বিশ্ব বরেণ্যদের চোখে বঙ্গবন্ধু

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৩২ এএম, ১৫ আগস্ট ২০১৯

কৃষিবিদ মো. আব্দুল মোমিন

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখে ছিলেন এক ঐতিহাসিক ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ। তাই অনন্য সাধারণ এ নেতাকে স্বাধীনতার প্রতীক বা রাজনীতির ছন্দকার খেতাবেও আখ্যা দিয়েছেন অনেকে। বিদেশি ভক্ত, কট্টর সমালোচক, এমনকি শত্রুরাও তাদের নিজ নিজ ভাষায় তার উচ্চকিত প্রশংসা করেছেন তার ব্যক্তিত্ববোধ ও নেতৃত্বের। জাতির জনকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সেই নিদর্শনের কিছু উদাহরণ তুলে ধরতে আমার এই প্রয়াস। এই উপমহাদেশের বাঙালি মনীষীদের নিয়ে চালিত বিবিসির এক জরিপে সবাইকে ছাড়িয়ে যিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদেরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বিগত বিংশ শতাব্দীর জীবন্ত কিংবদন্তি কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি হিমালয় দেখেনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এ মানুষটি ছিলেন হিমালয়ের সমান। সুতরাং হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি। প্রসঙ্গত ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ক্যাস্ট্রোর সাক্ষাৎ হয়েছিল। ফিদেল কাস্ট্রো বলেছিলেন, “শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে”।

শ্রীলঙ্কার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষণ কাদির গামা (জাতির জনকের ন্যায় নৃশংস হত্যার শিকার) উপমহাদেশের এ মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তার স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে। তিনি বলেন, মুজিবুর রহমান রাজবংশের সন্তান নন, তিনি পাশ্চাত্যের বিলাসী উচ্চশিক্ষাও গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন এক নিভৃত পল্লীর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া সাধারণ মানুষ।

জনাব গামা বলেন, শেখ মুজিব বুদ্ধিজীবী ও শ্রমজীবী উভয় শ্রেণির মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন। বাংলার মানুষ তাদের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে জ্ঞানী, গুণী, শিক্ষিত, বাগ্মী বা প্রাণবন্ত নেতার সাক্ষাৎ পেলেও তার মতো সফল নেতা কেউ ছিলেন না। তিনি বাঙালি জাতির স্বপ্ন পূরণ করেছেন, তাদেরকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন।

ফিলিস্তিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের মতে, “আপসহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুমকোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।” বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন করতে গিয়ে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু নিজেই ছিলেন ‘ঐশ্বরিক আগুন’ এবং তিনি নিজেই সে আগুনে ডানা যুক্ত করতে পেরেছিলেন।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে এন দীক্ষিত বলেন, প্রথম সরকারপ্রধান জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশে বাংলাদেশের পৃথক জাতিসত্তায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর থেকে ৭১ সালের মার্চের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সংকট গভীর হওয়ায় মুজিব উপলব্ধি করেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ব্যাপক সমর্থনের ওপরই কেবল তার সংগ্রামের সাফল্য নির্ভরশীল নয় বরং এক্ষেত্রে ভারতের রাজনৈতিক ও আনুষঙ্গিক সমর্থন প্রয়োজন। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ মুজিব এ উপমহাদেশে স্বতন্ত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের পরিচয়ে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।’

ইন্দিরা গান্ধী জাতির পিতার প্রয়াণের খবর শুনে মন্তব্য করেছিলেন, “শেখ মুজিব নিহত হওয়ার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তার অনন্য সাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগনের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।” ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরকালীন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই উপমহাদেশের গণতন্ত্রের এক প্রতিমূর্তি, এক বিশাল ব্যক্তিত্ব এবং ভারতের এক মহান বন্ধু ছিলেন।’

তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করলেও ইতিহাসই তার প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। ফলে তার এককালীন ঘোরতর শত্রু তাকে মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে অভিহিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন পরবর্তী কালে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাবেক পাকিস্তানি (বেলুচিস্থান) অফিসার মেজর জেনারেল তোজাম্মেল হোসেন মালিক পরে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, (পাকিস্তানে তাকে ব্যাপকভাবে এই অপবাদে চিত্রিত করা হলেও) বস্তুত মুজিব দেশদ্রোহী ছিলেন না। নিজ জনগণের জন্য তিনি ছিলেন এক মহান দেশপ্রেমিক।

আরেক পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তা তৎকালীন পাকিস্তানি জান্তার মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালিক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ৭ মার্চের ভাষণের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে সালিক তার ‘পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল’ গ্রন্থে লিখেছেন, রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ঘরমুখী মানুষের ঢল নামে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল আশাব্যঞ্জক বাণী শ্রবণ শেষে মসজিদ অথবা গির্জা থেকে তারা বেরিয়ে আসছেন তারা।

তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার হবে- পাকিস্তানি সামরিক জান্তার এ ঘোষণার পর গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়। তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট এক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্য নিয়ে নতুন করে বাড়াবাড়ি করলে তার প্রতিক্রিয়া অনিবার্যভাবে পাকিস্তান সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে।’

বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর এ জনপ্রিয়তার কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পর্যন্ত আশঙ্কা করেন ইয়াহিয়ার প্রতি সমর্থনের জন্য নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এ কারণে পাকিস্তানকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়, শেখ মুজিবকে ফাঁসি অথবা দীর্ঘদিন কারাবন্দি করে রাখা হলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে। ১১ জন মার্কিন সিনেটর এক যৌথ বিবৃতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে।

হেলসিনকি ভিত্তিক বিশ্ব শান্তি পরিষদের (ওয়ার্ল্ড পিস কাউন্সিল) এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রহসনের বিচার এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ইয়াহিয়া খানের স্বৈরসরকার বিশ্ব দরবারে জনগণের অধিকার অবজ্ঞা ও সকল নৈতিকতা বিবর্জিত শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানের দলকে ১৬৭টি আসনে বিজয়ী করাই ছিল তার একমাত্র অপরাধ।

বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, বিশ্লেষক বা গণমাধ্যমের বাইরে বঙ্গবন্ধু বিদেশি জনগণেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। আমেরিকান মিশনারি জেনিন লকারবি’ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামে ছিলেন। তার ‘অনডিউটি ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে তিনি লিখেছেন এমন একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটছে, যে অনগ্রসর বাঙালি জাতিকে মুক্তির আস্বাদ দেবে, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান; আদর করে ডাকা হয় ‘মুজিব’।

ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের সদস্য ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শীর্ষস্থানীয় যোদ্ধা ফেনার ব্রকওয়ে বলেছেন, সংগ্রামের ইতিহাসে লেনিন, রোজালিনবার্গ, গান্ধী, নকুমা, লুমুমবা, ক্যাস্ট্রো ও আলেন্দের সঙ্গে মুজিবের নামও উচ্চরিত হবে। তিনি বলেন, তাকে হত্যা করা ছিল মানব হত্যার চেয়ে অনেক বড় অপরাধ। শেখ মুজিব শুধুমাত্র তার জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেননি। তিনি তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও সংগ্রাম করেছিলেন।

সেনেগালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদু দিউফ বঙ্গবন্ধুকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। ১৯৯৯ সালে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে এ আফ্রিকান নেতা বলেছিলেন, আপনি এমন এক মহান পরিবার থেকে এসেছেন, যে পরিবার বাংলাদেশকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা উপহার দিয়েছে। আপনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনার দেশের জনগণ যথার্থই বাংলাদেশের মুক্তিদাতা হিসেবে বেছে নিয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে নোবেল বিজয়ী উইলিবান্ট বলেছিলেন, “মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যেকোনো জঘন্য কাজ করতে পারে। ইরাকের প্রয়াত পেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম শহীদ। তাই তিনি অমর।”

জাতির পিতার প্রয়াণের খবর শুনে ইংলিশ এমপি জেমস লামন্ড বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশই শুধু এতিম হয়নি বিশ্ববাসী হারিয়েছে একজন মহান সন্তানকে। ভিয়েতনামের তৎকালীন নেতা কেনেথা কাউন্ডার মতে, শেখ মুজিবুর রহমান ভিয়েতনামি জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

পশ্চিম জার্মানির পত্রিকা শেখ মুজিবকে চতুর্দশ লুইয়ের সাথে তুলনা করে লিখেছিল, জনগণ তার কাছে এত প্রিয় ছিল যে লুইইয়ের মতো তিনি এ দাবি করতে পারেন, আমিই রাষ্ট্র। তৎকালীন আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজী এবং গতিশীল নেতা আগামী বিশ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।

বিবিসি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর খবরের অধিবেশনে মন্তব্য পেশ করে যে, শেখ মুজিব নিহত হলেন তার নিজেরই সেনাবাহিনীর হাতে অথচ তাকে হত্যা করতে পাকিস্তানিরা সংকোচবোধ করেছিল।

লেখক: পিএইচডি ফেলো, কৃষি সম্প্রসারণ ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ, শেকৃবি এবং ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর।

বিএ/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :