বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং জিয়ার সম্পৃক্ততা

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় সম্পাদকীয়
প্রকাশিত: ০১:১৮ এএম, ১৫ আগস্ট ২০২০

শারমিন সুলতানা লিলি

প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় দক্ষিণ আফ্রিকার উপর লেখা বিখ্যাত উপন্যাস “ক্রাই দ্যা বিলাভড কান্ট্রি”- কাঁদো প্রিয় দেশ কাঁদো”-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, এ ক্রন্দন অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ত ক্রন্দন। বাঙালি জাতি সত্যি আজও কাঁদছে । এ ক্রন্দনের শেষ নেই। এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের সারাজীবন করতে হবে।

একেক জাতির সাথে ইতিহাসে একেক নেতার নাম, রাষ্ট্রনায়কের নাম, স্রষ্টার নাম অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িত হয়ে যায়। সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে লেনিনের, তুরস্কের সঙ্গে কামাল আতাতুর্কের ,ভারতের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর , চীনের সঙ্গে মাও সেতুঙ্গের নাম যেমন ভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সঙ্গে তেমনি অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। এমন এক প্রতিষ্ঠিত সত্য যে ওই সত্যকে অস্বীকার আমার কাছে স্বাধীনতাকে অস্বীকার করার সমতুল্য।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কাল রাতে স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী ঘৃণ্য পিশাচ খুনিচক্রের হাতে সপরিবারে শাহাদাত বরন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিজের লোকদের হাতে প্রাণ যাওয়া নজিরবিহীন নয় কিন্তু সেদিন যেভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশুসহ বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে সপরিবারে নারকীয় কায়দায় হত্যা করা হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে পূর্বে কখনও ঘটে নাই।

যেভাবে সংগঠিত হয়েছিল হত্যাকাণ্ড

পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে চৌদ্দ আগস্টের রাতকে কাজে লাগায় খুনিরা। মেজর রশিদ ,মেজর ডালিম ,নূর ,শাহরিয়ার ,মেজর পাশা ,মেজর হুদাকে মধ্য রাত পর্যন্ত তাদের সমস্ত পরিকল্পনাটি ফারুক সকলকে বুঝিয়ে দেয়। পরিকল্পনা অনুসারে একটি ট্যাংক বিমানবন্দরের রানওয়ে আটকাবে,আর সৈন্যদের একটি অংশ মিরপুর ব্রিজের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। অন্যদলগুলি কিছু সৈনিককে রেডিও স্টেশন ,বঙ্গভবন এবং পিলখানায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় তারা। ৭৫ থেকে ১৫০ জনের বড় তিনটি দলকে সাজানো হয় প্রধান তিনটি টার্গেটে আঘাত হানার জন্য । এ টার্গেট গুলি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ,আব্দুর রব সেনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনির বাসা।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করার দায়িত্ব নেয় প্রাক্তন মেজর নূর এবং মেজর মহিউদ্দিন। তারা তাদের সাথে নেয় এক কোম্পানি ল্যান্সার। ফারুক তার প্রিয় পাত্র মুসলেউদ্দিনকে দায়িত্ব দেয় শেখ মনির বাড়ি আক্রমণের।

ফারুক বঙ্গবন্ধু, শেখ মনি এবং সেরনিয়াবাতকে হত্যার করার স্পষ্ট নির্দেশ দেয় এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে কোন বাধাকে নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ দেয়। রশিদ রাজনৈতিক দিক দেখার দায়িত্ব নেয়। আর ফারুক নিজে বঙ্গবন্ধুর অনুগত রক্ষী বাহিনী মোকাবেলার দায়িত্ব নেয়। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় এই যে ফারুক কিছু গোলাবিহীন ট্যাংককে মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং ৩০০০ রক্ষীবাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল।

যখন মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ফজরের নামাজের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে ঠিক তখনি ঘাতক ফারুক, রশিদ বাহিনী তাদের অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেয়। একদিকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে আজানের সুমধুর সুর অন্য দিকে ঘাতকের ট্যাংক গরগর করে হত্যার নেশায় এগিয়ে যায়।

ভোর চারটা চল্লিশ মিনিটে নূর আর হুদার নেতৃত্বে প্রধান ঘাতক দল বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির কাছে পৌঁছে যায়। কিছু সৈন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি ঘিরে ফেলে। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু নিজের প্রিয় ধূমপানের পাইপটি হাতে নিয়ে দোতলায় সিঁড়ির গোঁড়ায় এসে দাঁড়ালেন। তার পরণে চেক লুঙ্গি,সাদা পাঞ্জাবি।
কি চাও তোমরা?

হঠাৎ বঙ্গবন্ধুর কঠোর কণ্ঠের আওয়াজে মহিউদ্দিন থতমত খেয়ে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে পরে। কেঁপে ওঠে মহিউদ্দিনের বুক। মহিউদ্দিন সেদিন উপলব্ধি করতে পারে একজন রাজনৈতিক নেতা কতটা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী, সাহসী হলে এভাবে অস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিয়ে কথা বলতে পারে! বঙ্গবন্ধু জানতে চায় তোমরা আমাকে হত্যা করতে চাও? বঙ্গবন্ধুর ধারণায় ছিল না বাংলাদেশের কোন মানুষ তাঁর বাড়ি আক্রমণ করতে পারে।

মহিউদ্দিন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে নতজানু হয়ে পড়েছিল ঠিক ঐ মুহূর্তে নূর এসে মহিউদ্দিনের পাশে দাঁড়ায়। সেও উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকানো যাবে না। তাই সে চিৎকার করে আবোল তাবোল বকতে থাকে এবং তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি তুলেই ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে। স্টেনগানের গুলি বঙ্গবন্ধুর বুকের ডানদিকে ছিদ্র করে বেরিয়ে যায়। গুলির প্রচণ্ড আঘাতে বঙ্গবন্ধুর দেহটা কিছুটা পিছিয়ে যায়। অবাক বঙ্গবন্ধু বড় বড় চোখে সামনে তাকিয়ে দেখেন। বঙ্গবন্ধুর চোখ হয়ত তখনও বিশ্বাস করতে চাইছিল না। বঙ্গবন্ধুর বুকে, দেহে ২৮টি গুলি করে ঘাতকরা। এরপর সিঁড়ির উপরই ঢলে পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুহীন প্রাণ। (বঙ্গবন্ধু হত্যার দলিল, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম,পৃ:২৭)

আর এর মধ্য দিয়ে পতন ঘটে একটি নক্ষত্রের। বাঙালির জাতির জাতীয়তাবাদের নেতাকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়। শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয় নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয় এই বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনে প্রেরণাদায়ী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবসহ পরিবারের ২৫ জন সদস্যকে।

জিয়ার ভূমিকা

১৯৭৬ সালে আগস্টে মাসের প্রথম সপ্তাহে লন্ডন টেলিভিশনে মেজর ফারুক এবং মেজর রশিদ একটি সাক্ষাৎকার দেয়। সাংবাদিক এ্যান্থনি ম্যাসকার্নহাস এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন।

এ্যান্থনি রশিদকে প্রশ্ন করেছিল “ মুজিবকে সরাবার প্রক্রিয়া শুরু হলে, তাঁর স্থলাভিষিক্ত কাকে করা হবে সেই ব্যক্তিত্বকেও খুঁজে বের করতে হয় ,তা কিভাবে করা হয়?
রশিদের উত্তর ছিল “ আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল জেনারেল জিয়া, এ জন্য ১৯৭৫ সালের ২০শে মার্চ সন্ধ্যায় আমি তার সাথে দেখা করি। জেনারেল জিয়া বললেন আমি একজন সিনিয়র অফিসার। এধরনের কর্মকান্ডে আমি জড়িত হতে পারি না। কিন্তু তোমরা, জুনিয়ার অফিসাররা আগ্রহী হলে এগিয়ে যেতে পারো। এ্যান্থনি রশিদকে আবার জিজ্ঞাসা করেন জিয়া কি আপনাকে এভাবে বলেছিলেন? রশিদের উত্তর ছিল “হ্যাঁ।“(মুজিবের রক্ত লাল, এম আর আখতার মুকুল,পৃ:১৩২, সংক্ষেপে)

এরপর আর বলার অপেক্ষা রাখেনা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড সম্পর্কে জিয়া আগে থেকেই অবহিত ছিল। এখন প্রশ্ন আসতে পারে ফারুক, রশীদের বক্তব্যের সত্যতা কি?
বক্তব্যের সত্যতার কিছুটা হলেও প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭৬ সনে দেওয়া জিয়ার ম্যাসকার্নহাস- কেই দেওয়া এক সাক্ষাৎকার থেকে। মাসকারেনহাস এর ভাষায়, “In July, 1976, while doing a TV programme in London on the killing of Sheikh Mujib I confronted Zia with what Farook had said ” (তাদের সাক্ষাৎকারে) । জিয়া এ ব্যাপারে উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ফারুকের সাথে তার এমন কথোপকথনের বিষয়টি এসেছে এভাবে-
“Zia did not deny it– nor did he confirm it” (Anthony Mascarenhas, Bangladesh– A Legacy of Blood, page 54, Hodder and Stroughton, London, 1986)।

জিয়া চিরকাল ছিলেন ক্ষমতা লোভী এবং ৩রা নভেম্বর সৃষ্টির পৃষ্ঠপোষক। জিয়ার ক্ষমতা দখল এবং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি প্রমাণ করে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের ঘটনায় তার ভূমিকা। ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বর হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে। এই হত্যাকাণ্ডকে বিচারের আওতামুক্ত রাখতে জিয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ অর্থাৎ দায় মুক্তির অধ্যাদেশের জারি করে এবং বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিদেশে উচ্চ পদে কূটনীতিবিদ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করে। কূটনীতিকরা জেনেভা কনভেশন অনুযায়ী বিদেশে যেকোন অপরাধ করলেও তাতে দায়মুক্তি পায়। এই খুনিদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে দেশে বিদেশে সকল বিচার থেকে মুক্ত রাখতে জিয়া এই কাজ করে। যা প্রমাণ করে জিয়া বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে জড়িত ছিল।

আমার মনে হয় এই বিষয়গুলো থেকে কয়েকটি বিষয় এখানে পরিষ্কার– বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে জিয়া পূর্বেই অবহিত ছিল; চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেয়নি, বরঞ্চ চক্রান্তকারীদের উৎসাহিত করেছেন এবং একটি নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে উৎখাতে জিয়ার পূর্ণ সমর্থন ছিল সেই সাথে আসন্ন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

’৭৫-পরবর্তী সময়

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে যে অপশক্তির উত্থান হয়েছিল যে অপশক্তির কালো ছায়ায় ঢাকা পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা,বাঙালিত্বের মূল্যবোধ, সুষ্ঠু গণতন্ত্রের ধারা। অপশক্তির কালোছায়ায় জন্ম নিয়েছিল নতুন জাতীয়তাবাদ- বিকৃত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু,জাতির পিতা । সব কিছু বিলীন করে প্রজন্মকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করে নিজেদের ক্ষমতা এবং শক্তিকে চিরস্থায়ী করার অপ্রয়াস চলেছিল।

ঘাতকের বিচার

কিন্তু সত্য যে কঠিন। কোন অপশক্তিই সত্যকে চেপে রাখতে পারে না। সত্য চির ভাস্কর, সত্য চিরন্তন। দীর্ঘ ২১ বছর পরে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে সত্য ওঠে এসেছে। বাঙালি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে ধারণ করেছিল বলেই বঙ্গকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শুধু স্বপ্ন দেখায় না তা বাস্তবায়নও করেন।

বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব, চির অম্লান। যতদিন বাংলা নামে দেশ থাকবে, বাংলা ভাষা থাকবে,পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বহমান থাকবে, জাতি হিসেবে বাঙালির পরিচয় থাকবে,ততদিন এদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে ,বাংলার আকাশে,বাতাসে, মাঝির গানে, পাখির সুরে, রাখালের বাঁশির সুরে একটি নাম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হবে— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম।

খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে তার নশ্বর দেহকে আমাদের কাছ থেকে পৃথক করেছে মাত্র। দেহ মাটিতে নিঃশেষ হয়ে যায় কিন্তু তার কর্মকাণ্ড, চেতনা, আদর্শ চির অম্লান, ভাস্বর হয়ে থাকবে বাঙালি জাতির হৃদয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ছিলেন, আছে, থাকবেন। তিনি আমাদের অহংকার। তিনি থাকবেনই অনাদিকাল এই বাংলার মাটি ও মানুষের হৃদয়ে।

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ। সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, রোকেয়া হল ঢাবি।

এইচআর/এসআর

 

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]