বছরে গড়ে ৬.৫ শতাংশ সবুজ এলাকা হারিয়েছে ঢাকা

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৫৭ পিএম, ২০ মার্চ ২০২৩
ফাইল ছবি

ঢাকা ২০০২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বার্ষিক ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সবুজ এলাকা হারিয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনার এ তথ্য জানান বক্তারা।

সোমবার (২০ মার্চ) সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বুয়েট কাউন্সিল ভবনে ‘ঢাকা নগরীর সবুজ এলাকা এবং এর রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

এতে বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম ও বিশেষ অতিথি হিসেবে ইউএসএআইডির অফিস অব ইকোনমিক গ্রোথের পরিচালক মোহাম্মদ এন খান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সেমিনারে বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খাঁন, বিভিন্ন অনুষদের ডীন ও বিভিন্ন বিভাগের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারে মূলপ্রবন্ধ পাঠ করেন ইউআরপির বিভাগের অধ্যাপক আফসানা হক ও অধ্যাপক আসিফ-উজ-জামান খান। তারা নগরের সবুজ রক্ষায় সিটি করপোরেশন, রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, বন অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ও সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়ার কথা বলেন। তারা সবুজ পরিসরের বাণিজ্যিকীকরণ কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে উল্লেখ করেন।

মূল আলোচনায় ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) এশিয়া প্যাসিফিক প্রোগ্রাম ম্যানেজার জাস্টিন গ্রিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তার বিভাগ ৭ মিলিয়ন হেক্টর গ্রাস ল্যান্ডের (বন, পার্ক, নগরের সবুজ এলাকা ইত্যাদি) প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জড়িত। বাংলাদেশে এ কাজে সম্পৃক্ত হতে পেরে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। আজ উপস্থাপিত এ গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্র, গবেষক ও নীতি নির্ধারকসহ কমিউনিটির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সদস্য (পরিকল্পনা) নাসিরুদ্দিন বলেন, গবেষণায় নাগরিকদের কথা প্রতিফলিত হয়েছে। সবুজ পরিসর ব্যবস্থাপনায় সব অংশিদারদের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। করোনা মহামারিতে সবুজ পরিসরের প্রয়োজনীয়তা আমরা নতুনভাবে বুঝতে পেরেছি। আজকের গবেষণা ও আলোচনায় যা উঠে এসেছে, তা নিয়ে রাজউক দুই সিটি করপোরেশনকে নিয়ে আলোচনায় বসবে। রাজউক ও সিটি করপোরেশনে গ্রীণ ডিপার্টমেন্ট থাকতে পারে। এ ব্যাপারে নতুন পদ/অর্গানোগ্রাম তৈরি প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবুজ পরিসর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের মাঠগুলোকে প্রতিষ্ঠান ছুটির পর কম্যুনিটির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বলেন নগরে বিভিন্ন মানুষের জন্য বিভিন্ন রকমের সবুজ এলাকা দরকার। এই ভিন্নতাকে আমলে নেয়া দরকার। এছাড়া গুলশান, বনানী ইত্যাদি এলাকার স্থানিক পরিকল্পনা ও সবুজ এলাকা নানা শক্তিশালী গোষ্ঠীর চাপে পরিবর্তন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, উপস্থাপনায় উঠে এসেছে শহর এলাকায় সমাজের কিছু শ্রেণির মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে সুযোগ-সবিধা থেকে। তিনি আর বলেন, এখানে ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শব্দটিকে যাতে আরো সচেতনতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয় এবং ইতিহাসের সঙ্গে তার যেন সংযোগ থাকে। ড্যাপের সঙ্গে সংযোগ রেখে গ্রিন স্পেসগুলো নিয়ে যাতে আলাদা প্রকল্প নেওয়া হয়।

বুয়েটের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ইশরাত ইসলাম বলেন, জাতীয় সম্পদগুলো যখন কোথাও দেওয়া হবে, তখন যাতে সবাই তা ব্যবহার করতে পারেন তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পূর্বাচল, বসুন্ধরা ইত্যাদি সরকারি ও বেসরকারি প্লটভিত্তিক এলাকাগুলো, যেগুলো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, সেই সব জায়গায় ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন করা জরুরি বলে মত দেন। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট দরকার।

ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের (আইএবি) সভাপতি স্থপতি অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ বলেন, যেহেতু আমরা একটি পুঁজিবাদি অর্থনীতিতে আছি, পুঁজির ছোটাছুটির মধ্যে নগরের সবুজ আজ আক্রান্ত। কারণ নগরের সবুজকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক দেখানো যথেষ্ট কঠিন। তাই নগরের সবুজ রক্ষায় রাজনৈতিক কমিটমেন্ট জরুরি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. মাকসুদ হাশেম বলেন, সবুজ এলাকা ও গণপরিসরকে একসঙ্গে চিন্তা করা দরকার। এক্ষেত্রে পুরো শহরের জন্য গণপরিসর নীতিমালা ও পরিকল্পনা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী এ এস এম রায়হানুল ফেরদৌস বলেন, হাতিরঝিল প্রকল্প ঢাকার সবুজ ও গণপরিসর রক্ষায় রাজনৈতিক কমিটমেন্ট প্রয়োগের উদাহরণ। এখানে এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ৮২টি রিট মামলা হয়েছিল ও গৃহায়ণ সচিবের বিরুদ্ধে ১১টি আদালত অবমাননার মামলা হয়েছিল। কিন্তু সরকার তার রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকায় এসব মামলার বিষয়ে আলাদা ব্যবস্থা করেন ও এসবের দ্রুত নিষ্পত্তি করেন।

বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার খাঁন বলেন, আমাদের শহরগুলোতে যেসব সবুজ এলাকা আছে সে সবের পরিবেষ্টন দেয়াল তুলে/ভেঙে দিয়ে রাস্তা ও কম্যুনিটির সঙ্গে ওই সবুজ এলাকার সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি প্রকল্পের প্রস্তাবে সবুজ এলাকার মেইনটেন্যান্সের জন্য আলাদা জনবল অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

ইউএসএআইডির অফিস অব ইকোনমিক গ্রোথের পরিচালক মোহাম্মদ এন খান বলেন, ইউএসএইড বাংলাদেশে ১৯৯৮ সাল থেকে কাজ করছে। তারা মূলত সংরক্ষিত বন নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো শহরের সবুজ নিয়ে কাজ করেছে। ঢাকা ২০০২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বার্ষিক ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সবুজ এলাকা হারিয়েছে। সুতরাং জাতীয় ও স্থানীয় পরিকল্পনা ও নীতিতে এ ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, রাজউকের বিশদ এলাকা পরিকল্পনায় (ডিএপি) ঢাকার সবুজ সংরক্ষণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা যেমন কম ঘনবসতির শহরের মতো সবুজ দিতে পারবো না, তেমনি এখন যেমন আছে তেমন চলতে দিতে পারি না। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের সবাইকে তো ঢাকায় জায়গা দিতে পারবো না। আমাদের অবশ্যই ব্লকভিত্তিক উন্নয়নে যেতে হবে। আমরা দেখেছি ঢাকা শহরের জন্য নির্ধারিত ১৭৩ একর জলধারণ এলাকা বেদখল হয়ে গেছে। বর্তমানে মাত্র ৩ দশমিক ৫ একর জায়গা আছে। আমরা খালগুলোকে ওয়াসা থেকে নিয়ে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেছি এবং তারা অনেক খাল উদ্ধার করেছে। এ ব্যাপারে আমাদের নাগরিকদের চেতনাবোধ জাগ্রত করতে হবে। সেইসঙ্গে আমাদের সঠিকভাবে নগর ও স্থানিক পরিকল্পনা করতে হবে। নগরে পরিকল্পনা মাফিক মিশ্র এলাকা তৈরি এবং এর কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে। আজকের গবেষণায় রাজউক ও সিটি করপোরেশনে গ্রিন ডিপার্টমেন্টে কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এ ব্যাপারে লোকবল চায়, সরকার নতুন পদ/অর্গানোগ্রাম তৈরি কথা বিবেচনা করবে।

সেমিনারের সভাপতি বুয়েটের উপাচার্য বলেন, এ গবেষণা ও আলোচনা যথেষ্ট সময়োপযোগী। এ দেশ সুদূর অতীত থেকেই সবুজ ছিল। কিন্তু এখন আমাদের এখানে সবুজ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বুয়েট এ ব্যাপারে দেশ ও জনগণের কল্যাণে এর মেধা ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করবে।

এমএএইচ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।