রুমিনের ফ্ল্যাট-প্লট-রাজনীতি

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ২৯ আগস্ট ২০১৯

পূর্বাচলে ১০ কাটার প্লট চেয়ে আলোচনার খোরাক হয়েছেন বিএনপির মহিলা কোটার এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। রুমিনের মত বিশেষ আবেদন করে নয়, রাজউকের আহ্বানে গণ আবেদনে সাড়া দিয়ে পূর্বাচলে আমি নিজে একটি প্লট পেয়েছি। কারও হয়তো বিশ্বাস হবে না, কোনরকম রাজনৈতিক আনুকুল্য ছাড়াই সাংবাদিক কোটায় পেয়েছি প্রথম পর্বেই। আবেদনপত্র নেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ আমলে, বরাদ্দ দিয়েছে বিএনপি সরকার। নিজের পূর্বাচলে প্লট আছে বলে এই প্রকল্পটির প্রতি আমার সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। তবে আমি রীতিমত হতাশ এই প্রকল্পের ভবিষ্যত এবং আমার প্লটের ভবিষ্যত নিয়ে।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে ‘পূর্বাচল উপশহর’ নামে আধুনিক একটি শহর বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল। তখন থেকে শুনে আসছি সেখানে সচিবালয় নিয়ে যাওয়া হবে, শহরটা হবে অনেকটা মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার মতো। কিন্তু আজ পর্যন্ত পূর্বাচল জমি হয়েই আছে, বাসযোগ্য হয়নি। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহের অবকাঠামো শেষ হয়নি। রাস্তা নির্মাণ হয়নি। ফ্লাইওভার, আকাশ রেল, পাতাল রেলের নিশানা চূড়ান্ত হয়েছে বলে শুনিনি। এমনকি বরাদ্দ দেওয়া সব জমিও গ্রাহকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

মাঝে মাঝে খবর দেখি- সেখানে ‘এই হবে, সে হবে’। পৃথিবীর সবচেয়ে উচুঁ টাওয়ারও নাকি বানানো হবে সেখানে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে দিল্লি, কায়রোর পর ঢাকার বাতাস হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত। ম্যানিলার পর পৃথিবীর সবচেয়ে গণবসতিপূর্ণ শহর ঢাকাকে তিলোত্তমা বানানোর জন্য আমরা প্রতিদিন নতুন নতুন পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছি। রাস্তা নেই তবুও দুনিয়ার যত নিকৃষ্ট বাস আছে নামিয়ে দিচ্ছি যাত্রী পরিবহনে।

এক কিলোমিটার রাস্তা পার হতে আধা ঘন্টা যাচ্ছে তাতে কি! ফ্লাইওভার বানাচ্ছি, মেট্রো রেলের লাইন লাগাচ্ছি, পাতাল রেলের পরিকল্পনা করছি। শুধু ঢাকাকে কত তাড়াতাড়ি সরিয়ে আরেকটি শহরে নেওয়া যায় সে কাজটা জরুরিভিত্তিতে করছি না। পরিস্থিতি যখন এমন তখন বিরোধী দলীয় সাংসদদের কাছে আমার প্রত্যাশা ছিল ২০ বছর চলে গেলেও সরকার কেন এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারছে না- সংসদে এই নিয়ে প্রশ্ন করবেন তারা। সরকারি দল অন্য কাউকে দোষও দিতে পারবে না কারণ এই ২০ বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের হাতেই প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সরকারি-বিরোধী কাউকেই এই প্রশ্ন করতে দেখলাম না। বরং দেখলাম বিএনপি এমপি রুমিন ফারহানা ঢাকা শহরে তার থাকার জন্য পর্যাপ্ত ফ্ল্যাট থাকার পরও পূর্বাচল প্রকল্পে নিজের জন্য একটি প্লট চেয়ে আবেদন করেছেন।

রুমিন ফারহানা গত ৯ জুন ২০১৯ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। তিনি সংসদে তার প্রথম দিনের বক্তৃতায় এই সরকার অবৈধ, সংসদ অবৈধ ইত্যাদি বলে চমক সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়েছিলেন। নীরব হয়ে পড়া বিরোধী দলের একজন সদস্যও যখন তীব্র ভাষায় সরকারকে আক্রমণ করে তখন যেসব মানুষ সরকারকে সমালোচনা করলে খুশি হন তারা উৎফুল্ল হয়েছিলেন। রুমিন ফারহানা সংসদ ভেঙে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। অথচ সংসদ সদস্য হিসেবে তার বয়স তখন দুই দিনও হয়নি। নিজের সদস্য পদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে সংসদ ভেঙে দেওয়ার কথা বলা, কম প্রশংসার কথা নয়।

রুমিন ফারহানা পেশায় আইনজীবী। সুতরাং বুদ্ধিসুদ্ধি যা আছে তাতে তিনি জানেন যে সরকার তার কথায় সংসদ ভাঙবে না। তার সদস্যপদও যাবে না। সুতরাং ফাউ প্রশংসা কুড়াতে পারলে ক্ষতি কি!

গত ৩ আগস্ট রুমিন ফারহানা তার স্বাক্ষরে সংসদ সদস্যের প্যাডে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর বরাবর যে চিঠি পাঠান সেখানে বলা হয়, ঢাকা শহরে তার নামে কোনো ফ্ল্যাট বা জমি নেই। ওকালতি ছাড়া তার অন্য আর কোনো ব্যবসা বা পেশা নেই। এ জন্য ঢাকার পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় তার ১০ কাঠার একটি প্লট প্রয়োজন। “এমতাবস্থায়, আপনার নিকট আমার আবেদন, আমার নামে ১০ কাঠা প্লট বরাদ্দ করলে আমি আপনার কাছে ‘চির কৃতজ্ঞ’ থাকব।”- এমন কথাও আছে সে চিঠিতে।

অথচ রুমিনের পিতা ভাষা সৈনিক মরহুম অলি আহাদকে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লালমাটিয়ায় একটি প্লট দিয়েছিলেন এবং সেটার উপরে এখন একটি ডেভলপার কোম্পানি ছয়তলা বিল্ডিং নির্মাণ করেছে। হিসাব মত রুমিন ফারহানার সেখানে পাঁচটি ফ্ল্যাট থাকার কথা ভাগাভাগিতে। যতটুকু জানি অলি আহাদ জীবিত অবস্থায় তাকে দানপত্র করে এই সম্পত্তি দিয়ে গিয়েছিলেন। রুমিন তার পিতার একমাত্র সন্তান এবং পিতা দান করে গিয়েছেন বলে তার পিতার ভাই-বোন বা তাদের সন্তানরাও তার মালিক হতে পারেনি।

এছাড়া চট্টগ্রাম শহরের একটি বেসরকারি হাউজিংয়ে মরহুম অলি আহাদের একটা ফ্ল্যাট আছে। রুমিন ফারহানার নানা প্রফেসর শাহাব উদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে পাওয়া তার মায়ের একটা ফ্ল্যাট এলিফ্যান্ট রোডে আছে। সেটার মালিক হবেন তিনি। নিজে একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী সেখানেও আছে তার প্রচুর আয়। আবার তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও সিঙ্গেল। এই বয়সে এত সম্পদ দিয়ে তিনি কী করবেন আমি জানি না।

‘অবৈধ সরকারের’ কাছে প্লট চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, তিনি সরকারের কাছে প্লট চাননি, তিনি চেয়েছেন রাষ্ট্রের কাছে। উকিল মানুষ, তাও আবার বিলাত ফেরত, ১৮ রকমের যুক্তি দিতে তারা অভ্যস্ত। তার চিঠি মন্ত্রণালয় থেকে বাইরে যাওয়ার পেছনে ‘সরকারের হাত’ রয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেছেন, “আমি এখন চ্যালেঞ্জ করব। যতজন এমপি এপ্লিকেশন করেছেন সব প্রকাশ করা হোক। রুমিন কেন একলা?”

জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের জন্য আমরা যখন সংগ্রাম করছি তখন তার এই তথ্য কি রাষ্ট্রীয় গোপন কোনও তথ্য যে সেটা মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ মাধ্যমে আসায় অন্যায় হয়েছে? এটি কি তার একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য যে ফাঁস করা যাবে না? রুমিনও রাজনীতি করেন। যারা সরকার চালায় তারাও রাজনীতি করেন। সুতরাং পরস্পরের দোষ খোঁজার মাঝে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু তিনি ভাল করেই জানেন কেন তার চিঠি ভাইরাল হয়েছে।

অনেকের হয়তো জানা নেই যে রুমিনের পিতা অলি আহাদ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর প্রত্যেক বছর ১৫ই আগস্ট ‘নাজাত দিবস’ পালন করতেন। প্রথম বছর পল্টনের বিডিএস মিলনায়তনে সভা করেছিলেন। মিলনায়তনটি এখন ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। সে বছর ‘নাজাত দিবস’-এর পোস্টারও করেছিলেন। অলি আহাদ বলতেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরই নাকি দেশ ‘আজাদ’ হয়েছে। সেজন্যই তিনি ১৫ই আগস্ট নাজাত দিবস পালন করেছেন। ডিএল বা ডেমোক্রেটিক লীগ দলটির প্রধান খন্দকার মোশতাক হলেও খন্দকার মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেমসহ অনেক নেতাই এই নাজাত দিবসের কোনো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতেন না। সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অলি আহাদই উৎসাহী ছিলেন এই নাজাত দিবস নিয়ে।

আমি শুনেছি অলি আহাদ সাহেব বঙ্গবন্ধুকে কাশ্মীরের বকসি গোলাম মোহাম্মদ বলে আখ্যায়িত করতেন। উল্লেখ্য গোলাম মোহাম্মদ এবং শেখ আব্দুল্লাহকে কাশ্মীর সমস্যার জন্য ইতিহাসে দায়বদ্ধ করা হয়। অথচ সুদীর্ঘকাল বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে অলি আহাদ একসঙ্গে আওয়ামী লীগ করেছেন। ভাষা সৈনিক অলি আহাদের মৃত্যুর পর শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শহীদ মিনারে তার মরদেহে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। অবশ্যই ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ যে যার স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু ‘নাজাত দিবস’ পালনের পর অলি আহাদের মরদেহে ছাত্রলীগের পুষ্পস্তবক প্রদান বিরল ঘটনা। নিশ্চয়ই এটিতে আওয়ামী লীগ প্রধানের সম্মতি ছিল। অবশ্য মহানুভবতা না থাকলে রাজনীতি কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না।

অলি আহাদ মুক্তিযুদ্ধের সময় আগরতলা গিয়েছিলেন কিন্তু কারো সঙ্গে দেখা না করে আবার তিন দিন পরে বাংলাদেশে চলে আসেন। আর ঢাকায় অবশিষ্ট নয় মাস নুরুল আমিনের বাসভবনে ছিলেন। ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর এই নুরুল আমিনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেছিলেন। অলি আহাদের ছোটভাই আমিরুজ্জামানের শ্বশুর ছিলেন নুরুল আমিন। অলি আহাদ বুঝেননি, কোনও মহৎ কাজ ফাঁকি দিয়ে হয় না।

রুমিনও বুঝতে পারছেন না রাজনীতি ফাঁকি দিয়ে আর ফাঁকা বুলি দিয়ে হয় না। রাজনীতি যারা করেন তাদের লোভের মাত্রা খুবই প্রয়োজনীয় হতে হবে। অতিরিক্ত সম্পদের লোভ, ক্ষমতা রাজনীতিবিদদেরকে সম্পূর্ণ বিনাশের পথে নিয়ে যায়। রুমিন ফারহানার সত্য-মিথ্যা কথা বলে প্লট চাওয়া উচিত হয়নি। নৈতিকভাবেতো নয়-ই, যেখানে তিনি সরকারকে বৈধ মনে করেন না। তার আবেদন করা অবৈধ নয় সত্য কিন্তু এটি অবৈধ সরকারের কাছে বৈধ ভিক্ষা চাওয়ার মত।

রুমিনের অনেক ফ্যান। তারা তাকে আদর্শ রাজনীতিক হিসেবে দেখতে চায়। সে কারণে তার মতো একজন তরুণ নেতার কাছে তাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। আমি তাকে টকশোতে আমন্ত্রণ জানিয়ে বা তার সঙ্গে অতিথি হয়ে দেখেছি তার অনেক দর্শক। বেগম জিয়া থেকে শুরু করে তার দলের শীর্ষ অনেক নেতা তাকে পছন্দ করেন। সে জায়গায় তিনি প্লটের আবেদন করে তার দলকে এবং তার ব্যক্তিগত সমর্থকদের হতাশ করেছেন। শেষমেষ সমালোচনায় পড়ে রুমিন ২৭ আগস্ট প্লট চেয়ে সরকারের কাছে করা তার আবেদন প্রত্যাহারও করেছেন। কিন্তু এই প্রত্যাহারের পরও রুমিনকে নিয়ে তার দল ও সমর্থকদের সৃষ্ট হতাশা কাটবে কিনা আমি সন্দিহান।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

রুমিন ফারহানা পেশায় আইনজীবী। সুতরাং বুদ্ধিসুদ্ধি যা আছে তাতে তিনি জানেন যে সরকার তার কথায় সংসদ ভাঙবে না। তার সদস্যপদও যাবে না। সুতরাং ফাউ প্রশংসা কুড়াতে পারলে ক্ষতি কি!