‘জয় পাকিস্তান’ শব্দটি সংশোধন না করার পরামর্শ দিয়েছিল মঈদুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৫৬ পিএম, ০১ জুন ২০১৯

মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এ কে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ বইয়ে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের পর তা সংশোধনে সংবাদ সম্মেলন আটকে দেন গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মুক্তিযোদ্ধা মঈদুল হাসানসহ কয়েকজন।

শনিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটা জানিয়েছেন এ কে খন্দকারের স্ত্রী ফরিদা খন্দকার। রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি বলেন,যখন বইটিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল তখন এটি সংশোধনের উদ্যোগ নিতে বলি; তখন গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মুক্তিযোদ্ধা মঈদুল হাসানসহ কয়েকজন আমাদের বাসায় গেলেন। তারাসহ আরও কয়েকজন তখন এই কাজে বাধা দিয়েছিলেন। আমরা তখনও বুঝিনি যে সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি সমাধান করা যায়।

তখন বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য সংশোধনে মঈদুল হাসানের মন্তব্য ছিল ছোড়াগুলির পেছনে দৌড়াবেন? গুলিতো ছোড়া হয়ে গেছে এখন তো আর দৌড়ালে হবে না এমনটিই জানান সাংবাদিকদের এ কে খন্দকারের স্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এ কে খন্দকার। তিনি বলেন, ‘‘আমার লেখা বই ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ ২০১৪ সালের আগস্টে ‘প্রথমা প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশনার পর এর ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত বিশেষ অংশ ও বইয়ের আরও কিছু অংশ নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদ ওঠে। বইটির ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত বিশেষ অংশটি হলো- ‘বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’। তিনি যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, ‘জয় পাকিস্তান’।’’

তিনি বলেন, ‘‘এই অংশটুকুর জন্য দেশপ্রেমিক অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন বলে আমি বিশ্বাস করি। এই তথ্যটুকু যেভাবেই আমার বইতে আসুক না কেন, এই অসত্য তথ্যের দায়ভার আমার এবং বঙ্গবন্ধু ৭ মাচের্র ভাষণে কখনোই ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি বলেননি। আমি তাই আমার বইয়ের ৩২ নম্বর পৃষ্ঠার উল্লেখিত বিশেষ অংশ সম্বলিত পুরো অনুচ্ছেদটুকু প্রত্যাহার করে নিচ্ছি এবং একই সঙ্গে আমি জাতির কাছে ও বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।’’

শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ ডিজিটাল বাংলাদেশ নামে বিশ্বে খ্যাতির শীর্ষে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত। তারই বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বে দেশ আজ যুদ্ধাপরাধীমুক্ত। জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে পরা একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার প্রতি কৃতজ্ঞ।

বক্তব্যের ইতি টেনে তিনি বলেন, আমার বয়স এখন ৯০ বছর। আমার পুরো জীবনে করা কোনো ভুলের মধ্যে এটিকেই আমি একটি বড় ভুল বলে মনে করি। গোধূলী বেলায় দাঁড়িয়ে পড়া সূর্যের মতো আমি আজ বিবেকের তাড়নায় দহন হয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মার কাছে ও জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আশা করি, প্রথমা প্রকাশনী আমার বইয়ের ৩২ পৃষ্ঠার বিতর্কিত অংশটুকু বাদ দিয়ে পুনঃমুদ্রণ করবেন। দেশপ্রেমিক সবার জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কে খন্দকারের স্ত্রী জানান তিনি শুনতে পাচ্ছেন না। তার হয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন ফরিদা খন্দকার। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কী কারণে বইটি প্রকাশের পরপরই মিথ্যা তথ্যটি সংশোধনে সংবাদ সম্মেলন করলেন না।

ফরিদা খন্দকার বলেন, ‘এটা যে কীভাবে আসলো, আর আসার পরে আমরা চেষ্টা করেছিলাম সংশোধন করার। কিন্তু আমাদের সংশোধন করতে দেয়া হয়নি। কারা এর জন্য দায়ী আমি তাদের নাম বলতে চাই না। কারণ এই ৫ বছর আমরা যে যন্ত্রণা ভোগ করেছি, আমি চাই না এই নামগুলো বলার কারণে তারা (জড়িতরা) আবার সেই যন্ত্রণা ভোগ করুক। আমি মতিউর রহমানকেও জিজ্ঞাসা করেছিলাম- ভাই আপনি এটা পড়ে দেখেননি? তিনি বলেন, এটা আমি করি না, আমাদের লোক থাকে। তারা বানান ভুল, গ্রামার এসব দেখে। তারা এগুলো খেয়াল করেনি। আমি চেষ্টা করেছিলাম যে সংশোধনীটা হয়ে যাক। কিন্তু আমাদের সেটা করতে দেয়নি।’

পাঁচ বছর পরে আপনাদের এই উপলব্ধিটা হলো কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদা খন্দকার বলেন, ‘পাঁচ বছর পরে না। এটা তখনই হয়েছে।’ কারা তখন সংবাদ সম্মেলন করতে দেয়নি জানতে চাইলে ফরিদা খন্দকার বলেন, ‘আমি নামগুলো বলতে চাই না। আমি চাই না তারা আমাদের মতো যন্ত্রণা ভোগ করুক। নামগুলো আমার জানা আছে। যদি সে রকম দরকার হয় তাহলে আমি সেগুলো প্রকাশ করব।’

সংবাদ সম্মেলনের এ পর্যায়ে সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নে কিছুটা বিচলিত হন ফরিদা খন্দকার। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যারা সংবাদ সম্মেলন করতে দেননি তাদের মধ্যে কি কাজী জাফরুল্লাহ ছিলেন? উত্তরে ফরিদা বলেন, ‘জ্বি, ছিলেন। তার সঙ্গে আমার আগে কোনো পরিচয় হয়নি। ওনাকে ও কয়েকজনকে আরেকজন নিয়ে এসেছিল।’

এ সময় ফরিদা খন্দকার নামগুলো প্রকাশের জন্য পাশে বসা এ কে খন্দকারের অনুমতি চান। এ খন্দকার বলেন, ‘বলে দাও’। এ পর্যায়ে ফরিদা খন্দকার বলেন, ‘মঈদুল হাসান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাজউদ্দিন সাহেবের প্রেস সেক্রেটারি বা পিএসজাতীয় কিছু। মঈদুল হাসান এরপরে কাজী জাফরুল্লাহ...। কাজী জাফরুল্লাহকে আমি চিনতাম না, মঈদুল হাসানকে চিনতাম। এরপর আরেকজন ওবায়েদ। আরো কে কে যেন ছিল। আমি নাম মনে করতে পারছি না। তারা কয়েক দিন ধরে আমাকে পাহারা দিয়ে রেখেছিল যেন এটা...। আমাদের বলা হলো 'গুলি ছুড়ে দিয়েছো' এখন কি গুলির পেছনে দৌড়াবা?’

তিনি বলেন, ‘আমি এটা সংশোধনের জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। অনেককে বলেছি এটা সংশোধন করি। প্রধানমন্ত্রীর ফুফাতো বোন, এরপরে মাছরাঙার পিন্টু চৌধুরীকে অনেক বার ফোন করেছি কিন্তু তারা আমার ফোন ধরেননি। আপনাদের তো চিনি না যে ফোন করব।’

‘গুলি ছুড়ে দিয়েছো, এখন কি গুলির পেছনে দৌড়াবা?’ এটা কে বলেছিল জানতে চাইলে ফরিদা খন্দকার বলেন, ‘মঈদুল হাসান বলেছিল।’

ফরিদা খন্দকার বার বার ভুলবশত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম কাজী জাফরুল্লাহ বলতে থাকেন। পরে সংবাদ সম্মেলন শেষে অনেক সাংবাদিক চলে যাওয়ার পর আবার তাদের ঢেকে নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে তার ভুল সংশোধন করে বক্তব্য দেন।

ফরিদা খন্দকার তার স্বামী এ কে খন্দকারের প্রসঙ্গে বলেন, ‘বইটা সংশোধন না করাতে উনি কিন্তু মানসিক রোগী হয়ে গেছেন। সিএমএইচে চিকিৎসা নিয়েছেন একেবারে উন্মাদ পাগল হিসেবে। এখনো তার চিকিৎসা চলছে।’ তিনি কানে কম শোনেন শারীরিকভাবে অসুস্থ।

এফএইচ/জেএইচ/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :