চট্টগ্রাম বন্দর

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা

সম্পাদকীয় ডেস্ক
সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৩১ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০২৬

আব্দুল্লাহ আল মামুন

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশের মোট আমদানি–রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই বন্দরনির্ভর হওয়ায় এর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকীকরণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনায় অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা যৌথ অংশীদার যুক্ত করার প্রস্তাব নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং একই সঙ্গে উন্মোচন করেছে সম্ভাবনার বিস্তৃত দিগন্ত।

যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন, শক্ত রাষ্ট্রীয় তদারকি, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অংশীদারত্ব চুক্তি দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে। এটি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম।

চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা অপারেশনাল ধীরগতি। জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে আমদানি ও রপ্তানিকারকদের ওপর। আধুনিক ও অভিজ্ঞ অপারেটরের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা যুক্ত হলে বন্দরের দৈনিক কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। দ্রুত লোড–আনলোড, উন্নত লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য চলাচলের স্বচ্ছতা পুরো অর্থনীতির গতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এতে ব্যবসায়িক ব্যয় কমবে, আমদানি–রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।

একটি দেশের বন্দরের সক্ষমতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থার অন্যতম প্রধান সূচক। এনসিটি ও সিসিটির আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের অপারেশনাল পদ্ধতি চালু হলে বাংলাদেশ নতুনভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারবে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় এমন একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর সহজেই একটি আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে রূপ নিতে পারে। ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মতো বৃহৎ বাজারের ট্রানশিপমেন্ট চাহিদা আকর্ষণ করা গেলে এর সুফল সরাসরি দেশের রাজস্ব আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানে প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে উন্নত বন্দর সুবিধা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শিল্পকারখানা স্থাপনে আগ্রহী করবে, যা ইকোনমিক জোন, গুদাম, লজিস্টিক পার্ক ও শিল্পাঞ্চলে নতুন বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করবে।

চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও আলোচিত বিষয় শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ। আশঙ্কা রয়েছে, অংশীদারত্ব হলে শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়বেন। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে। আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনায় নতুন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকদের মধ্যে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে তারা তুলনামূলকভাবে উচ্চদক্ষতা ও উন্নত বেতনভিত্তিক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি, লজিস্টিক, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, নেভিগেশনসহ নানা খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। টার্মিনাল সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বন্দরের বাইরের পরিবহন, গুদামজাতকরণ, সরবরাহ শৃঙ্খল ও কাস্টমস ক্লিয়ারিং খাতেও কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়ে।

রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বৃদ্ধির দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তিতে সাধারণত কনসেশন ফি, মুনাফার অংশীদারত্ব, বন্দর ব্যবহার ফি এবং বাড়তি কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে সরকারের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একটি বন্দর যখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে, তখন তার ব্যবহারও বহুগুণ বাড়ে। ফলে শুধু রাজস্ব নয়, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সামাজিক বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিদেশি অপারেটররা সাধারণত বিশ্বমানের যন্ত্রপাতি, ট্র্যাকিং সিস্টেম, সফটওয়্যার ও নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তাদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে স্থানীয় জনশক্তি এসব প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে। এটি ভবিষ্যতে দেশীয় বন্দর ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভর সক্ষমতা গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে।

আধুনিক টার্মিনাল মানেই দ্রুত পণ্য পরিবহন, নির্ভরযোগ্য সাপ্লাই চেইন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা বৃদ্ধি। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি মূলত ‘স্পিড ইকোনমি’নির্ভর। যে দেশ যত দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে, সে দেশ তত বেশি রপ্তানি অর্ডার পায়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ ও ইলেকট্রনিক্সসহ প্রায় সব রপ্তানি খাতই গতি ও সময়নির্ভর। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন তাই সরাসরি এসব খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।

সবশেষে বলা যায়, এনসিটি ও সিসিটি পরিচালনায় অংশীদারত্ব চুক্তি বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারে। এটি কেবল বন্দর ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যথাযথ পরিকল্পনা, শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণ, কার্যকর রাষ্ট্রীয় তদারকি এবং চুক্তির সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। আন্তর্জাতিক মানে চট্টগ্রাম বন্দরকে উন্নীত করা সময়ের দাবি, আর এনসিটি–সিসিটি চুক্তি সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি বাস্তব ও সম্ভাবনাময় পথ দেখাতে পারে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।