের দৃশ্য, ছবি: জাগো নিউজ

জাগো নিউজ: এই সমস্যাগুলোর মূল কারণ কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

মোজাম্মেল হক: মূল সমস্যা কাঠামোগত এবং নীতিগত। আমাদের দেশের সড়ক পরিবহন আইন ও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে মালিকপক্ষ তুলনামূলক বেশি প্রভাবশালী। ফলে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায় না। তদারকি ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল, ফলে নিয়ম না মানলেও তেমন জবাবদিহি করতে হয় না। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে একই সমস্যা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে।

জাগো নিউজ: পরিবহন খাতের দায়িত্বে থাকা কমিটিগুলোর ভূমিকা কতটা কার্যকর বলে মনে করেন?

মোজাম্মেল হক: বাস্তবে দেখা যায়, পরিবহন সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ের কমিটিগুলো, প্রধানত মালিকদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এখানে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, ফলে তাদের সমস্যাগুলো সরাসরি উপস্থাপন করার সুযোগ থাকে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়ও যাত্রীস্বার্থ তেমনভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, যেখানে এক পক্ষের স্বার্থ প্রাধান্য পায় এবং অন্য পক্ষের ভোগান্তি থেকে যায়।

জাগো নিউজ: কর্তৃপক্ষের সংক্ষিপ্ত নজরদারি কি এই সমস্যার সমাধান দিতে পারছে?

মোজাম্মেল হক: ভ্রাম্যমাণ আদালত বা প্রশাসনিক তদারকি কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়। তবে এগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদি সমাধান দেয়। স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর প্রয়োগ এবং একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামো। শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। একটি ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে নিয়ম লঙ্ঘন করলে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

জাগো নিউজ: পরিবহন মালিকদের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মোজাম্মেল হক: মালিকরা সাধারণত ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়গুলো দেখেন, যা স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন সেবার মান বজায় রাখার ন্যূনতম দায়িত্বটুকুও অবহেলিত হয়। যেমন একটি বাসে ফ্যান মেরামত করা, পর্দা লাগানো বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। এসব খুব বড় বিনিয়োগ নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা করা হয় না। এতে বোঝা যায়, সেবার মান উন্নয়নের চেয়ে ব্যয় কমানোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাসভাড়া বাড়ালেও যাত্রীসেবায় উদ্যোগ নেই

জাগো নিউজ: এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আপনার সুপারিশ কী?

মোজাম্মেল হক: এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, সড়ক পরিবহন আইন ও নীতিমালা যুগোপযোগী করে সংস্কার করতে হবে, যাতে যাত্রীসেবা একটি বাধ্যতামূলক উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

দ্বিতীয়ত, পরিবহন সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে যাত্রীদের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা সরাসরি তাদের মতামত ও সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারেন।

তৃতীয়ত, ভাড়া নির্ধারণের সঙ্গে সেবার মানের একটি স্পষ্ট সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এতে সেবা না বাড়ালে ভাড়া বৃদ্ধিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে ধীরে ধীরে একটি সুষম ও যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

জাগো নিউজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মোজাম্মেল হক: জাগো নিউজকেও অনেক ধন্যবাদ।

এমডিএএ/এমএমএআর/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।