বঙ্গমাতা : ইতিহাস নির্মাণে যার ছিল স্বার্থশূন্য হৃদয়ের প্রণোদনা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১০:২৭ এএম, ০৮ আগস্ট ২০২০

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি যারা পড়েছেন তারা ভাল করেই দেখবেন, স্ত্রীর প্রতি তাঁর অসামান্য ভালবাসার প্রকাশ পাতায় পাতায়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ গেছে জেলখানায়, কিংবা রাজপথে। পরিবারকে সময় দেবার মতো সময় ছিল না বঙ্গবন্ধুর। সেই বইয়ের প্রথম পাতাতেই স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছার কথা লিখেছেন এভাবে: “আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, বসেই তো আছো, লেখো তোমার জীবনের কাহিনী।“ আরও বললেন ‘আমার স্ত্রী, যার ডাকনাম রেণু, আমাকে কয়েকটি খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টি আমাকে দিয়েছে। রেণু আরো একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।’

আমরা জানি, সারা বিশ্বে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের শীর্ষ ছুঁয়েছেন, প্রায় সবার ক্ষেত্রেই কোনও না কোনও নারীর ত্যাগ ছিল, প্রেরণা ছিল। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জীবনে তাঁর স্ত্রী, যাকে তিনি রেণু বলে ডাকতেন, তাঁর ভূমিকাকে এক কথায় বলতে হবে- ‘আকাশ-উদার স্বার্থশূন্য হৃদয়ের প্রণোদনা’। রাজনীতি, স্বাধীনতা আন্দোলন, জ্বালাও, পোড়াও, গ্রেফতার, জেল এসবের দুরন্ত ঢেউয়ে তিনি স্বচ্ছ, শক্ত অবস্থানে থেকেছেন বাঙালির প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবের পাশে। কারণ তিনি জাতির স্বপ্ন জানতেন। তাই নিজের সুখের জন্য নিজের পথকে কুসুম বিছিয়ে মসৃণ করার চেষ্টায় ছিলেন না কখনও। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাঁকে।

রাজনীতি, আন্দোলন, সংগ্রাম বঙ্গবন্ধু করে আসছিলেন ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের আগ থেকেই। তবে পূর্ব পাকিস্তানের সময়টায় তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন বাঙালির একক নায়ক এবং এক সময় পরিণত হন জাতির জনকে। যে ২৪টি বছর আমরা পাকিস্তানের শাসন, শোষণে ছিলাম সেই সময়টিতে রাজনৈতিক পরাধীনতার সঙ্গে বিরাজ করছিল সামাজিক অচলাবস্থা, ধর্মের নামে মানবতার নির্বিচার হত্যার উৎসব। তারই মধ্যে মানুষের মনন বদলাতে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়তে ব্যতিক্রমী মানুষেরা সাংস্কৃতিক আন্দোলন করেছেন যেখানে বহু নারীরও ভূমিকা ছিল একেবারে সামনের সাড়িতে। রাত্রির মতো নিকষ অন্ধকার দূর করতে, আঁধারে আলো ফোটাতে রাজপথে মিছিল করে, সেমিনারে প্রবন্ধ পড়ে, বক্তৃতা দিয়েছেন সেইসব নারীরা। তবে তাঁদের বাইরে একজন ছিলেন বেগম মুজিব যিনি একান্তই বঙ্গবন্ধুর বধূ ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন মানুষের নেতা শেখ মুজিবের সব কাজে প্রেরণার স্তম্ভ।

বঙ্গবন্ধু কন্যা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই একটা কথা বলেন, ‘জাতির পিতার জন্য প্রেরণা, শক্তি এবং সাহসের এক উৎস ছিলেন বঙ্গমাতা। স্বামীর সকল সিদ্ধান্তে মনস্তাত্ত্বিক সহযোগিতা ছাড়াও বঙ্গমাতার পরামর্শ অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হয়েছে।’সমস্যাটা হল, তাঁর সম্পর্কে মানুষ খুব সামান্যই জানে। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে ও প্রচার বিমুখ ছিলেন। তাই এই মহিয়সী নারীর অবদান লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে। স্বামী-সংসার অন্তঃপ্রাণ বাঙালি নারী এবং শোষিত-নিপীড়িত জনসাধারণকে মুক্তির চেতনায় জাগিয়ে তোলার সংগ্রামে স্বামীর পাশে থাকা সহযোদ্ধাকে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হত্যা করেছি, কোন স্বীকৃতিও কখনও সেভাবে দেইনি।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু রেণুর কথা উল্লেখ করেছেন বারবার। বলেছেন, ‘আব্বা ছাড়াও মায়ের কাছ থেকেও আমি টাকা নিতে পারতাম। আর সময় সময় রেণুও আমাকে কিছু টাকা দিতে পারত। রেণু যা কিছু জোগাড় করত বাড়ি গেলে এবং দরকার হলে আমাকেই দিত। কোনো দিন আপত্তি করে নাই, নিজে মোটেই খরচ করত না। গ্রামের বাড়িতে থাকত, আমার জন্যই রাখত।’বঙ্গবন্ধুর ও তাঁর স্ত্রীর সংসার জীবনে বেগম মুজিব ব্যক্তিগত-পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসজর্ন দিয়ে স্বামীর রাজনীতিকে, মানুষের স্বাধিকার আন্দোলনকেই বেছে নিয়ে অন্যরকম এক আধুনিক নারীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের স্মৃতিচারণ করে একবার প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বাবাকে কখনও টানা দু’বছরও আমাদের মাঝে পাইনি।’ সেই মানুষের স্ত্রী কতটা কষ্টের ভেতর দিয়ে গেছেন, কতটা অনিশ্চয়তার মাঝে থেকেছেন আমরা বুঝব না। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলে তাঁর অবর্তমানে একদিকে যেমন সংসারের দায়িত্ব পালন করেছেন, অন্যদিকে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করা, আন্দোলন পরিচালনাসহ প্রতিটি কাজও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

আবারও দ্বারস্থ হতে হয় শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণে। দু’বছর আগে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, বেগম মুজিবের একটি সিদ্ধান্ত বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল। ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে জানান, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায় পাক সামরিক সরকার। ছয় মাস পর্যন্ত তাঁর কোন হদিস ছিল না, আমরা জানতেও পারিনি তিনি বেঁচে আছেন কি না। এরপরে কোর্টেই বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখার সুযোগ হয়। তখন পাকিস্তান সরকার আম্মাকে ভয় দেখান, বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি না নিলে তিনি বিধবা হবেন। আম্মা সোজা বলে দিলেন, কোন প্যারোলে মুক্তি হবে না। নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে কোন মুক্তি হবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমি মায়ের সিদ্ধান্তের কথা কোর্টে যখন বঙ্গবন্ধুকে জানালাম, তখন অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকেও দেখেছি তারা বলেছেন, তুমি কেমন মেয়ে? বাবার মুক্তি চাওনা? আম্মাকে বলেছে-‘ভাবি আপনি কিন্তু বিধবা হবেন’। আমার মা তখন কঠিন স্বরেই বলেছেন, ‘প্যারোলে মুক্তি নিলে মামলার আর ৩৩ জন আসামীর কি হবে? বঙ্গবন্ধু প্যারোলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। গণঅভ্যুত্থানে পাকিস্তান সরকার আব্বাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়’।

আমরা জানি, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় বেগম মুজিব পুলিশ ও গোয়েন্দা চক্ষুর আড়ালে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন। বিচক্ষণতার সঙ্গে ছাত্রদের তিনি নির্দেশনা দিতেন এবং অর্থ সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেন। এমনকি নিজের গহনা বিক্রি করেও অর্থ জুগিয়েছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল ও ধৈর্য নিয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেগম মুজিবের মতো ধীরস্থির, বুদ্ধিদীপ্ত, দূরদর্শী, নারীর সাহসী, বলিষ্ঠ, নির্লোভ ও নিষ্ঠাবান ইতিবাচক ভূমিকা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু তথা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হতে সহায়তা করেছে। জনগণের কল্যাণে সমগ্র জীবন তিনি অকাতরে দুঃখ বরণ ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর সাথে জীবনকে জড়িয়ে দিয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব নিজেও হয়ে উঠেছেন এক ইতিহাস। অনেক কথা বলার আছে, অনেক কথা অজানাই আছে বেগম মুজিব সম্পর্কে। শুধু এটুকু বলব, সময় এখন তাঁর প্রতি প্রাণভরা কৃতজ্ঞতা জানানোর। কারণ তিনি ছিলেন, তার স্বামীর মতই অন্যায় ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক অসামান্য ক্রান্তিকারী।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]