কারান্তরালে মানবিকতা

ম্যান্ডেলা বিধিমালা ও সমঅধিকারের লড়াই

ড. মতিউর রহমান
ড. মতিউর রহমান ড. মতিউর রহমান , গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।
প্রকাশিত: ০৯:৪৯ এএম, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সেই রাষ্ট্রের কারাগারগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। আধুনিক বিচারব্যবস্থায় কারাগারকে কেবল অপরাধের দণ্ড প্রদানের স্থান হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে একজন ব্যক্তিকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসিত করার একটি সংশোধনাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা আইনগত কারণে হরণ করা হলেও তার মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো হরণ করার অধিকার রাষ্ট্র বা কোনো কর্তৃপক্ষের নেই। এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালা’ গ্রহণ করে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দিদের সাথে আচরণের জন্য জাতিসংঘের ন্যূনতম মানদণ্ড হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার সম্মানে এই নামকরণ করা হয়েছে, যিনি দীর্ঘ সাতাশ বছর কারারুদ্ধ থেকে অনুধাবন করেছিলেন যে, কারাগারের দেয়াল ও পরিবেশ একজন মানুষের আত্মাকে কীভাবে বিকৃত করতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির চরিত্র বুঝতে হলে তার উচ্চবিত্ত নাগরিকদের প্রতি আচরণ নয়, বরং তার কয়েদিদের প্রতি আচরণ পরীক্ষা করা উচিত। অথচ বাংলাদেশের প্রধান কারাগারগুলোর বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। বিশেষ করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো স্পর্শকাতর স্থানে অব্যবস্থাপনা ও বৈষম্যের যে চিত্র গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়, তা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ।

নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালার মূল ভিত্তি হলো মানবিকতা ও মর্যাদা। এই নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, ভাষা বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে বন্দিদের মধ্যে কোনো প্রকার তফাত করা যাবে না। প্রতিটি বন্দি সমমানের স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের অধিকার রাখেন। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, প্রভাব ও অর্থের জোরে কারাগারের অভ্যন্তরে এক ধরনের কৃত্রিম শ্রেণিবিভাগ তৈরি করা হয়। বিত্তবান ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বন্দিরা কারাগারের ভেতরে এমন সব সুবিধা ভোগ করেন যা সাধারণ বন্দিদের জন্য অকল্পনীয়।

কারাবিধি লঙ্ঘন করে প্রভাবশালীদের জন্য বিশেষ আবাসন ও উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করার যে প্রবণতা, তা মূলত আইনি সমতার ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে। যখন কারাগারের ভেতরে অর্থের বিনিময়ে নিয়ম ভেঙে সুযোগ-সুবিধা কেনা যায়, তখন সেটি আর সংশোধনাগার থাকে না, বরং দুর্নীতির একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়। জেল কোড উপেক্ষা করে বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য আত্মীয়-স্বজনের সাথে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া কিংবা বাইরের রান্না করা খাবার অননুমোদিতভাবে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে একদল বন্দী যেমন বিশেষ সুবিধা পান, সাধারণ বন্দিরা তেমনি বঞ্চিত হন তাদের প্রাপ্য ন্যূনতম অধিকার থেকে। এই দ্বিমুখী ব্যবস্থা বন্দিদের মধ্যে ক্ষোভ এবং বৈষম্যের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, যা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

কারাগারের অব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান। ম্যান্ডেলা বিধিমালা অনুযায়ী বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা এবং মানসিক সহায়তা প্রদান করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক এই মানদণ্ড অনুসারে বন্দিরা সাধারণ জনগণের মতো একই মানের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারী। অথচ অভিযোগ রয়েছে যে, কারাগারের মেডিক্যাল অফিসাররা সাধারণ বন্দিদের সাথে চরম উদাসীন আচরণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সাধারণ রোগীদের সঠিক রোগ নির্ণয়ে মনোযোগ দেন না এবং তাদের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখান না।

বিশেষ রাজনৈতিক প্রভাব বা আর্থিক সামর্থ্যের কারণে চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বিভাজন তৈরি হয়, তা বন্দিদের জীবনের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। যেখানে সাধারণ বন্দিরা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, সেখানে প্রভাবশালীরা সামান্য অসুস্থতার অজুহাতে উন্নত হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করার সুযোগ পান। এই ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে পুষ্ট করে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার রাজনৈতিক বা আর্থিক মানদণ্ডে নির্ধারিত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কারাগারের অভ্যন্তরে খাবারের ক্ষেত্রে যে দ্বিমুখী নীতি পরিলক্ষিত হয়, তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। সাধারণ বন্দিরা যখন পুষ্টিহীন ও নিম্নমানের খাবার গ্রহণে বাধ্য হন, তখন প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে উন্নতমানের খাবারের বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। জীবন ধারণের এই অপরিহার্য উপাদানে এমন প্রকট বৈষম্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তদুপরি, বন্দিদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত সাবান বা তেলের মতো বরাদ্দকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণে অনিয়ম এবং আত্মসাতের অভিযোগগুলো কারা কর্তৃপক্ষের চরম নৈতিক স্খলন ও প্রশাসনিক দুর্নীতিরই বহিঃপ্রকাশ।

পুষ্টি ও খাদ্যের গুণমান রক্ষা করা বন্দিদের সুস্থ থাকার প্রধান শর্ত। নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালাতে সুষম ও পুষ্টিকর খাবারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। বন্দিদের শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রধান শর্ত হলো মানসম্মত পুষ্টি নিশ্চিত করা। অভিযোগ রয়েছে যে, বন্দিদের প্রতিদিন যে খাবার সরবরাহ করা হয় তার পুষ্টিমান অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মানদণ্ডেও কম, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ন্যূনতম দৈহিক চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

উদ্বেগের বিষয় হলো, খাদ্যের এই নিম্নমান ও সেকেলে বণ্টন প্রক্রিয়া আজও সেই ব্রিটিশ আমলের ধারা অনুসরণ করে চলছে, যা আধুনিক ও মানবিক কারাব্যবস্থাপনার সংজ্ঞার সাথে সম্পূর্ণ সংঘাতপূর্ণ। মূলত, কারাগারের সাপ্লাই চেইন বা রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবশালীদের আধিপত্যই খাদ্যের মানকে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে, যা বন্দিদের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

কারাগারের অভ্যন্তরে খাবারের ক্ষেত্রে যে দ্বিমুখী নীতি পরিলক্ষিত হয়, তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। সাধারণ বন্দিরা যখন পুষ্টিহীন ও নিম্নমানের খাবার গ্রহণে বাধ্য হন, তখন প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে উন্নতমানের খাবারের বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। জীবন ধারণের এই অপরিহার্য উপাদানে এমন প্রকট বৈষম্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তদুপরি, বন্দিদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত সাবান বা তেলের মতো বরাদ্দকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণে অনিয়ম এবং আত্মসাতের অভিযোগগুলো কারা কর্তৃপক্ষের চরম নৈতিক স্খলন ও প্রশাসনিক দুর্নীতিরই বহিঃপ্রকাশ।

প্রশাসনিক দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং চরম অব্যবস্থাপনা কারাগারের সার্বিক পরিবেশ ও শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারাবিধি অনুযায়ী বন্দিদের জন্য পরিবার ও স্বজনদের সাথে নির্দিষ্ট সময়ে টেলিফোনে কথা বলা কিংবা সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ থাকা একটি সাধারণ আইনি অধিকার। তবে অভিযোগ রয়েছে যে, এই ন্যূনতম সুবিধাটুকু ভোগ করার ক্ষেত্রেও বন্দিদের অনেক সময় নিয়মবহির্ভূতভাবে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা প্রকারান্তরে মৌলিক অধিকার হরণের শামিল।

দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কিছু বন্দিকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করার মাধ্যমে বৈষম্য সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, জামিনপ্রাপ্ত দরিদ্র বন্দিদের প্রাপ্য যাতায়াত ভাতা বা অন্যান্য আইনানুগ পাওনা বুঝিয়ে না দিয়ে তা আত্মসাৎ করার মতো অমানবিক কর্মকাণ্ডগুলো প্রশাসনের নৈতিক অবক্ষয়কেই স্পষ্ট করে তোলে, যা মুক্তিপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তির পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

কারাগারকে কেবল বন্দিশালা নয়, বরং একটি প্রকৃত সংস্কারমূলক ও মানবিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালার যথাযথ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে জাতিসংঘ মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তর (UNODC) এর উদ্যোগে কারা কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে যে বিশেষ অনলাইন প্রশিক্ষণ বা ই-লার্নিং মডিউলের ব্যবস্থা রয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হলো কর্মকর্তাদের মধ্যে মানবাধিকারের প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং বন্দিদের সাথে আচরণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করা।

বাংলাদেশে এই আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন এখনো অত্যন্ত অপ্রতুল ও হতাশাজনক। কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, কারা প্রশাসনকে একটি স্বচ্ছ কাঠামোর অধীনে এনে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবিতে পরিণত হয়েছে।

কারাগারের নানাবিধ ব্যর্থতা ও অনিয়মকে আড়াল করতে অনেক সময় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দির চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়। তবে বাস্তবিক অর্থে, প্রধান অন্তরায়টি কেবল অপ্রতুল অবকাঠামো নয়, বরং কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতিবাচক মানসিকতা। যখন একজন কারারক্ষী বা কর্মকর্তা কোনো বন্দির মানবিক সত্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে কেবল একজন 'দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী' হিসেবে তুচ্ছজ্ঞান করেন, তখনই বৈষম্য ও অমানবিক আচরণের সূত্রপাত হয়। তাই নিবিড় ও আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের এই মানসিক জড়তা কাটিয়ে তোলা অপরিহার্য, যাতে তারা কারাগারকে নিছক শাস্তির প্রকোষ্ঠ হিসেবে না দেখে বরং পথভ্রষ্ট মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি কেন্দ্র বা সংশোধনাগার হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালার সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, কারাবন্দিদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও কার্যকর পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য কেবল একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট আইনগত বাধ্যবাধকতা। কারাগারের মূল দর্শন কেবল অপরাধীকে চার দেয়ালের মাঝে অবরুদ্ধ করে রাখা নয়, বরং তাদের বিভিন্ন সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা।

এ ধরনের মহৎ উদ্যোগ একদিকে যেমন বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটিয়ে তাদের হীনম্মন্যতা দূর করে, অন্যদিকে কারামুক্তির পর সমাজে তাদের সম্মানজনক ও স্থায়ী পুনর্বাসনের পথ প্রশস্ত করে। তবে দুঃখজনকভাবে, বিদ্যমান প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির গভীর শিকড় এই মানবিক লক্ষ্যগুলোকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে অর্থের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা লাভের যে অপসংস্কৃতি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে, তা নির্মূল করতে হলে কঠোর নজরদারি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সার্বিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবিতে পরিণত হয়েছে।

একটি বৈষম্যহীন সমাজ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের যে প্রদীপ্ত জনআকাঙ্ক্ষা বর্তমান সময়কে তাড়িত করছে, তার ছোঁয়া কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের ভেতরেও পৌঁছানো আজ অত্যন্ত আবশ্যক। কারাগার হওয়া উচিত এমন একটি নিরাপদ ও সংশোধনীমূলক পরিবেশ, যেখানে একজন ব্যক্তি তার অতীত কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করার পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন এবং বিভিন্ন বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুক্তি-পরবর্তী জীবনের জন্য নিজেকে একজন দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে পারবেন। সামাজিক বৈষম্যের অবসান কেবল বাইরে নয়, বরং কারাগারের ভেতরেও নিশ্চিত করা গেলে তবেই একটি প্রকৃত মানবিক রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হবে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের প্রতিটি কারাগারকে নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালার বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী আমূল সংস্কার করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবিতে পরিণত হয়েছে। বন্দিদের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা, সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার মাধ্যমেই কেবল একটি আধুনিক ও জনবান্ধব কারাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। কারাগার কোনোভাবেই প্রভাবশালীদের অনৈতিক বিলাসকেন্দ্র কিংবা সাধারণ বন্দিদের জন্য দুঃসহ নরককুণ্ড হতে পারে না।

মূলত, একটি রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অসহায় ও সীমাবদ্ধ নাগরিকের—যাদের কোনো প্রতিবাদ করার শক্তি নেই—তাদের সাথে কেমন আচরণ করছে, তার ওপরই সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি এবং নৈতিক শক্তির প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে। তাই কারাগারের অন্ধকার দূর করে সেখানে মানবাধিকারের আলো জ্বালানোই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।