যৌনকর্মীর মৃত্যু নিয়ে হাসাহাসি করার আগে নিজেদের দিকে দেখুন

শাহানা হুদা রঞ্জনা
শাহানা হুদা রঞ্জনা শাহানা হুদা রঞ্জনা
প্রকাশিত: ০৯:২০ এএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩

ঢাকার ডেমরা এলাকায় একটি কিশোরী মেয়ের মরদেহ পাওয়া গেছে। পুলিশ ধারণা করছে মেয়েটি যৌনকর্মী ছিল। টাকার হিসাব নিয়ে খদ্দেরের সাথে মতবিরোধের কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। যে দুজন নির্মাণ শ্রমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের আটক করা হয়েছে। একটি প্রথম সারির গণমাধ্যমের ভিডিওতে এ খবরটির নিচে কেউ কেউ হাসির ইমো দিয়েছেন। অনেকে বলেছেন যেমন কর্ম, তেমন ফল। তবে হ্যাঁ অনেকেই এসব মন্তব্যের বিরোধিতাও করেছেন।

যারা হাসির ইমো অর্থাৎ হা হা রিঅ্যাকশন দিয়েছেন, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন যৌনকর্মীদের কাছে কারা যাচ্ছেন? আপনার আমার মতো এই সমাজের মানুষ। এদের মধ্যে শিক্ষিত, নিরক্ষর, উচ্চশিক্ষিত সবাই আছেন। বিভিন্ন পেশার, এমনকি ধর্ম পেশার সাথে জড়িত মানুষও সেখানে যান। এরা সমাজে যার যার মতো প্রতিষ্ঠিত এবং স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিশ্চয়ই রয়েছে পারিবারিক পরিচয়। এই মানুষগুলোই বাইরে বেরিয়ে এসে বড় বড় কথা বলেন। কিন্তু এদের আপনারা ঘৃণা করেন না, হয়তো সুযোগ মতো সালামও করেন। অথচ একজন দরিদ্র যৌনকর্মী মারা গেলে খুশি হন। যারা এদের কাছে নিয়মিত যাচ্ছেন, ঘৃণা করা উচিত তাদের।

একটি মেয়ে কেন এই নিকৃষ্ট ও অমানবিক পেশায় আসেন, কীভাবে এখানে জীবনযাপন করেন, কী তাদের সামাজিক পরিচয়, এই দেহব্যবসার অর্জিত আয় দিয়ে তাদের কতজনের পরিবার ও সন্তান চলে, সেই কথা আমরা অনেকেই জানি না। পৃথিবীর আদিমতম এ পেশাকে সবাই ঘৃণা করি। এতটাই ঘৃণা করি যে মৃত্যুর পর তাদের কবর দেওয়ার ও দাহ করার অধিকারও ছিল না কিছুদিন আগে।

এমনকি জানাজাও পড়ানো হতো না। অথচ এদের কাছে যারা যান, যারা তাদের ভোগ করেন, যারা বাবু হিসেবে এ ব্যবসা চালান, তারা কিন্তু ঠিকই মর্যাদার সাথে কবরস্থ হন। একবারও সমাজ বলে না এই লোকের জানাজা পড়বো না, কবর দেবো না। যার কাছে যাচ্ছে, সে হয়ে যায় অচ্ছুৎ আর যে যাচ্ছে, সে হয় পুত-পবিত্র। কী অদ্ভুত সিস্টেম এই সমাজের।

বহু বছর আগে প্রায় ২০১৬ অথবা ২০১৭ সালে দেখা হয়েছিল এমন একজন নারীর সঙ্গে যার চেহারা দেখলে বোঝা যায় একসময় খুব মিষ্টি দেখতে ছিলেন তিনি। ধরে নেই তার নাম ছবি। ঠিক ডানাকাটা পরীর মতোই সুন্দর ছিলেন তিনি। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় বাবা মারা যান। এরপর কাজের খোঁজে গ্রামের এক খালার হাত ধরে যশোর থেকে ফরিদপুরে এসেছিলেন। তখন তার বয়স ছিল ১৪-১৫ বছর। এখন সে ৩০ বছরের একজন নারী।

খালা কাজের কথা বলে সেই যে দৌলতদিয়া যৌনপল্লিতে এনে তুলেছিল, সেখান থেকে ছবি আর বের হতে পারেননি। এখানেই ছিল তার ঘর, এখানেই ছিল তার সংসার। তিনি জানতেন আর কোথাও, কখনও ফিরে যেতে পারবেন না। নিজের পরিচয় গোপন করে গ্রামে মা, ভাইবোনকে টাকা পাঠাতেন কিন্তু যেতেন না। সেই টাকা দিয়েই মায়ের সংসার চলতো।

কিন্তু যেদিন পুলিশ ও নেতাদের পান্ডারা এসে তাদের এই মাথা গোঁজার ঠাঁইটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল, জিনিসপত্র তছনছ করলো সেদিন অন্য আর সবার মতোই চোখে অন্ধকার দেখেছিলেন ছবি। কারণ তাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা ছিল না। যে মানুষগুলো বহু বছর ধরে রাতে খদ্দের হয়ে এসে প্রায় বিনে পয়সায় তাদের ভোগ করে যেত, আজ তারাই নেমেছে এলাকাকে পবিত্র করার কাজে।

ছবি, বাতাসি, কণা, হেনা, রেশমা- এরা সবাই এই অন্ধকার জীবনে পা রেখেছিল ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সের মধ্যে কারও না কারও দ্বারা প্রতারিত হয়ে, বাড়িঘর, সমাজ ও পরিচয় হারিয়ে। আজ সবাই ৩০ থেকে ৪০ এর ঘরে। জীবন যৌবন সব এখানে বাধা পড়ে আছে। ছবিরা জানতেন না এরপর জানেন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? কী করে খাবেন? কারণ যে বা যারা একবার এ পথে পা রাখতে বাধ্য হয়েছেন, তারা আর কখনো পরিবারে ফিরে যেতে পারেন না।

বাংলাদেশে মূলত যৌনপল্লির জমি দখলের উদ্দেশ্যে যৌনপল্লি উচ্ছেদের শতকরা ৫৩ ভাগ ঘটনা ঘটে। যৌনপল্লি উচ্ছেদ করার মাধ্যমে এ ব্যবসাকে কিন্তু উচ্ছেদ করা যায় না। কোথাও অন্য কোনো কাজকর্ম না পাওয়ায় এবং দারুণ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, প্রচুর যৌনকর্মী শুধু বেঁচে থাকার জন্য এখনও তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে বাধ্য হন আশেপাশের যৌনপল্লি, পার্ক, রাস্তাঘাট, স্টেশন, ভাড়া করা বাসায় অথবা হোটেলে। এখানে উল্লেখ করা উচিত যে শতকরা ৯০ জন যৌনকর্মী এই পেশায় এসেছেন শিশুকালেই।

বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব যৌনকর্মীর শতকরা ৯০-৯৫ শতাংশ সমাজের মূলধারার মানুষদের কাছ থেকে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভয়াবহ রকমের সামাজিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হন। তাদের জন্য নেই কোনো আশ্রয়, স্বাস্থ্য সুবিধা এবং আইনি সুবিধা ও জাতীয় পরিচয়পত্র। অথচ সমাজের বহু মানুষ তাদের যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে এদের কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন।

যৌনপল্লি অথবা পথেঘাটে ঘুরে বেড়ানো যৌনকর্মীরা মানবেতরভাবে বাঁচেন। শতকরা ৯১ জনেরও বেশি সাংঘাতিক রকমের মানসিক ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকেন। যেসব যৌনকর্মী তাদের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন, তাদের অনেকেই অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যার মধ্যে দিন কাটান। অনেক রোগব্যাধি তাদের শরীরে দানা বাঁধে, সঞ্চিত কোনো অর্থ থাকে না হাতে, থাকে না পরিবার-পরিজন, স্বজন। এই সমাজ তাদের প্রতি বাজে ভাষা ব্যবহার করে, ঘৃণা করে, শারীরিক-মানসিকভাবে নির্যাতন করে, প্রয়োজনে হত্যা করে, জনসেবা বা জনগণের জন্য বরাদ্দপ্রাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে।

এমনকি করোনা মহামারি চলাকালে দেশের যৌনকর্মীরা কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। সেসময় প্রায় ১.৫০ লাখ যৌনকর্মী কাজ হারিয়েছেন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, সর্দারণী ও বাড়িওয়ালারা এ অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রক। যৌনকর্মীদের অমানবিক পেশা সমাজে টিকে থাকুক, তা কারও কাছেই কাম্য নয়। কিন্তু পুরুষের প্রয়োজনেই এই পেশা চলছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে যৌন পেশায় শিশুদের কদর বাড়ছে, বাড়ছে অনলাইনে যৌনতা। এমনকি কিশোরী-তরুণীদের সঙ্গে টিকটক ও ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণা করে বিভিন্ন আজেবাজে জিনিস তৈরি করা হয়। আশংকার দিকটি হচ্ছে বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শিশু-কিশোর ও তরুণ তরুণীদের মধ্যে পর্নোসাইটগুলোতে যাওয়ার পরিমাণ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর একটি বড় কারণ ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন অ্যাপ ও প্রযুক্তির ব্যাপক ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

মাঝে মধ্যে এসব অশ্লীল ছবিতে শিশুরা ব্যবহৃত হয়। আবার কখনো কখনো অশ্লীল ভিডিওচিত্র বন্ধুবান্ধবের সাথে বিনিময় ও উপভোগ করে। শিশুদের দিয়ে যৌন দৃশ্যে অভিনয় করানো, তাদের যৌন নিপীড়নের ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং এসব আদান প্রদানের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি) এ তথ্য জানিয়েছে।

একটি মেয়ে কেন এই নিকৃষ্ট ও অমানবিক পেশায় আসেন, কীভাবে এখানে জীবনযাপন করেন, কী তাদের সামাজিক পরিচয়, এই দেহব্যবসার অর্জিত আয় দিয়ে তাদের কতজনের পরিবার ও সন্তান চলে, সেই কথা আমরা অনেকেই জানি না। পৃথিবীর আদিমতম এই পেশাকে সবাই ঘৃণা করি। এতটাই ঘৃণা করি যে মৃত্যুর পর তাদের কবর দেওয়ার ও দাহ করার অধিকারও ছিল না কিছুদিন আগে।-- শাহানা হুদা রঞ্জনা

দেশে ইতোমধ্যে এমনও ঘটনা ঘটছে যে, এসব নোংরা ভিডিওচিত্রে গোপনে ক্যামেরা দিয়ে তোলা তাদের আপত্তিকর ছবি দেখে অনেক মেয়ে আত্মহননের পথও বেছে নিয়েছে। এ ছবি নেটে দিতেও কুণ্ঠিত হয় না অসাধু ব্যবসায়ী ও বিশ্বাসঘাতক বন্ধু-বান্ধবরা। তারা এ ছবিগুলো ব্যবহার করে কিশোরীদের ব্ল্যাকমেইল করে।

স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে পর্নোগ্রাফি এখন যেমন বিনোদনের একটি মাধ্যম, তেমন এটিকে অনেকেই ব্যবহার করে অসাধু ব্যবসার একটি উপায় হিসেবে। কারণ তারা বুঝতে পারছে এ ব্যবসায় প্রচুর টাকা আয় করা যায়। অপহরণকারীরা শিশু-কিশোরকে অপহরণ করে বা আটকে রেখে এ কাজ করতে বাধ্য করে। এছাড়া বন্ধুত্বের নামে অনৈতিক কোনো যৌন কর্মকাণ্ড রেকর্ড করে পর্নো নির্মাতারা শিশুদের ব্ল্যাকমেইল করে।

কিশোরী-তরুণীরা তাদের ছেলে বন্ধু অথবা প্রেমিক বা প্রেমিকের বন্ধুদের দ্বারা ফাঁদে পড়ে এবং পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহৃত হয়। অজ্ঞতার কারণেও অনেকে জড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের পুলিশের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে যে গ্রেফতার হওয়া একজন শিশু সাহিত্যিক- যার সাথে আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছিল। তার হাতে অন্তত ৫০০ বালক যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে তারা তদন্ত চালিয়ে জানতে পেরেছেন।

ডেটিং করার নামে মেয়েদের কোনো ঘরে বন্দি করে তাকে দিয়ে অনৈতিক কাজ করানো হয় এবং তা ভিডিও করা হয়। আর এই ভিডিও বাইরে প্রকাশ করার কথা বলে, তাকে বারবার বাধ্য করা হয় এ কাজ করতে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোপনে ক্যামেরা ব্যবহার করেও অশ্লীল দৃশ্য অথবা অন্তরঙ্গ দৃশ্য ধারণ করে মেয়েটিকে জিম্মি করা হয়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন (সিক্যাফ) জরিপ ‘বাংলাদেশ সাইবার অপরাধ প্রবণতা-২০২৩’ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে সাইবার অপরাধের ধরনে বদল দেখা দিয়েছে এবং বেশি ঝুঁকিতে আছেন নারী ও শিশুরা।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি হ্যাকড হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৫ দশমিক ১৮ শতাংশই নারী।

কাজেই যৌনকর্মীর পেশা নিয়ে, তাদের মৃত্যু নিয়ে, অধিকার নিয়ে ও তাদের সন্তানদের নিয়ে হাসাহাসি করার আগে চিন্তা করা দরকার এরা কতটা অসহায় ও সমাজের কাছে কতটা অপাঙক্তেয়। অথচ এই সমাজের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি যৌনকর্মীদের নোংরা ঘরে গিয়ে যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করেন, খিস্তি খেউড় উপভোগ করেন। কেউ রাস্তা থেকে এদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। কেউবা সুন্দর বাড়িভাড়া করে পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখেন, প্রয়োজন মিটে গেলে ছুড়ে ফেলে দেন।

কেয়া নামের একটি মেয়ে প্রেমিকের সাথে ঘর ছেড়েছিল। বিয়ের পর কয়েক মাস তার স্বামী নামের অমানুষটি তাকে ভোগ করে যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দিয়েছিল। কেয়া তখন ছিলেন দিুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এরপর সেই ছেলে সন্তানকে নিয়ে এই পল্লিতেই অবর্ণনীয় একটি পরিবেশে তিনি থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। আগেও বলেছি, আবারও বলছি এ পেশায় কেউ শখ করে আসে না, আসে বাধ্য হয়ে। এ সমাজের মানুষ তাদের উপভোগ করার পর যখন পরিত্যাগ করেন, তখন এদের অনেকের গর্ভে সেই নামকরা বা বড় বড় মানুষের সন্তান আসে। জন্মের পর সেই সন্তানের পরিচয় হয় যৌনকর্মীর সন্তান।

সরকারের সমাজসেবা বিভাগ এতিমখানা পরিচালনা করলেও বাবার নাম না থাকলে সেখানে কোনো শিশুকে রাখা হতো না আগে। তবে এখন অভিভাবকত্বের নতুন আইন হওয়ার ফলে যৌনকর্মীরা সন্তানদের অভিভাবকত্ব দাবি করতে পারবেন মা হিসেবে। বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের সন্তানদের কোনো মৌলিক অধিকার না থাকায় তাদের অনেক ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। যেমন- জন্মনিবন্ধনের সমস্যা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন ও বাসস্থানের সমস্যা।

সরকারি জন্মনিবন্ধনের ফরমে মা ও বাবা দুজনের নামই লাগে। যৌনকর্মীদের সন্তানদের ক্ষেত্রে বাবার পরিচয় কোথায় পাবে? স্কুলে ভর্তির ফরমেও বাবা-মায়ের দুজনের নাম লাগে। কেউ কেউ বাবার মিথ্যা নাম দিয়ে স্কুলে ভর্তি হতে পারলেও, অনেকের পরিচয় জানার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের বের করে দেয়। সহপাঠী ও শিক্ষক সবাই তাদের এড়িয়ে চলে এবং তারা সেখানে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়।

যৌনকর্মীর বাচ্চারা দমবদ্ধকর একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠে বলে মানসিকভাবে তারা নিপীড়িত ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। মেয়ে শিশুদের বয়স যাই হোক না কেন, তারা আত্মীয়স্বজন, মায়ের খদ্দের, প্রতিবেশী তরুণ, বুড়া, যৌনপলির বাসিন্দা, ‘বাবু’ বা ‘সৎ বাবার’ কাছ থেকে মৌখিকভাবে বা ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে যৌনকাজের প্রস্তাব পাওয়া থেকে শুরু করে, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এমনকি ছেলে শিশুরাও যৌননিগ্রহের শিকার হয়, যা তাদের যৌনকাজ ও মাদকগ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়।

যৌনব্যবসা সমাজে নতুন কিছু নয়। বহু পুরোনো এই সিস্টেম সমাজ ও দেশ ভেদে নানাভাবে ডালপালা মেলেছে। একটি লেখায় পড়েছি গোড়া খ্রিস্টান হয়েও টলস্টয়ের সমাধান ছিল পতিতালয়। তিনি বুঝেছিলেন সমাজটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ম্যানিপুলেটেড ক্ষমতাশালী পুরুষের দ্বারা, বারবার বিয়ে করার মাধ্যমে। তিনি বলেছিলেন স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা না থাকলে পতিতালয়ে যাও। বার্টান্ড রাসেল বলেছিলেন পতিতালয়ে যতটুকু নারীর অনিচ্ছাকৃত যৌনতা হয়, তার চেয়ে ঢের বেশি হয় ভদ্রলোকদের শোবার ঘরে। তার মানে ঘরটাকে ‘বিনিময় যৌনতার আরও বড় ক্ষেত্র’ বলে মনে করতেন তিনি।

একজন যৌনকর্মীর পরিচয়ের ভেতর কোনো লকোচুরি নাই, লুকোচুরি আছে তার, যে পুরুষরা যৌনকর্মীর কাছে যান। আর তাই আমরা সহজেই যৌনকর্মীকে ঘৃণা করতে পারি কিন্তু খদ্দেরকে ঘৃণা করি না।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট।

ফারুক/এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।