ভাটার সময়ও দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছে সিএনজি অটোরিকশা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৩৫ এএম, ০৪ মার্চ ২০২১

বর্তমানে অ্যাপসভিত্তিক উবার, পাঠাওয়ের মতো যাত্রী পরিবহন সেবাগুলো বেশ জনপ্রিয়। এতে কিছুটা ভাটার মুখে পড়েছে সিএনজি চালিত অটোরিকশাগুলো। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ব্যাপকহারে যাত্রী পরিবহন শুরু করলে সিএনজিগুলো বাড়তি চাপের মুখে পড়ে। অবশ্য এতে কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন যাত্রীরা। কারণ অ্যাপসভিত্তিক পরিবহন জনপ্রিয় হওয়ার আগে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বাড়তি ভাড়া আদায় করতেন সিএনজিচালকরা। এই ভাটার সময়ও তারা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছেন।

সিএনজিচালকরা এই দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করেন মূলত চুক্তিভিত্তিক যাত্রীপরিবহনের নামে। মিটারভিত্তিতে যাত্রী পরিবহনের বিধান থাকলেও তা তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানেন না। যাত্রীদের সঙ্গে ভাড়া দর-কষাকষির মাধ্যমে নির্ধারণ করেন বা চুক্তিভিত্তিক দ্বিগুণ ও কখনো তার চেয়ে বাড়তি ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করা, ট্রাফিক পুলিশদের চাঁদাবাজি, ট্রাফিক পুলিশদের নিজস্ব অবৈধ সিএনজি ও এর বাইরেও অবৈধ সিএনজির চলাচল, সবকিছুর চড়া দামসহ নানা কারণে জিএনজিতে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় থামানো যাচ্ছে না।

২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিআরটিএর সংস্থাপন অধিশাখা প্রজ্ঞাপন জারি করে সিএনজি/পেট্রোল চালিত ৪-স্ট্রোক থ্রি-হুইলারের ভাড়া বাড়িয়ে ভাড়ার হার পুনঃনির্ধারণ করে। সেই অনুযায়ী, দৈনিক জমার হার ৯০০ টাকা, প্রথম ২ কিলোমিটার ৪০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা এবং যেকোনো দূরত্বে যাত্রী পরিবহনে বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন ভাড়া ৪০ টাকা।

jagonews24

সোমবার (১ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের দুই নম্বর গেটে অবস্থান করে দেখা যায়, ইলিয়াস নামের একজন চালক সিএনজি নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তখন দুজন যাত্রী আসেন। যাত্রীরা জানতে চাইলেন, মিরপুর ২ নম্বর যাবেন কি না। এরপর তারা জানতে চান ভাড়া কত। সিএনজি চালক বললেন, ২০০ টাকা দিয়েন। যাত্রীরা বললেন, ১০০ টাকা ভাড়া। তারপর দেড় শ টাকায় দুই নম্বর গেট থেকে মিরপুর ২ নম্বর যাত্রী দুজনকে নিয়ে যেতে সম্মত হন সিএনজিচালক।

শেরেবাংলা নগরের দুই নম্বর গেট থেকে মিরপুর ২ নম্বর পর্যন্ত রাস্তার দূরত্ব ৫ দশমিক ৩ কিলোমিটার। বিআরটিএ নির্ধারিত রেট অনুযায়ী, এখানে ভাড়া হওয়ার কথা ৮২ টাকারও কম। সেখানে ১৫০ টাকায় যাত্রীদের নিয়ে গেলেন চালক, যা বিআরটি নির্ধারিত ভাড়ার প্রায় দ্বিগুণ।

সরকার নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ দিলেও কোর্ট-টাই পরা এই যাত্রীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি লক্ষ্য করা গেল না। নাম না জানিয়ে একজন যাত্রী জাগো নিউজকে বললেন, ভোগান্তি একটা সময় আরও ছিল। উবার-পাঠাও আসার পরে সিএনজির চাহিদা কিছুটা কমেছে। আমরা এখন সহজেই পাই। ভাড়ার ক্ষেত্রেও খুব একটা সমস্যা হয় না। আগে আরও ভাড়া বেশি চাওয়া হতো।

যাত্রী দুজন আসার আগে কথা হচ্ছিল সিএনজিচালক ইলিয়াসের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে জানান, ঢাকায় তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে সিএনজি চালাচ্ছেন। এটা তার নিজের সিএনজি।

সিএনজিতে বাড়তি ভাড়া নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যে সময় যাত্রীর চাপ থাকে না, ২০০ টাকা ভাড়া দেড় শ টাকা হলেই চলে যান। ৫০ থেকে ১০০ টাকা কম ভাড়ায় যান। রাস্তাঘাটে যে সময় যাত্রীর চাপ বেশি থাকে, তখন যার কাছ থেকে যেমন নিতে পারেন। ২০০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকাও নেন, আবার ৪০০ টাকাও নেন।

jagonews24

মিটারে যাওয়ার প্রবণতা কমের বিষয়ে ইলিয়াস বলেন, ‘ধরেন, মিটারে যাত্রী নিয়ে যামু সোজাই। কিন্তু যানজট পড়ে গেলে হয়তো ফাঁকা রাস্তা দিয়ে গেলাম। তখন যাত্রী বলেন, “এদিক দিয়ে আসলা কেন? এত ভাড়া উঠছে কেন? আসমু দেড় শ টাকা, তোমার উঠছে ১৮০ টাকা। তোমার মিটার ঠিক নাই।” এরকম অনেক যাত্রী মাথাটা নষ্ট করে ফেলে। আর চুক্তিতে গেলে যানজট যতই পড়ুক আর না পড়ুক, ভাড়া যা তা দিতেই হবে। ঝামেলা নাই।’

এ বিষয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম জেলা সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব সাখাওয়াত হোসেন দুলাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘মিটারে যেতে না চাওয়ার কারণ হচ্ছে ঢাকা মহানগরীতে ১৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশা বৈধ। কিন্তু অবৈধ সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলছে ৩৫ হাজার। বৈধ সিএনজি মিটারওয়ালা। সরকার আইন করছে, সিএনজির প্রত্যেকদিন জমা দিতে হবে ৯০০ টাকা। কিন্তু মালিকরা দুই শিফটে ১৪০০ টাকা নিচ্ছে। এক শিফটে ১১০০-১২০০ টাকা জমা নিচ্ছে। বৈধ গাড়ির সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও সার্জেন্ট, ট্রাফিকের মামলা আছে অহরহ। অবৈধ সিএনজি যেগুলো আছে সেগুলোর কোনো মামলা নাই, কারণ এই গাড়িগুলো ট্রাফিক সার্জেন্ট, টিআইকে মাসোহারা দিয়ে চালায়। এই যানজটের শহরে সরকার নির্ধারিত প্রথম দুই কিলোমিটার ৪০ টাকা ও পরের প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা করে হলে ১০০ কিলোমিটার গাড়ি চালালে মাত্র ১২০০ টাকা বা তার একটু বেশি আয় হয়। কিন্তু চালককে জমা দিতে হয় ১২০০ টাকা, গ্যাস আছে ৫০০ টাকার, প্রতিদিন রোড খরচ আছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। সিএনজি চালকের ২০০০-২৫০০ টাকা প্রতিদিন খরচ আছে। অথচ বৈধভাবে আয় হচ্ছে মাত্র ১০০ কিলোমিটারে ১২০০ টাকা। তাহলে কীভাবে এই লোকটা সিএনজি চালাবে?’

তিনি বলেন, ‘এ জন্য প্রথমে অবৈধ সিএনজিগুলো বন্ধ করতে হবে। ট্রাফিক সার্জেন্ট, টিআইদের অবৈধ মাসোহারা নেয়া বন্ধ করতে হবে। আর টিআই, সার্জেন্টদের নিজস্ব হাজারও সিএনজি আছে। এগুলো মূল সমস্যা। এছাড়া আগে সচেতন হতে হবে রাষ্ট্রের, পুলিশ প্রশাসনের, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ট্রাফিকের। তারা কি দেখে না যে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে হাজার হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা। আইন তো বাস্তবায়ন করবে তারা ও বিআরটিএ। কিন্তু তারা তা করছে না।’

দুলাল আরও বলেন, ‘আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। আন্দোলনে সংগ্রামে সেমিনারে বলছি, মিটার ছাড়া গাড়ি চালাব না, যাত্রী হয়রানি করবো না। এই স্লোগান আমাদের আছে। আমরা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করলে কী হবে, ড্রাইভাররা ২০০ টাকা ঘরে নিতে পারে না। ঢাকা শহরে থাকতে গেলে ঘরভাড়া, বাচ্চাদের স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন বিষয়ের কারণে পারে না তারা, বাস্তবতা হচ্ছে এটা।’

jagonews24

এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাঠাও, উবার বা অ্যাপসভিত্তিক পরিবহনগুলো যেভাবে ভাড়া আদায় করে নির্ধারিত কিলোমিটার অনুযায়ী, ঠিক একইভাবে সিএনজি অটোরিকশাগুলো বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর অটোরিকশাগুলো যাত্রীদের পছন্দের গন্তব্যে যেতে বাধ্য। কিন্তু যাত্রীদের পছন্দের গন্তব্যে আমার মনে হয় ৯৮ শতাংশ অটোরিকশা এখনো যায় না। তারা যে পরিমাণ ভাড়া এখন পর্যন্ত আদায় করে তা মিটারের চেয়ে দ্বিগুণ। হয়তো একসময় তিনগুণ, চারগুণ বাড়তি ভাড়া আদায় করতো, সেখান থেকে হয়তো বেরিয়ে এসেছে। অ্যাপসভিত্তিক যে যানবাহনগুলো বিশেষ করে মোটরসাইকেল যখন যাত্রী পরিবহনে নামে তখন এই জগতে বড়ধরনের একটা ধাক্কা এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যে পরিমাণ সুপারিশগুলো দিয়েছিলাম, সরকার সেই বিষয়গুলো আমলে নেয়নি। সরকার মনে করেছে, ভাড়া বাড়িয়ে দিলেই কেবল তারা মিটারে চলবে, যাত্রী সেবার মান বাড়বে এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তারা নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু আমরা বারবার বলেছি, ভাড়া বাড়ানো বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ নয়। এটা নৈরাজ্য আরও বাড়িয়ে দেয়। ট্যাক্সিক্যাবের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, উপমহাদেশের দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ভাড়ার হার ধরা হয়েছিল ট্যাক্সিক্যাবের জন্য। সরকার ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া নির্ধারণ করল প্রতি কিলোমিটার ৬০ টাকা। ফলে ট্যাক্সিক্যাবে উঠলেই ভাড়া ছিল ১০০ টাকা। অথচ এখন ট্যাক্সিক্যাবগুলো হারিয়ে গেছে। এখন টেক্সিক্যাবগুলো অ্যাপসভিত্তিক ভাড়া চালাচ্ছে। এখন তারা প্রতি কিলোমিটার ২৫ টাকা ভাড়ায় কীভাবে যাতায়াত করে? কিন্তু সরকার নির্ধারণ করেছিল প্রতি কিলোমিটার ৬০ টাকা ভাড়া। কোথায় ৬০ টাকা, কোথায় ২৫ টাকা ভাড়া। এখন ২৫ টাকা ভাড়ায় যাতায়াত করেও তারা লাভবান হচ্ছে।’

পিডি/এমআরআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]