পরম হিতাকাঙ্ক্ষী প্রণব মুখার্জির মহাপ্রয়াণ

ড. মিল্টন বিশ্বাস
ড. মিল্টন বিশ্বাস ড. মিল্টন বিশ্বাস , অধ্যাপক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:০৮ পিএম, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০

পরলোকগত হলেন বাংলাদেশের পরম বন্ধু, হিতাকাঙ্ক্ষী, মুক্তিযুদ্ধের অকুণ্ঠ সমর্থক ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি (জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৫ মৃত্যু ৩১ আগস্ট ২০২০)। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশে ২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। এই মহান ব্যক্তির মহাপ্রয়াণে শোকে মুহ্যমান হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অভিভাবক ও পারিবারিক এই বন্ধু সম্পর্কে শোকবার্তায় তিনি বলেছেন, ‘প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে ভারত হারাল একজন বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নেতাকে আর বাংলাদেশ হারাল একজন আপনজনকে। তিনি উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।’

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৩ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল উদ্বোধন করতে গিয়ে অতীতের স্মৃতিচারণ করেছিলেন তিনি। আর ভারতরত্ন সম্মান প্রাপ্তির জন্য তাঁকে সংবর্ধনা জানানোর অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন- ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার দুঃখের মিল আছে, আমার অবস্থাও তাঁর মতোই।’

বাংলাদেশের প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল অপরিসীম। বিবাহসূত্রে কেবল বাংলাদেশের জামাই বলেই নন তিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। লেখাবাহুল্য, এদেশের মাটির সঙ্গে প্রণব মুখার্জীর সংযোগ বহুদিনের। বাংলাদেশের নড়াইল জেলার ভদ্রবিলা গ্রামে তাঁর স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবও কেটেছে ওই গ্রামে। তাঁদের আত্মীয়-স্বজন এখনো সেখানে বসবাস করেন। ফলে সেই গ্রামের সঙ্গে একটি প্রাণের যোগ ছিল তাঁদের। ১৯৯৬ সালে তিনি তাঁর কন্যা শর্মিষ্ঠা মুখার্জিকে নিয়ে ওই গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর পুনরায় ২০১৩ সালে সেই গ্রামে পদধূলি দিয়েছিলেন তাঁরা। এজন্য বাঙালি হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল প্রাণের টানে উজ্জীবিত।

তিনি লিখেছেন- ‘ভারত ও বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী নয়; তাদের মধ্যে রয়েছে নৃতাত্ত্বিক ও জাতিগত বন্ধন। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি ভারত সব-সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। কেননা, আমরা অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও ভৌগোলিক সংহতি ধারণ করি।’ তাঁর রাজনৈতিক কর্মজীবন ছিল ছয় দশকব্যাপী বিস্তৃত। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা। আর প্রণব মুখার্জীর দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় থেকেছে তখনই বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে।

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের মানুষ প্রণব মুখোপাধ্যায় নিকটজনদের কাছে পল্টু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তখন এদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে উত্তাল সময় পার করছে। স্বাধীনতা অর্জনের সেই পথে আমাদের নেতাদের ভারতের যে সমস্ত উজ্জ্বল নক্ষত্রদের দেশপ্রেম দ্বারা উজ্জীবিত হওয়ার দৃষ্টান্ত ছিল তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। রাজনীতিতে যোগ দেবার আগে তিনি কাজ করেছেন শিক্ষক এবং সাংবাদিক হিসেবে। একসময়ের দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক এই নেতা রাজনীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বদান্যতা পেয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য, ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর একজন বিশ্বস্ত সহকর্মী। ১৯৭৩ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভায় স্থান পান তিনি। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার দলনেতাও ছিলেন। জীবনে প্রথমবারের মতো ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী, আবার ১৯৯৫-৯৬ সালে রাওয়ের মন্ত্রিসভায় বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ২০০৬ সালে তিনি পুনরায় ভারতের বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালে মনমোহন সিংহের দ্বিতীয় মেয়াদে অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব পান, ছিলেন ২০১২ পর্যন্ত। প্রণব মুখার্জি রাজনৈতিকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী ছিলেন।

একজন বাস্তববাদী হওয়ায় নিজের সরকারের দুর্নীতি সম্পর্কেও সর্বদা সতর্ক থাকতেন। ১৯৮৪ সালে ইউরোমানি পত্রিকার একটি সমীক্ষায় তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পাঁচ অর্থমন্ত্রীর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হন। ‘ইমার্জিং মার্কেটস’ জার্নাল তাঁকে ২০১০ সালে এশিয়ার সেরা অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছিল। ১৯৯৭ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ সাংসদ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

২.

আগেই বলেছি, ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিভাবক ও পারিবারিক বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন প্রণব মুখার্জি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। ২০১২ সালে ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি নির্বাচিত হলে শেখ হাসিনা তেমন একটা অবাক হননি। কারণ তখন ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তিনি। আর দেশটির সবকটি রাজ্যের বিধায়ক ও জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এর আগে তিনি ভারতের অর্থ, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

আমরা জানি ভারতে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আলঙ্কারিক তবে কখনো কখনো তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। জাতীয় নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী না হলে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রণব মুখার্জি ছিলেন ভারতের ১৩তম প্রেসিডেন্ট। বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সমর্থিত নেতা-কর্মী দলমত নির্বিশেষে তাঁর প্রশংসা করেছে। অর্থাৎ দলের প্রতি আনুগত্য ও অসামান্য প্রজ্ঞা নিয়ে এই বাঙালি রাজনীতিবিদ নিজের দল এবং দলের বাইরেও বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন আমৃত্যু। ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের জন্য প্রণব মুখার্জির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল সত্যিকার অর্থে আশির্বাদের। তখন দলের ভেতর ঐক্যের যে ফাটল দেখা দিয়েছিল তা তাঁর ব্যক্তিত্বের ছোঁয়ায় দূর হয়েছিল।

১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর শেখ হাসিনা যখন ভারতে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছেন তখন প্রণব মুখার্জির পরিবারের অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছিলেন। তৈরি হওয়া সেই পারিবারিক সম্পর্ক পঁচাত্তরের পর দিল্লি হয়ে এদেশে প্রসারিত হয়েছিল আন্তরিকতার ছোঁয়ায়। জননেত্রী সম্পর্কে প্রণব মুখার্জি লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা আমাদের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু। আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির মাধ্যমে ভারত তার দাবি পূরণে সহায়তা করার চেষ্টা করেছে। শেখ হাসিনা কারাগারে থাকার সময় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা তাকে পরিত্যাগ করলে আমি তাদের ভর্ৎসনা করে বলি, কেউ যখন এমন বিপদে থাকে, তখন তাকে ত্যাগ করা অনৈতিক।’

২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনী ‘বাই দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস ১৯৯৬-২০১২’ গ্রন্থে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে। সেখানে শেখ হাসিনার কথাও বিবৃত হয়েছে। বিশেষত ২০০৭ সালের জুলাই মাসে নেত্রী যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবজেলে বন্দি তখন তিনি তাঁকে মুক্ত করতে ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেসময় তাঁকে মুক্ত করার জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকেও হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তাঁর পরামর্শ ও সহযোগিতা পেয়েছিলেন। ২০০৮ এ শান্তিপূর্ণ উপায়ে, বিশ্বাসযোগ্য, মুক্ত ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনে তাঁর অবদান এ জাতি সবসময় স্মরণ করবে। এদেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য অন্তরাল থেকে তিনি সাহসের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। অর্থাৎ শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় এসেছেন তখনই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতা পেয়েছেন। বিভিন্ন চুক্তি সাক্ষরের মধ্য দিয়ে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরভাস্বর।

৩.

২০১৩ সালের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে একাধিকবার ছুটে গেছেন। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ করাটা ছিল প্রাণের টানে আলোড়িত। ২০১৭ সালের এপ্রিলে মোদি সরকারের সঙ্গে বৈঠকসমূহ শেষ করে তিনি দেখা করেন তাঁর সঙ্গে। ২০১৫ সালে প্রণব মুখার্জির পত্নী শুভ্রা মুখার্জির মৃত্যুর পর তিনি তাঁকে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলেন। সেদিন তাঁরা স্মৃতিচারণে মুখর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর স্ত্রীর জন্মস্থান নড়াইলের স্মৃতিগুলো মনে পড়ে তাঁর। তখন তিনি বৃদ্ধ, বই পড়তে পছন্দ করেন, বাগান করা ও গান শোনা তাঁর প্রিয় শখ ছিল। ২০১৭ সালের সেদিন তাঁরা স্মৃতি রোমন্থন করেছিলেন। রাষ্ট্রপতির দেয়া নৈশভোজে যোগ দিয়েও মনে হয়েছিল তাঁরা অনেকটা পথ হেঁটে পৃথিবীর মানুষকে সাহায্য করে চলেছেন।

আমাদের মনে পড়ে, ২০১৫ সালে তাঁর স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জির মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে যোগ দিতে ছুটে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর আপন মানুষকে হারানোর বেদনায় উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের পর যখন থেকে দিল্লিতে তিনি আশ্রিত তখন থেকে এই দম্পতি স্থানীয় অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতেন। তাঁদের পারিবারিক বন্ধনই সেদিন শেখ হাসিনাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। শেখ রেহানা ও কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ সেই সাক্ষাৎ ছিল সত্যিই স্মরণীয়।

গত বছর শেখ হাসিনা বলেছেন- ‘৮৫ বছর বয়সে তিনি ভারতের বাইরে কেবল বাংলাদেশেই এসেছেন। চট্টগ্রামেও গিয়েছেন। আমার অত্যন্ত প্রিয়জন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রবণ মুখার্জির বয়স এখন ৮৫ বছর। ১৯৭৫ সালের পর যখন আমি দিল্লিতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছি তখন তিনি ও তাঁর স্ত্রী শুভ্রা দিদি আমাদের বেঁচে থাকার, সাহস যোগানোর অন্যতম দিশা ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি ভারতের সবথেকে বড় নাগরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ পদকে ভূষিত হলেন যেদিন, সেদিনও আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছিলাম।’

প্রণব মুখার্জি এবং শেখ হাসিনার কথায় দু’দেশের দুই বাঙালি রাষ্ট্রনায়কের অন্তর জগৎ উন্মোচিত হয়েছে। যেখানে চিত্রিত হয়েছে মানুষের জন্য সহানুভূতি, মমত্ববোধ ও আন্তরিকতা।

৪.

একাত্তরে প্রণব মুখার্জিকে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায় করার জন্য ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পাঠিয়েছিলেন। পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে এই সমর্থন আদায়ের লড়াইটা ছিল বিস্ময়কর। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে জন্ম নেয়া ১২ বা ১৩ কোটি মানুষের এই দেশ। আমি এখনও স্মরণ করি তখনকার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন।

তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এই হাউজকে জানিয়ে আনন্দিত হচ্ছি যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। এখন ঢাকা হলো মুক্ত বাংলাদেশের মুক্ত রাজধানী।’তাঁর আত্মজীবনীমূলক সিরিজের প্রথমটি দ্য ড্রামাটিক ডিকেড : দ্য ইন্দিরা গান্ধী ইয়ারস-এ তিনি একটি পুরো অধ্যায়ই লিখেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ: দ্য মেকিং অব বাংলাদেশ’নামে। এখন পৃথিবীর সকলে জানে, ১৯৭১ সালে সংগ্রামরত পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি সহানুভূতি ও সংহতি প্রকাশ করছিলেন ইন্দিরা গান্ধী ও প্রণব মুখার্জি।

মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতীয় সংসদের ভেতর-বাইরে প্রণব মুখার্জির ভূমিকা ছিল অনন্য। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। তাঁর জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেওয়া এবং ইন্দিরার মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়া ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্য শুভ সূচনা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে- ‘১৫ জুন বাজেট অধিবেশন চলাকালে আমি রাজ্যসভায় বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিই। আমি বলেছিলাম, ভারতের উচিত বাংলাদেশের প্রবাসী মুজিবনগর সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়া। একজন সদস্য জানতে চান, কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। উত্তরে আমি জানাই, গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমেই এর রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব। রাজনৈতিক সমাধান মানে গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে বস্তুগত সহায়তা করা। আমি সংসদকে এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম যে বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করার বহু নজির আছে।’

৫.

প্রণব মুখার্জির অবদান বাংলাদেশ কৃতজ্ঞচিত্তে সবসময় স্মরণ করে বলেই ২০১৩ সালের ৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট অফ ল ডিগ্রি দেয়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থন দান করেছিলেন তিনি। এজন্য ২০১৩ সালের ৫ মার্চ তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’পান। মহাপ্রয়াণ হলেও ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি সত্যিকারের রাজনীতিবিদ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাঙালি এই রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন। এ দেশের জনগণ তাঁর অবদানকে চিরকাল মনে রাখবে।

লেখক : বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম; নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]