গৃহযুদ্ধের পথে মিয়ানমার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:২০ এএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

ইয়াহিয়া নয়ন

মিয়ানমারে বিরোধী রাজনৈতিকগোষ্ঠির ‘ছায়া সরকার’ সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। বিরোধীরা একে ‘জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ’ ঘোষণা করার পর কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্ট (রাষ্ট্রের আইন অমান্য করার আন্দোলন) এক বিবৃতিতে জানায়, ‘মিয়ানমারের তরুণদের যা আছে তাই নিয়ে লড়াই করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

একইসঙ্গে জাতিসংঘ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য মতের সরকারের (ইউএনজি) সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার আহ্বান জানায় তারা। মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্সের মতে, সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৫৮ জন নিহত হয়েছে। এছাড়াও ছয় হাজার ৩০০ জনের অধিক মানুষ কারাগারে আটক রয়েছেন।

এর আগে, মিয়ানমারে চলমান সেনাশাসনের অবসান ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ‘ছায়া সরকার’ গঠন করেছে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সংসদ সদস্যদের জোট। এ ছায়া সরকারে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) পাশাপাশি দেশটির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর রাজনীতিকরা রয়েছেন। তারা আত্মগোপনে থেকে এ ছায়া সরকার পরিচালনা করবেন ও জান্তাবিরোধী কার্যক্রম এগিয়ে নেবেন বলে জানানো হয়েছে। তারা এ-ও বলেছে, রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেবে এবং নাগরিকত্ব দেবে। তারা তাদের আন্দোলনের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানায়। যদিও তাদের কমিটি এবং সরকারে রোহিঙ্গাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব দেয়া হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ নামে ছায়া সরকার গঠনের ঘোষণা দেয় কমিটি রিপ্রেজেন্টিং পাইদাউংসু হ্লুতাউ (সিআরপিএইচ)। সিআরপিএইচ গঠিত হয়েছে মূলত এনএলডি আইনপ্রণেতাদের নিয়ে। গত সাধারণ নির্বাচনে জয় পেলেও সেনা অভ্যুত্থানের কারণে ক্ষমতায় বসতে পারেননি তারা। রয়েছেন আত্মগোপনে।

সিআরপিএইচের নেতা মিন কো নাইং জানিয়েছেন, নতুন ছায়া সরকারে ক্ষমতা হারানো স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট নিজ নিজ পদে রয়েছেন। অভ্যুত্থানের পর থেকে দুজনই কারাবন্দি রয়েছেন। এ ছাড়া ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী কাচিনদের একজন প্রতিনিধি ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কারেনদের প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

এছাড়া জান্তাবিরোধী ছায়া সরকারের মন্ত্রিসভায় চিন, মন, শানি, কারেনি, তাংসহ আরও কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে বলেও জানিয়েছেন মিন কো নাইং। ১০ মিনিটের ভিডিও বার্তায় ‘জনগণের এ সরকারকে’ অভিনন্দন জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ছায়া সরকারে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রাজনীতিকদের এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

নবগঠিত ছায়া সরকারের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য থাকবে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করা, বলেছেন সিআরপিএইচের প্রভাবশালী নেতা ও ছায়া সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী ড. সাসা। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা জুয়ান গুইদোকে দেশটির বৈধ নেতা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। আমরাও আন্তর্জাতিক সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করব।’

সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। গণতন্ত্রকামীদের প্রবল বিক্ষোভের পর এবার বার্মিজ সেনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন। ফলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি মিয়ানমারের বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে রকেট হামলা চালানো হয়। গণমাধ্যম সূত্রে খবর পাওয়া যায়, মাগওয়ে শহরের বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে আছড়ে পড়ে চারটি রকেট। এছাড়াও মধ্য মিয়ানমারের মেইকটিলা বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতেও আঘাত হানে পাঁচটি রকেট। এই হামলার দায় এখনও কেউ স্বীকার করেনি বলে জানিয়েছে টাটমাদাও বা বার্মিজ সেনাবাহিনী। এই ঘটনার নেপথ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি’র (কেআইএ) হাত আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে চীনের সীমান্তবর্তী কাচিন প্রদেশের স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে লড়াই চালাচ্ছে কেআইএ। ২১ সালের এপ্রিলের ১১ তারিখ টারপেইন ব্রিজের কাছে দুটি পুলিশ আউটপোস্ট ও সেনাঘাঁটিতে হামলা চালায় বিদ্রোহী সংগঠনটি। তারপর থেকেই সেখানে বিমান হামলা শুরু করেছে মিয়ানমার সেনারা। ফলে ঘর ছাড়া হাজার হাজার মানুষ। একইভাবে, থাইল্যান্ড সীমান্তে মিয়ানমারের অন্যতম সংখ্যালঘু কারেন সম্প্রদায়ের জঙ্গি গোষ্ঠী ‘কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন’-এর বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। ফলে ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে মায়ানমারে তৈরি হয়েছে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি।

বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো উদ্বেগের সঙ্গে তা প্রকাশ করছে। দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের এক সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গৃহযুদ্ধের পথে মিয়ানমার, মিয়ানমারে সংঘটিত জান্তাবিরোধী আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে গণতন্ত্রকামীদের, ছাড়িয়ে গেছে সহ্যের সীমা। কারেন রাজ্যে বাঙ্কার খুঁড়ে আশ্রয় নিয়েছেন নিরুপায় ভীতসন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষ। এসব পর্যবেক্ষণ থেকেই সাংবাদিক ক্রিস ব্যারেট ধারণা করছেন ক্রমেই গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। মিয়ানমারের বিশাল একটি অংশ নিয়ন্ত্রণকারী তিনটি জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন জান্তাদের রক্তক্ষয়ী আচরণে ফুঁসে উঠেছে। মৃতের জানাজায় গুলি চালানো, লাশ পুড়িয়ে ফেলা এমনকি শিশুদের উদ্দেশ্যমূলক হত্যাকে ‘জনগণের সঙ্গে লড়াই’ বলে আখ্যা দিয়েছে সংগঠনগুলো। আর কারণেই মনে হচ্ছে তারা সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে।

সামরিক জান্তা শুধু গুলি করে মানুষ হত্যা করছে এমন নয়, তারা একইসঙ্গে আকাশ থেকে বোমা হামলা চালাচ্ছে থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে। এর ফলে ওইসব গ্রামের ভীতসন্ত্রস্ত লোকজন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যাচ্ছেন থাইল্যান্ডে। নিরুপায় এসব মানুষ দেশে ফিরে বাঙ্কার খুঁড়ে তাতে অবস্থান নিচ্ছেন। জনতার পাশে থেকে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ওই তিনটি জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র গ্রুপ। এখন তাদের জন্য একটাই পথ খোলা- সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ। চারদিকে এক গৃহযুদ্ধের দামামা। ক্রিস ব্যারেট আরও লিখেছেন, গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা হত্যাসহ দমনপীড়ন নৃশংসতা অব্যাহত রাখার ফলে দেশটির নিরীহ জনগণ এখন গৃহযুদ্ধের জড়িয়ে পড়ার হুমকিতে আছে।

মিয়ানমারের সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের সতর্কতা জরুরি। ধারণা করা হচ্ছে যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান জাতিগত বিদ্রোহের সঙ্গে এক হয়ে এ আন্দোলন গেরিলা কৌশল যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এরই মধ্যে মিয়ানমারের ছায়া সরকার ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ সামরিক শাসনবিরোধী দল ও ব্যক্তিদের একত্র করে একটি ফেডারেল সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

অবশ্য তাদের এ উদ্যোগ এখনো আন্তর্জাতিক সাড়া পায়নি। প্রতিরোধকারীদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর ওপর হামলা, সরকারি ভবনে আক্রমণ, সামরিক এলাকার প্রবেশমুখে এলাকাভিত্তিক অবরোধ এমনকি ক্ষুদ্রাস্ত্র ব্যবহারের কথা জানা যাচ্ছে। এ কায়দায় তাতমাদার মতো অভিজ্ঞ বাহিনীকে মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু এ পরিস্থিতি স্পষ্টতই মিয়ানমারকে একটি গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং যার পরিণাম শুধু মিয়ানমার নয়, পুরো অঞ্চলকে ভোগ করতে হবে।

এই সময়ে মিয়ানমারের এ গৃহযুদ্ধ পুরোদমে শুরু হয়ে গেলে বেশ কয়েকটি দেশের স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে। চীনের অবস্থানে এটা পরিষ্কার যে তারা মিয়ানমারের সেনা সরকারের পক্ষে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এ অবস্থার কঠোর বিরোধিতা করে নির্দিষ্ট কিছু সেনা কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ অঞ্চলে গৃহযুদ্ধের সূচনা হলে, সরাসরি কোনো অংশগ্রহণ না হলেও তারা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিভিন্ন মিলিশিয়া দলকে সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। চীনকে চাপে রাখা, মিয়ানমারের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে নজর বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব নিশ্চিত করা যেকোনো বিবেচনাতেই যুক্তরাষ্ট্র যদি তার উপস্থিতি নিশ্চিত করে, তবে এ অঞ্চলে ব্যাপক নেতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

আফগানিস্তান ও সিরিয়ার ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ অঞ্চলে চীনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ আছে, ফলে চীন এ গৃহযুদ্ধে আমেরিকা বা তার মিত্রদের প্রবেশ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার একটি বৃহৎ শক্তির প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

যেকোনো যুদ্ধ সীমান্তবর্তী দেশকে প্রভাবিত করে, যেমনটি হয়েছিল আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে পাকিস্তানে এবং সিরিয়ার ক্ষেত্রে তুরস্কে। দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব একপর্যায়ে অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধে পরিণত হয় এবং তা দ্রুত প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। মিয়ানমারের সীমানা আছে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও লাওসের সঙ্গে এবং স্বাভাবিকভাবেই, মিয়ানমারের এ গৃহযুদ্ধের প্রভাব একেক দেশে একেক রকম হবে। চীন-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘর্ষ ও সহিংসতা চীনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে এবং চীন তা প্রতিহত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। ইতিমধ্যে তারা মিয়ানমারের সঙ্গে নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে।

নিকট অতিতে আমরা দেখেছি, শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ। এ থেকে ভারতের ইতিমধ্যে অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে যে প্রতিবেশী দেশে অশান্তি চললে নিজ দেশে তার প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ভারতের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে মিয়ানমারের চীন প্রদেশের সীমানা আছে আর এ অঞ্চলে উদ্বাস্তু সমস্যা রয়েছে। গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ভারত-মিয়ানমারের এ সীমান্ত অনেকটা পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো কাজ করবে।

সীমান্তবর্তী এলাকার বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো এ সুযোগে তাদের কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়াতে পারে এবং এর ফলে অস্ত্র পাচার, গেরিলা প্রশিক্ষণ ও গৃহযুদ্ধে সহায়তা আদান-প্রদানের সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। ভারত তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ভারত এর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযান চালিয়েছে। ফলে ধারণা করা যায় যে মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক সরকারের সঙ্গে ভারতের একটি গভীর ও কার্যকরী সম্পর্ক বজায় থাকবে। মিয়ানমারের এ গৃহযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা হতে পারে খুবই কৌশলপূর্ণ কূটনৈতিক।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমানা দিয়ে স্বাভাবিক সময়ই প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র, মাদকদ্রব্য ও মানুষ অবৈধভাবে পাচার হয়ে থাকে। পুরোদমে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এর মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে। ফলে বাংলাদেশকে তার সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে অনেক বেশি সাবধান হতে হবে। সীমান্তে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দুই দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী এক হয়ে হামলা ও সংঘর্ষ বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ও উপস্থিতি ইতিমধ্যে সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় কোন্দল তৈরি করেছে, এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর আরও অবনতি হতে পারে।

এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে যে, নতুন করে কোনো শরণার্থীর ঢল বা পাশের দেশের গৃহযুদ্ধের প্রভাব সহ্য করার ক্ষমতা বাংলাদেশের কতটুকু আছে। মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হলে ও অস্ত্রের চালান আসতে থাকলে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হবে ভয়ানক। এ অস্ত্রের একটি অংশ দেশের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সুরক্ষাকে বিঘ্নিত করতে পারে। এর চরম প্রভাব পড়বে আমাদের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে। সেখানকার বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে। সীমান্তে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দুই দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী এক হয়ে হামলা ও সংঘর্ষ বাড়িয়ে দিতে পারে।

মিয়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক সীমানা এবং উভয় দেশ বঙ্গোপসাগর দ্বারা সংযুক্ত থাকার ফলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং আমাদের সীমানায় জলদস্যু ও বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। এতে আমাদের ‘ব্যবসা ও সংযুক্তি’-এর যে নীতি এবং যাকে সামনে রেখে আমরা দ্রুত বর্ধিষ্ণু অর্থনীতিতে পরিণত হতে চাচ্ছি, তা বাধাগ্রস্ত হবে। আমাদের বিস্তর উপকূলরেখা ও ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ‘সামুদ্রিক অর্থনীতি’ বিস্তারের যে সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে সহিংসতার সূত্র ধরে অন্য অনেক দেশ এখানে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে পারে।

ইতিহাস থেকে দেখা যায়, একটি অঞ্চলে যেকোনো একটি দেশে বিশৃঙ্খলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে এবং উগ্র সন্ত্রাসবাদ বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে। যেকোনো গৃহযুদ্ধে প্রতিবেশী দেশের অংশগ্রহণ পুরো অঞ্চলকে দারিদ্র্য, সহিংসতা, উগ্রবাদ, প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অবনতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলের দেশগুলোর এখনো এ ধাক্কা সামলে ওঠার সামর্থ্য নেই।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে আছে। কিন্তু তৃতীয় কোনো পক্ষ এখানে নিজের স্বার্থ খুঁজতে এলে বাংলাদেশকেও সেভাবে নিজের পররাষ্ট্রনীতি পর্যালোচনা করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করে সম্ভাব্য চিত্র বিবেচনায় ধরে পরিকল্পনা তৈরি ও সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

লেখক : সাংবাদিক।

এইচআর/এমএস

আফগানিস্তান ও সিরিয়ার ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ অঞ্চলে চীনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ আছে, ফলে চীন এ গৃহযুদ্ধে আমেরিকা বা তার মিত্রদের প্রবেশ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার একটি বৃহৎ শক্তির প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]