‘আমিই বাংলাদেশ’

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫৩ এএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০

মেজর অব. আহমেদ ফেরদৌস

বহমান জলধারায় জোয়ার ভাটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি স্বাভাবিক ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও। এটাই সত্য ও বহমান প্রক্রিয়ার অংশ। একে অস্বীকার করার নেই কোন অবকাশ।

প্রাসাদ ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সুলতানের সাফল্যের উপর ভিত্তি করেই ইতিহাস রচিত হয়েছে তাদের সালতানাতের বিজয়গাথা রচনা। পক্ষান্তরে তাদের ব্যর্থতাও তাদের ছুঁড়ে ফেলেছিলো কুচক্রীদের হাতে তাদের চরম অপমান এবং অসহায় আত্মসমর্পণ। ইতিহাস হতে শিক্ষা নিয়ে যারা এগিয়েছে, তারা সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে পেরেছে বাধা বিপত্তি।

৬২৩ বছরের সাম্রাজ্যের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় সামান্য একটি গোত্র কিভাবে ঐকতানের সুরে সমগ্র বিশ্বের ১/৩ অংশকে শাসন করেছিলো এবং আত্মতৃপ্তির ঢেকুর গিলে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালে সমগ্র সাম্রাজ্যের নামগন্ধ হারিয়ে ফেলেছে। এই উত্থান পতনের শিক্ষা একটা জিনিস চোখে অঙ্গুলি দিয়ে শিখিয়েছে, শত্রু যতই ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন মনে হোক না কেনো, তাকে সম্মান প্রদর্শন করতে হয়। উই পোকা যেমন আপনার বাসগৃহের কাঠের দরজাটা এক দিনে বা এক মাসে হাওয়া করে ফেলে না, বরং অনেকদিন ধরে আস্তে আস্তে পরিকল্পনা মোতাবেক ক্ষয় করে। আমি আপনি যখন তা আবিষ্কার করবো, তখন It's Too Late.

নদীর গতিপথ, ইতিহাস, অটোমান সাম্রাজ্য, ষড়যন্ত্র, শত্রুর পরিকল্পনা- এসব কঠিন বিশ্লেষণ ধর্মী বিষয়গুলো নিয়ে আমরা সাধারণ আমজনতা তেমন মাথা ঘামাতে অভ্যস্ত নই বিভিন্ন কারণে। অনেকের কাছে এটা ফালতু বিষয়, অনেকের কাছে রাশভারী বকওয়াজ, অনেকের কাছে Time Waste এবং অনেকের কাছে জীবনযুদ্ধ সংগ্রামে দিবাস্বপ্ন। সবারই যুক্তি সমর্থনযোগ্য এবং বিবেচনায় আনার মতোন তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু মধ্যাহ্নে আকাশে শকুনের বিচরণ যদি শংকার ভাব জোগায় মনে, তবে তা কি ফেলে দেবার মতোন কোন বিষয়? আর তাও বাংলাদেশের মতোন নবীন একটি দেশ যার আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার আকার একটি অভিশাপ, যে দেশ প্রকৃতির সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে যুদ্ধরত, যে দেশ হাজার প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার দিকে বিশ্ব হাইওয়েতে ৩য় কিংবা ৪র্থ গিয়ারে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে সাহস করে পা দিয়েছে এবং পরিকল্পনার ম্যাপে Force Majure করোনায় ক্ষত বিক্ষত হবার পরও মাথা উঁচিয়ে পুনরায় রেসিং ট্র্যাকে ছুটে চলছে, যে জাতিকে করোনা পরবর্তী বিশ্ব পরিমণ্ডলে শ্রেষ্ঠ ২২ উন্নয়নশীল জাতির উদাহরণের তকমায় বিশ্ববাসী পরম আগ্রহ সহকারে স্টাডি করছে- সেই বাংলাদেশের ভেতরে বাহিরে মীরজাফরদের বিচরণ অত্যন্ত স্বাভাবিক।

প্রশ্ন হচ্ছে মীরজাফরী চালগুলো নিয়ে আমরা কতটুকু অবগত? কতটুকু শ্রদ্ধা করছি তাদের সুপরিকল্পিত কূটচালসমূহ? নাকি Complacency বা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর গিলছি আমরা এসব "বিচ্ছিন্ন" ঘটনায় আখ্যায়িত করে? আজকের দায়িত্ব অবহেলার ফল কিন্তু একসময় উইপোকার কর্ম সমাপ্তির পাকা ধান কাটা বিষাক্ত চাল গলধকরণ হলে আফসোস করতে হতে পারে। ২০২০ এর শুরুর দিকে চায়নার উহান শহর হতে বিস্তৃত করোনা নিয়ে আমাদের উপহাস/ব্যঙ্গের কথা কি আমরা এতো দ্রুত ভুলে যেতে পারি? এ যেনো " করিয়া ভাবিও, ভাবিয়া করিও না" শ্লোকের আজকের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ছোট বেলায় ঢাকা কলেজের বরেণ্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের একটি ক্লাসে তিনি বলেছিলেন " Fools learn from their own mistakes. But the Intelligent class learn from other's mistake. " আমরা আমাদের কোন ক্যাটাগরির মধ্যে ফেলতে চাই, তা নির্বাচনের জন্য এখুনি সময়।

বাংলাদেশের ১৮ কোটি জনগণের হাজার ধরনের মতাদর্শ/বিশ্বাস থাকতে পারে। থাকতে পারে মতপার্থক্য। থাকা স্বাভাবিক বিভিন্ন চিন্তার বিভিন্ন মতপার্থক্য। কিন্তু একটি বিষয়ে সমগ্র জাতি একই প্ল্যাটফর্মে সহযাত্রী- তা হলো আমার পতাকা এবং আমার পতাকার সার্বভৌমত্বের রক্ষার পবিত্র আমানতধারী প্রতিষ্ঠান এবং আঠারো কোটি জনতার গর্বের ধন- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাংলাদেশের পতাকা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে সকল ভিন্নমতাবলম্বী একটি বিষয়ে ঐক্যমত যে এদের গাঁয়ে তিল পরিমাণ আঁচড় আমরা লাগতে দিবো না। এরা আমাদের গর্ব এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

বর্তমান আইটির প্রসারের যুগে মানুষজন সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে খবর শুনতে যত না আগ্রহী তার চেয়ে ঢের আগ্রহ তাদের ইউটিউব, টুইটারের বিভিন্ন Content মূলক সংবাদে। ফেসবুকের জনপ্রিয়তায় আজ ভাটা পড়ার এটাও একটা প্রধান কারণ। গতকাল এক বন্ধু যার মিডিয়া জগতে ব্যাপক পরিচিতি ও খ্যাতি, তার কাছ থেকে একটি তথ্য পেয়ে আমি রীতিমতো হতচকিত ও স্তম্ভিত হয়ে পড়েছি। আমার ধারণায় ছিল গ্রামের আপামর জনগণ ক্ষেত খামারে কায়িক শ্রমের পর সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে টিভি নিউজ দেখতে দেখতে চায়ের পেয়ালায় সিপ দিয়ে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতো এবং বাড়ি যাবার প্রাক্কালে বাংলাদেশী চলচিত্রের গানের অনুষ্ঠান " ছায়া ছন্দ " দেখেন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের গ্রামের চিত্র যে গত ২/৩ বছরে এতো বদলে গিয়েছে, তা ভাবতেই অবাক হতে বাধ্য হলাম। সচক্ষে না দেখা অব্দি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

কি সেই পরিবর্তন?
গ্রামের মানুষ আজ চায়ের দোকানে Pen Drive নিয়ে গিয়ে Youtube হতে বিভিন্ন Content ডাউনলোড করে নিজে একান্তে তা শুনে। আমার আপনার কাছে এই পরিবর্তনের হয়তো কোন মূল্য নেই বা এটা কোন Matter যোগ্য বিষয় নয়। কিন্তু যারা কুচক্রী এবং ষড়যন্ত্রকারী, তারা এসব তথ্যগুলো ডাইসেকশন টেবিলে বিশ্লেষণ করে এসব নয়া জনপ্রিয় মিডিয়াগুলো ব্যাবহার করে Gobbles Theory এপ্লাই করে একটি মিথ্যাকে ক্রমাগত হাজারবার উচ্চারণ করে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোন সেলগুলোকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে সিগন্যাল প্রদান করে। আর এখানেই আমার আপনার চিন্তার কারণ হওয়াটাই যৌক্তিক। এই অপশক্তিসমূহ তখনি দুর্বল হয়ে পড়বে যখন সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আইলার মত সমন্বিত প্রয়াসে আমরা তা মোকাবিলায় মাঠে নেমে পড়ি।

In Aid of Civil Power নামক টার্মটির সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খুবই পরিচিত। গত মার্চ ২০২০ এর ২৬ তারিখে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ডাকে করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার নিমিত্তে এবং সর্বনাশা করোনার মাঝে রমজান ঈদ পরবর্তী ঘূর্ণিঝড় আইলায় যেভাবে সকলে মিলে একত্রিত হয়ে জাতীয় দুর্যোগ সফলতার সাথে মোকাবিলা করেছে, তা হতে পারে আমাদের সামনে জ্বলন্ত এক সফলতার উদাহরণ।

এই সফলতা হোক আগামী দিনে বাংলাদেশের আকাশে শকুনের আগমনী সংকেতের বিরুদ্ধে বর্তমান পথচলায় নিশ্চিত বিজয় সংকেত। আমরা সকলেই যে যার নাগরিক দায়িত্ব পালনে হই ওয়াদাবদ্ধ। রাজনৈতিক বিভাজন থাকুক, সমস্যা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা রচনা করবো ঐকতানের সুর।

'আমিই বাংলাদেশ ' হোক আমাদের ধ্বনি। ১৮ কোটি জনগণ যখন একত্রিত সুরে আওয়াজ তুলবে " I'm Bangladesh " তখন রিখটার স্কেল ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের আগমনী সংকেতে হারিয়ে যাবে সকল ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির চেনা অচেনা শত্রুদের বিপক্ষে আমাদের এক কাতারে দাঁড়াবার উপলক্ষ করে দিন। আমীন।

শুভ কামনা বাংলাদেশ। শুভেচ্ছা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

লেখক : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
[email protected]

এইচআর/পিআর

'আমিই বাংলাদেশ' হোক আমাদের ধ্বনি। ১৮ কোটি জনগণ যখন একত্রিত সুরে আওয়াজ তুলবে " I'm Bangladesh " তখন রিখটার স্কেল ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের আগমনী সংকেতে হারিয়ে যাবে সকল ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির চেনা অচেনা শত্রুদের বিপক্ষে আমাদের এক কাতারে দাঁড়াবার উপলক্ষ করে দিন

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]