মালয়েশিয়ান কারাগারে আটক ৩৫০ বাংলাদেশি


প্রকাশিত: ০৯:০৯ এএম, ২৮ মার্চ ২০১৫

স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়া সবার জন্য সমান আনন্দের নয়। নানা অপরাধে সে দেশের কারাগারে এখন বন্দী হিসেবে আছেন সাড়ে তিনশ বাংলাদেশি। আর নানা কারণে মালয়েশিয়ার পুলিশ ক্যাম্পে আটক রয়েছেন অন্তত ২ হাজার ১৩৫ জন বাংলাদেশি। এর কারণ শ্রমিকদের ভিসার মেয়াদ চলে যাওয়াসহ অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়া।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এশিয়ার অন্যতম আধুনিক রাষ্ট্র মালয়েশিয়ায় ২০০২ সাল থেকে শুরু হয় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক প্রেরণ। এক হিসেব অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বৈধ-অবৈধ শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় আট লাখ। এর মধ্যে সে দেশের সরকার সিক্সপি নামক একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের দু’লাখ শ্রমিককে চার বছর আগে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে। যার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে সে দেশে বসবাসরত অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টায় ২০১১ সালে মালয়েশিয়ায় ২ লাখ ৬৭ হাজার অবৈধ বাংলাদেশিকে বৈধকরণের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

৬টি প্রক্রিয়া অবলম্বন করার কারণে এর নাম দেয়া হয়েছিল সিক্স প্রসেস সংক্ষেপে সিক্সপি। এই সিক্সপি নিয়ে উদ্বেগের শেষ ছিলনা প্রবাসীদের মাঝে। সব সময় একটা আতংক বিরাজ করে প্রবাসী শ্রমিকদের মাঝে। সিক্সপির আওতাধীন শ্রমিকেরা দুর্ভোগ বিড়ম্বনার জন্য সে দেশে নিযুক্ত  বিগত হাইকমিশনার আতিকুর রহমানকে দায়ী করেছেন। প্রবাসীরা অভিযোগ করে বলেন শ্রমিকদের সমস্যার ব্যাপারেও সে সময় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি হাইকমিশন।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশন প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছেনা বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার প্রবাসীরা। তারা জানান, ঘুষ এবং দালাল ছাড়া হাইকমিশনে কোনো কাজ হয় না। ঘুষ দিলে দ্রুত কাজ হয়, না দিলে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

নানা কর্মকাণ্ডের জন্য মালয়েশিয়ার প্রবাসী কমিউনিটির কাছে বিতর্কিত ছিলেন বিগত হাইকমিশনার আতিকুর রহমান। মালয়েশিয়ার কুতারায়া এলাকায় কথা হয় গাড়িচালক সেলিম মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, এমন কোনো অপরাধ নেই যা বাংলাদেশের প্রবাসীরা সেখানে করেন না। ফলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সেখানে ভালো নেই। শ্রমিকদের কাছে বড় আতংক হয়ে দাঁড়ায় দালাল। ফলে সর্বস্ব হারিয়ে এক সময় দালালদের উপর চড়াও হন শ্রমিকরা। মারামারির ফলে পরিণাম হয় জেল। সামাজিক নানা অপরাধেও জড়িয়ে পড়েন প্রবাসীরা ।

প্রতারণা, পতিতা ব্যবসা, সুদ, জুয়া, জালিয়াতি, অপহরণ, ধর্ষণ, দালালী, ঘুষ-দুর্নীতি, মানব পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন প্রবাসীরা। প্রতিদিনই পুলিশ আটক করে শ্রমিকদের। এদের মধ্যে অপরাধ প্রমাণিত না হলে পুলিশ ক্যাম্প থেকে ছেড়ে দেয়া হয়, আর প্রমাণিত হলে মুখোমুখি হতে হয় আদালতের। মালয়েশিয়া হাইকমিশনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে কারাগারে আছেন  প্রায় সাড়ে ৩০০ বাংলাদেশি প্রবাসী। আর নানা কারণে পুলিশ ক্যাম্পে আটক আছেন প্রায় ২ হাজার ১৩৫ জন। এটি সরকারি হিসেব বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা আরো বাড়বে বলে মনে করেন প্রবাসীরা।

হাইকমিশন শ্রমিকদের খোঁজ খবর রাখছে এবং শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় সহযোগীতা দিচ্ছে বলে জানান শ্রমিক শাখার সচিব শাহিদা সুলতানা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় সমুদ্রপথে মানব পাচারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার নিরীহ যুবকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বপ্নের দেশে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য সমুদ্রপথে পাড়ি জমাচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোগে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ বন্ধ থাকায় দালালদের প্রলোভনে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সমুদ্রপথে যাত্রা করছে নিরীহ কর্মীরা। সমুদ্রপথে ট্রলারে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে অনেক অবৈধ কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন।

পাচারকারী চক্র মৃত কর্মীদের সাগরে ফেলে দিচ্ছে। মালয়েশিয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমূদ্রপথে আগত একাধিক কর্মী এতথ্য জানিয়েছে। সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রবেশের ঘটনা ঠেকানো সম্ভব না হওয়ায় মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ সর্ম্পক অবনতি হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন নিয়োগকর্তা সমুদ্রপথে আগত কর্মীদের স্বল্প মজুরিতে কাজ দিচ্ছে। এতে মালয়েশিয়ায় বৈধ বাংলাদেশি কর্মীরা বিপাকে পড়েছে। কুয়ালালামপুরের একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কর্মরত একাধিক কর্মী এ অভিমত ব্যক্ত করেছে।

এদিকে কক্সবাজার থেকে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় গত তিন বছরে ছয় শতাধিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এমন তথ্য জানিয়েছেন। সাগরে সলিল সমাধির আশঙ্কা, বিদেশের কারাগারের ভয়, খাবার ফুরিয়ে গেলে সমুদ্রপথে না খেয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া, থাই কোস্টগার্ডের নির্যাতন জেনেও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর অনেক মানুষের কাছে ট্রলারে সমুদ্রপথে ‘ভয়ঙ্কর যাত্রা’ যেন কিছুই নয়। এ জন্য থামছে না এ যাত্রা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ায় কিছুদিন পাচার কম হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী চারটি মানববাহী ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। এসব ট্রলারডুবির ঘটনায় মারা গেছেন ৫৭ জন। নিখোঁজ রয়েছেন আরো কয়েক শ’ মানুষ। শুধু কক্সবাজারের অধিবাসী শতাধিক যুবকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নিখোঁজ রয়েছেন আরো ১৫-২০ জন। পাচার বন্ধে এখন সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামীদের ভিকটিম বলে ছেড়ে দেয়ার বিপক্ষে মত দিয়েছেন অনেকে।

এআরএস/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।