মামলার জালে সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার

মোসাইদ রাহাত
মোসাইদ রাহাত মোসাইদ রাহাত , সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৫:৩৬ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হলে ভাষা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীরসন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে সদর পৌর শহরের ডিএস রোড এলাকায় গড়ে তোলা হয় শহীদ মিনার। সেই শহীদ মিনারেই ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মুক্তিযোদ্ধাসহ পুরো সুনামগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। তবে এখন এই মিনারটির কদর দেখা যায় কেবল শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস এলেই। দিবসের একদিন আগে শহীদ মিনারের আশ-পাশ পরিচ্ছন্ন করা হয়। বাকি দিনগুলো এই স্মৃতির মিনার পড়ে থাকে অযত্ন-অবহেলায়।

এক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয়রা এই শহীদ মিনারের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ দাবি করলেও প্রশাসন বলছে, শহীদ মিনারের জায়গা নিয়ে সিনিয়র সহকারি জজ আদালতে মামলা চলছে বিধায় এটির উন্নয়নে কাজ করা যাচ্ছে না। তাই বিষয়টির সুরাহা হওয়ার দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে প্রশাসনকে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই সুনামগঞ্জ মুক্তদিবসের পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও হাওরাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক অধিনায়ক সালেহ চৌধুরী মিনারটির নকশা করে দেন। বালাট সাব-সেক্টরের অধিনায়ক মেজর মোতালিব ঐতিহ্যবাহী এই শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেন। বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বর এই শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান মুক্তিযোদ্ধা ও সর্বস্তরের মানুষ। পরের দিনগুলোতেও মুক্তিযুদ্ধকালে গড়ে ওঠা এই শহীদ মিনারেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান সুনামগঞ্জের মানুষ।

কিন্তু ক্রমেই দেখা যায়, দিবস ছাড়া বাকি দিনগুলোতে এই শহীদ মিনার পড়ে থাকে অযত্নে-অবহেলায়। এর মধ্যে ২০১৪ সালে জায়গা নিয়ে মামলা হলে শহীদ মিনারের রক্ষণাবেক্ষণ আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এই অবহেলা এবং মামলার জালে পড়া শহীদ মিনারের পাশে কিছুদিন আগে হঠাৎ গজিয়ে ওঠে বাণিজ্যিক ভবন। কে বা কারা শহীদ মিনারের দেয়াল ঘেঁষে তা গড়ে তোলে তা স্পষ্ট না হলেও মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এক রাতের মধ্যে তা ভেঙে ফেলা হয়। যদিও শহীদ মিনারের দেয়ালটি আর মেরামত করা হয়নি।

Top

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আগের দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘুরে দেখা যায়, দিবসটি ঘিরে খানিকটা আলোকসজ্জা এবং আল্পনা আঁকা হলেও পর্যটক ও তারুণ্যের কাছে এই শহীদ মিনারের ইতিহাস জানার জন্য নেই কোনো সাইনবোর্ড বা ফলক। উদ্বোধনের একটি ফলক থাকলেও বোঝাই দায় কে এবং কত তারিখে তা উদ্বোধন করেন।

বিশিষ্টজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শহীদ মিনারের জায়গা নিয়ে বিবাদ বাঁধলেও মুক্তিযোদ্ধারা ডিএস রোড এলাকায়ই এটি রাখার পরামর্শ দেন। তারা শহীদ মিনারটি সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণেরও দাবি তোলেন। কিন্তু প্রশাসন অনেকবার দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলেও এর বাস্তব ফল মেলেনি এখনো।

এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মালেক হোসেন পীর জাগো নিউজকে বলেন, ২০১৪ সালে শহীদ মিনারের জায়গার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় শহীদ মিনারের জায়গাটি বলা হয় জজ সাহেবের। কিন্তু আমরা যুদ্ধের সময় ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মুক্ত করার পর এই স্থানেই শহীদ মিনার তৈরি করি। তাই আমরা এই জায়গাটি মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়ার জন্য অনেকবার অনুরোধ করেছি। পরে ২০১৫ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের জায়গা দেয়ার জন্য পক্ষভুক্তি চেয়ে একই আদালতে পিটিশন দায়ের করি। সে সময় আদালত আমার পিটিশন খারিজ করে দেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পুনরায় পিটিশন দায়ের করেছি। আমরা চাই এই জায়গাটা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের নামে দেয়া হোক।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু শহীদ মিনারের ওপর মামলা। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যতদিন শহীদ মিনার মামলামুক্ত হবে না, ততদিন আমি শহীদ মিনারে ঢুকব না।

সামাজিক নাট্য সংগঠন রঙ্গালয় সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, আমাদের একমাত্র কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রক্ষণাবেক্ষণ নেই। এটির কথা শুধু জাতীয় দিবসগুলোতে মনে হয়। এখনতো বিজয় দিবসে ও স্বাধীনতা দিবসে জেলা কালেকটরেট প্রাঙ্গণে তৈরি করা অস্থায়ী বেদিতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানানো হয়। তাই শুধু ভাষার মাস এলেই প্রশাসনের শহীদ মিনারের কথা মনে হয়। বাকি দিনগুলো ধুলাবালি এবং গাছের ঝরাপাতায় নিমজ্জিত থাকে এই মিনার। আমরা চাই প্রশাসন এই শহীদ মিনারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সঠিকভাবে উদ্যোগ নিক। তাছাড়া তরুণ প্রজন্ম যেন এই শহীদ মিনারের ইতিহাস জানতে পারে, সেজন্যও একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হোক।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, আমাদের শহীদ মিনারটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। যে শহীদ মিনারটিকে প্রতিদিন ঝাড়ু দিয়ে পরিচ্ছন্ন করার কথা, সেটি হয় শুধু দিবসে। তাছাড়া রাতের বেলা অন্ধকারের মধ্যে থাকে শহীদ মিনারটি। শুধু দিবস এলেই আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়। প্রশাসনের উচিত এই শহীদ মিনারটি রক্ষণাবেক্ষণ করা।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জাগো নিউজকে বলেন, শহীদ মিনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। যেহেতু এই জায়গা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে তাই আমরা কিছু করতে পারছি না। যদি জায়গাটি মুক্তিযোদ্ধারা পেয়ে যান, তাহলে সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উন্নয়নে জেলা প্রশাসন কাজ করবে।

এইচএ/পিআর