মালয়েশিয়ায় শিগগিরই ৫ লাখ শ্রমিক নিয়োগ
আবারো আশার আলো দেখছে শ্রমবাজার। বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির অন্যতম বড় বাজার মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ থেকে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও লোক নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির জটিলতা অবশেষে কেটে যাচ্ছে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশ থেকে পাঁচ লাখ শ্রমিক নেওয়ার কথা জানিয়েছে সে দেশের সরকার। পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যা ১৪ লাখে উন্নীত হবে।
বুধবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সফররত প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা জানান দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জাহিদ হামিদি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে পাঁচ লাখ পর্যায়ক্রমে আরো অধিক শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে খুব শিগগিরই মালয়েশিয়া সরকারের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসবেন বলেও জানায় ওই সূত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাগরপথে মানবপাচারের ঘটনায় বিভিন্ন সংস্থা, সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি এবং গণমাধ্যমের সংবাদের পর বেসরকারিভাবে লোক পাঠানোর দাবিটি জোরালো হয়ে ওঠে। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে বেসরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় লোক না পাঠানোর পূর্বের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে মন্ত্রণালয়। শীর্ষ মহলের বরফও গলতে শুরু করে।
এ প্রেক্ষাপটে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিএমইটির কর্মকর্তারা চলতি মাসের প্রথম দিকে বেসরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির ভিসার ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন। এতে আবার আশার আলো দেখছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এর ফলে সাগরপথে মানবপাচার বন্ধ হবে বলে আশা করছে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রা।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় দেশটি। দীর্ঘ কূটনৈতিক যোগাযোগের পর ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে সরকারিভাবে কর্মী নেওয়ার চুক্তি হয়। এরপর মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের ১৪ লাখ ৫০ হাজার লোক নিবন্ধন করেন। কিন্তু গত তিন বছরে মাত্র সাড়ে সাত হাজার কর্মী নিয়েছে দেশটি। অথচ একই সময়ে ছাত্র ও পর্যটক বেশে সেখানে গেছেন অন্তত দেড় লাখ লোক। আর বঙ্গোপসাগর দিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেছেন দেড় লাখ মানুষ। সম্প্রতি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় গণকবর আবিষ্কার এবং এ নিয়ে হইচই শুরুর পর আবার বেসরকারিভাবে কর্মী নেওয়ার প্রস্তাব দিল মালয়েশিয়া।
মন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে এতদিন সরকারিভাবে কর্মী যেত মালয়েশিয়ায়। কিন্তু তারাই এখন এর সঙ্গে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেই আমি মালয়েশিয়া এসেছি। তবে বেসরকারিভাবে গেলেও খরচ নিয়োগ কর্তাকেই দিতে হবে।’
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার, আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফট উইংয়ের সচিব শহিদুল ইসলাম, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক বেগম শামছুন নাহার এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর একান্ত সচিব মুহাম্মদ ইবরাহিম মন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির বিষয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী।
এদিকে সরকারিভাবে এ সফরে সুযোগ না পেলেও বায়রার সভাপতি আবুল বাসার এবং মহাসচিব মনসুর আহমেদও মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ অব বাংলাদেশের (বায়রা) সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, জিটুজি চুক্তিতে যে খাতে শ্রমিক নেওয়ার কথা বলা আছে তার বাইরেও বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে মালয়েশিয়াতে। ফলে ওই দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা তাদের আত্মীয়স্বজনদের জন্য প্রফেশনসাল ভিসা পাঠান। এই প্রক্রিয়াটি আগে অনানুষ্ঠানিক থাকলেও এখন সরকার এটিকে নীতিমালার আওতায় নিয়ে এসেছে।
তিনি আরো জানান, জিটুজি চুক্তির বাইরে সার্ভিস, ফ্যাক্টরি, কনস্ট্রাকশন এবং অ্যাগ্রিকালচার খাতেও লোক পাঠাতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ইতোমধ্যে বায়রাকে নির্দেশ দিয়েছেন। মন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনীয় চিঠি ও কাগজপত্র যা লাগে দেবেন। আমাদের লোক পাঠাতে ওই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছেন। আমরা ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করেছি। বেসরকারিভাবে লোক যাওয়া শুরু হলে অবৈধপথে মানবপাচার রোধ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
জনশক্তি রফতানিকারক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথ সংকুচিত হওয়ায় অবৈধভাবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ নিচ্ছে দালালেরা। যাওয়ার আগে টাকা লাগে না, আবার কোনো রকমে পৌঁছালেই কাজ মিলছে-দালালদের এমন প্রলোভনে পা দিচ্ছে সহজ-সরল মানুষ।
মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক কুয়ালালামপুরস্থ কোতারায়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রাশেদ বাদল বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় অনেক ছোট-ছোট প্রতিষ্ঠান আছে। তারা বেশি টাকা লেভি দিয়ে সরকারিভাবে লোক আনতে চায় না। এ ব্যবস্থা ভাঙতে হলে বাংলাদেশ থেকে সরকারিভাবে লোক পাঠানোর পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও পাঠাতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে দুই লাখ ৭৩ হাজার ২০১ জন এবং ২০০৮ সালে এক লাখ ৩১ হাজার ৭৬২ জন মালয়েশিয়া গেলেও ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় দেশটি। এরপর বেসরকারি ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে সরকারিভাবে জিটুজি পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেয় মন্ত্রণালয়। ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর এ বিষয়ে দুই দেশের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ভালো বেতন এবং নামমাত্র খরচে সরকারিভাবে মালয়েশিয়া যেতে সারাদেশের প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নাম নিবন্ধন করেন। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, বছরে অন্তত এক লাখ শ্রমিক যাবে মালয়েশিয়া। অথচ গত তিন বছরে জিটুজি প্রক্রিয়ায় দেশটিতে যেতে পেরেছেন ‘সৌভাগ্যবান’ মাত্র সাত হাজার ১৯০ জন শ্রমিক।
বাকিদের হয়েছে স্বপ্নভঙ্গ। ফলে বৈধপথে ভাগ্য ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে অনেকেই পা বাড়ান অবৈধপথে। এতে বাড়ে সাগরপথে মানবপাচারের হার। ঘটে অনেক প্রাণহানি।
বিএ/আরআইপি