শিক্ষা সংস্কারের নানা দিক ও একটি বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কার দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আলোচনার বিষয়। মানোন্নয়ন, সমতা, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি—এসব প্রশ্ন ঘিরেই সাধারণত শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা উঠে আসে। বিএনপির ঘোষিত শিক্ষা প্রস্তাবনাও এই ধারার অংশ। এই লেখায় পরিকল্পনায় উল্লিখিত বিষয়গুলোকেই ভিত্তি করে এর সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী বিএনপির শিক্ষা ভাবনার উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আনন্দময় শিক্ষা পরিবেশ, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষার বিস্তার, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির প্রসার, শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক তৈরির উদ্যোগ। সামগ্রিকভাবে এতে আধুনিকায়ন ও কর্মসংস্থানমুখী একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়, যা বর্তমান বাস্তবতায় অনেকের কাছেই ইতিবাচক মনে হতে পারে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের প্রশ্নে কিছু বিষয় আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার কথা বলা হলেও শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তি কীভাবে শেখার গুণগত মান বাড়াবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুপস্থিত। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ধারাবাহিক সহায়তা এবং মূল্যায়ন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এসব উপাদান সমন্বিতভাবে না এলে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।
কারিকুলাম সংস্কার সম্পর্কেও পরিকল্পনায় তুলনামূলকভাবে কম বিস্তারিত পাওয়া যায়। আনন্দময় শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা বা কারিগরি দক্ষতার কথা উল্লেখ থাকলেও পাঠ্যবইয়ের দর্শন, শেখার লক্ষ্য কিংবা পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। অথচ শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কারিকুলাম ও মূল্যায়ন কাঠামো একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
অর্থনৈতিক দিকটি নিয়েও কিছু প্রশ্ন সামনে আসে। প্রযুক্তি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন, মিড-ডে মিল বা কারিগরি ল্যাব স্থাপনের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ও ধারাবাহিক অর্থায়ন প্রয়োজন। পরিকল্পনায় মোট ব্যয়ের পরিমাণ, শিক্ষা খাতে জিডিপির কত শতাংশ বরাদ্দের চিন্তা করা হচ্ছে বা অর্থের উৎস কী হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই। ফলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়।
গ্রাম ও শহরের বাস্তবতার পার্থক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শহরাঞ্চলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং শিক্ষক উপস্থিতির মতো মৌলিক বিষয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বৈষম্য কীভাবে ধাপে ধাপে কমানো হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনায় আরও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শক্তিশালী হতে পারত।
দার্শনিক দিক থেকে পরিকল্পনাটিতে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব লক্ষ্য করা যায়। এটি নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে নাগরিক শিক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইতিহাসচেতনা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশের বিষয়গুলোও দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ—এ দিকগুলো পরিকল্পনায় আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হলে ভারসাম্য বাড়তে পারত।
শিক্ষা প্রশাসনের স্বায়ত্তশাসন এবং শিক্ষক নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার বিষয়েও পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট অবস্থান তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। এই ক্ষেত্রগুলোতে নীতিগত স্পষ্টতা থাকলে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা আরও বাড়তে পারে।
তবে এসব প্রশ্নের পাশাপাশি পরিকল্পনার কিছু ইতিবাচক দিকও উল্লেখযোগ্য। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এবং ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব স্বল্পমেয়াদে কিছু বাস্তব সুফল দিতে পারে। পরিকল্পনার ভাষাও তুলনামূলকভাবে সহজ ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, যা সামাজিক সমর্থন তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এবং ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব স্বল্পমেয়াদে কিছু বাস্তব সুফল দিতে পারে। পরিকল্পনার ভাষাও তুলনামূলকভাবে সহজ ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, যা সামাজিক সমর্থন তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপির শিক্ষা প্রস্তাব শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক চিহ্নিত করে। তবে এই প্রস্তাবগুলোকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে আরও স্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা, বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং কাঠামোগত প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা সংস্কারকে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতায় রূপ দিতে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা জরুরি।
দুই.
নৈতিকতা, শিক্ষা ও নারীর শিক্ষার সুযোগ: জামায়াতে ইসলামী–এর পরিকল্পনার একটি দৃষ্টিকোণ
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে মান, সমতা, গবেষণা সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্য—এই চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের শিক্ষা পরিকল্পনা উপস্থাপন করে থাকে। জামায়াতে ইসলামী–এর প্রস্তাবিত শিক্ষা নীতিও সেই ধারারই অংশ। এখানে লক্ষ্য হলো নীতিগত ও কাঠামোগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা, সমর্থন বা বিরোধিতা নয়।
পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব। নৈতিক শিক্ষা শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে সহায়ক; তবে বাংলাদেশ একটি বহু ধর্ম, বহু মত ও বহু সংস্কৃতির দেশ। পরিকল্পনায় স্পষ্ট নয় যে ভিন্ন ধর্ম বা মতধারার শিক্ষার্থীরা কীভাবে অংশগ্রহণ করবেন। নৈতিকতার ব্যাখ্যা যদি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হয়, তাহলে শিক্ষার অভিজ্ঞতা কিছু শিক্ষার্থীর জন্য সীমিত হতে পারে।
মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় ধারণাগতভাবে ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, গবেষণা সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা নেই। ফলে সমন্বয় শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে কি না, তা পর্যবেক্ষণের বিষয়।
নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে। সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে, পাঠ্যবইয়ে কী অন্তর্ভুক্ত হবে এবং ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের অবস্থান কী হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক নিয়োগে ‘নৈতিক মানদণ্ড’ আরোপের বিষয়ও সংবেদনশীল। এটি সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে শিক্ষার মান উন্নত হতে পারে, অন্যথায় কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে।
নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্যোগ হলো—ইডেন কলেজ ও বদরুন্নেসা কলেজ একীভূত করে বিশ্বের বৃহত্তম নারী বিশ্ববিদ্যালয় গঠন। এটি নারীর শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা রাখে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার মান, অবকাঠামো, কোর্স ও গবেষণার সুযোগ, এবং অর্থায়ন—এই বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে পরিকল্পনা করা হলে উদ্যোগটি সফল হতে পারে।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব মোকাবিলায় পাঁচ লক্ষ গ্রাজুয়েটকে মাসিক ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব শিক্ষার্থীদের স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের কাঠামো স্পষ্ট করা হলে এটি আরও কার্যকর হতে পারে।
কারিগরি শিক্ষা ও ‘হালাল’ শিল্পকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারের প্রয়োজন—যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস বা বায়োটেকনোলজি—সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ আরও প্রসারিত হতে পারে। গবেষণা, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা এবং ক্যাম্পাস সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে।
সারসংক্ষেপে, জামায়াতের শিক্ষা পরিকল্পনা নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেয়। ইডেন–বদরুন্নেসা বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাবনার মতো উদ্যোগ নারীর শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে পারে। সফল বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনাগুলোতে আরো স্পষ্ট কাঠামো, মান নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক সমন্বয় প্রয়োজন।
তিন.
গণসংহতি আন্দোলনের শিক্ষা পরিকল্পনা: প্রগতিশীল ভিশন, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
গণসংহতি আন্দোলনের শিক্ষা ভাবনা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রগতিশীল এবং নৈতিক দিক থেকে সুস্পষ্ট। গণসংহতি আন্দোলন শিক্ষাকে কেবল দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং অধিকার, মুক্ত চিন্তা ও সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত একটি মৌলিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে চায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশের প্রচলিত শিক্ষা বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। তবে এই শক্তিশালী দর্শনের সঙ্গে বাস্তবায়ন কাঠামো, অর্থায়ন, শিক্ষক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক সক্ষমতার সম্পর্ক পর্যালোচনা করলে কিছু সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ সামনে আসে।
প্রথমত, শিক্ষা দর্শন সুস্পষ্ট হলেও বাস্তবায়নের কাঠামো এখনও অস্পষ্ট। গণসংহতি শিক্ষাকে অধিকারভিত্তিক ও মুক্ত চিন্তানির্ভর করার কথা বললেও, এটি কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে, কোথা থেকে সংস্কার শুরু হবে কিংবা ধাপে ধাপে রূপান্তরের সময়সূচি কী—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা কম। বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক, আলাদা শিক্ষা কমিশন বা পাঁচ–দশ বছরের বাস্তবায়ন রোডম্যাপের অনুপস্থিতি নীতিকে কার্যকর পর্যায়ে নিতে কিছুটা জটিল করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শিক্ষা এবং “শিক্ষা পণ্য নয়” ধারণা দার্শনিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও অর্থায়নের প্রশ্নে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন। বাজারমুখী শিক্ষার সমালোচনা করা হলেও রাষ্ট্র কীভাবে এই বড় ব্যয় বহন করবে, তার নির্দিষ্ট আর্থিক কৌশল আলোচনায় আসেনি। কর সংস্কার, সম্পদশালীদের ওপর অতিরিক্ত কর বা রাষ্ট্রীয় ব্যয় পুনর্বিন্যাসের মতো বিকল্পগুলো নীতিতে বিস্তারিতভাবে উঠে এলে প্রস্তাবটি আরও বাস্তবসম্মত হতে পারত।
তৃতীয়ত, সমালোচনামূলক শিক্ষা বা Critical Pedagogy–এর প্রতি জোর প্রশংসনীয় হলেও বাস্তব প্রয়োগ সহজ নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বড় ক্লাস সাইজ, পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং সীমিত শিক্ষক প্রশিক্ষণের কারণে এই পদ্ধতির কার্যকর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। শিক্ষক পুনঃপ্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি সংস্কার এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা থাকলে এই দর্শন বাস্তবে আরও ফলপ্রসূ হতে পারত।
চতুর্থত, শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষানীতির সংযোগ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। গণসংহতি আন্দোলন চাকরিমুখী শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরলেও দেশের বিদ্যমান বেকারত্বের বাস্তবতায় দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সংযোগ স্পষ্ট না হলে শিক্ষিত কিন্তু কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা তরুণদের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
পঞ্চমত, একক জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এটি বহুস্তরীয় সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মাধ্যম ও মাদ্রাসা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত মধ্যবিত্ত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে রূপান্তরের কৌশল স্পষ্ট হলে এই প্রস্তাব আরও গ্রহণযোগ্য হতো।
ষষ্ঠত, অ্যাকাডেমিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে নীতিগত অবস্থান শক্ত হলেও বাস্তব পরিস্থিতি জটিল। দলীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষার কথা বলা হলেও ছাত্ররাজনীতি, ক্যাম্পাস প্রশাসন সংস্কার কিংবা বিকল্প পরিচালন মডেল নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব লক্ষ্য করা যায়। ফলে স্বায়ত্তশাসনের আদর্শ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন থেকে যায়।
সপ্তমত, প্রান্তিক ও আদিবাসী শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা সীমিত। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে শিক্ষক প্রস্তুতি, পাঠ্যপুস্তক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন জরুরি—যেগুলো নীতিতে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচিত হলে কার্যকারিতা বাড়ত।
সবশেষে, রাজনৈতিক বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। গণসংহতি আন্দোলন এখনও বৃহৎ সংসদীয় শক্তি বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে নীতিগত প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথ বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কঠিন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, গণসংহতি আন্দোলনের শিক্ষা পরিকল্পনা নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শক্তিশালী একটি ভিশন উপস্থাপন করে। তবে অর্থায়ন, বাস্তবায়ন কাঠামো, শ্রমবাজার সংযোগ এবং রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নগুলো আরও স্পষ্টভাবে সমাধান করা গেলে এই প্রগতিশীল দর্শন বাস্তব নীতিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়বে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]
এইচআর/এমএস