নির্বাচনে সেনাবাহিনীই ভোটারদের আস্থার প্রতীক

আহসান হাবিব বরুন
আহসান হাবিব বরুন আহসান হাবিব বরুন , সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
প্রকাশিত: ০১:০৩ পিএম, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের ভোটাধিকার। সেই ভোট যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও নির্ভীকভাবে অনুষ্ঠিত হয়—এটাই একটি নির্বাচনী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত ও দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসে আচ্ছন্ন সমাজে এই পরীক্ষা আরও কঠিন। যা হোক, গণতান্ত্রিক উত্তরণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসতে আর বেশি দেরি নেই। আর মাত্র তিন সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পরই জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচনের সুযোগ পাবেন। তবে আমি মনে করি,জাতীয় নির্বাচন কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠিত ভোটগ্রহণের নাম নয়। এটি একটি জাতির রাজনৈতিক আস্থা, নাগরিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথচলার প্রতিফলন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নাগরিকেরা জানান দেন যে,কে তাকে শাসন করবে, কীভাবে শাসন করবে এবং কতটা জবাবদিহির মধ্যে শাসন করবে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই পবিত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের আবরণে ঢাকা পড়েছে। ভোটকেন্দ্র দখল, সহিংসতা, চাপ ও হুমকির অভিজ্ঞতা বহু ভোটারকে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে ভোটারদের মনে যখন প্রশ্ন জাগে যে, ভোট দিতে গেলে আমি কতটা নিরাপদ—ঠিক তখনই একটি প্রতিষ্ঠানের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। সেই প্রতিষ্ঠানটি হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বহু মানুষের কাছে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিই হয়ে ওঠে ভোটাধিকার প্রয়োগের শেষ ভরসা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের একটি সুসংগঠিত, পেশাদার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা জাতীয় সংকটে—সব ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনী নিজেদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পেশাদার আচরণই নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে জনগণের আস্থার মূল ভিত্তি।

নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা। ভোটার যখন নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, তখনই নির্বাচন অর্থবহ হয়। বাংলাদেশের বহু নির্বাচনে দেখা গেছে, সেনাবাহিনী মোতায়েনের ফলে ভোটকেন্দ্রকেন্দ্রিক সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

রাজনৈতিক ক্যাডার, সন্ত্রাসী বা সংঘবদ্ধ বিশৃঙ্খলাকারীরা সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে সাধারণ ভোটাররা সাহস পেয়েছেন। নারী ভোটার, বয়স্ক মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।

সেনাবাহিনীর আরেকটি বড় ইতিবাচক দিক হলো নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা বিভক্ত হতে পারে। কিন্তু সেনাবাহিনী এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রের একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনমনে পরিচিত। নির্বাচনকালীন সময়ে এই নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ভোটারদের মানসিক নিরাপত্তা দেয়। তারা মনে করেন, কেউ জোর করে তাদের ভোট কেড়ে নিতে পারবে না। বস্তুতপক্ষে, এই মনস্তাত্ত্বিক আস্থাই অনেক সময় নির্বাচনের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করে দেয়।

বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় একটি বড় সমস্যা হলো প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে অভিযোগ। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশকে নিয়ে বিরোধী দলের অনাস্থা নতুন নয়। এই অনাস্থার জায়গায় সেনাবাহিনী একটি ভারসাম্য তৈরি করে। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আরও সতর্ক ও নিয়মতান্ত্রিক করে তোলে। কেউ সহজে ক্ষমতার অপব্যবহার করার সাহস পায় না। ফলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এক ধরনের শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার কিংবা রিটার্নিং কর্মকর্তারা অনেক সময় চাপ ও হুমকির মুখে পড়েন। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি তাদের কাজ করার সাহস জোগায়। তারা আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই স্বাধীনতাই নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার অন্যতম পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব কেবল শক্তি প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের আচরণ, শালীনতা এবং শৃঙ্খলাবোধও একটি বড় ইতিবাচক দিক।

নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় সেনাসদস্যদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ সেনাবাহিনীর প্রতি ভোটারদের আস্থা আরও বাড়িয়ে দেয়। তারা বুঝতে পারেন, সেনাবাহিনী এখানে দমন করতে নয় বরং সুরক্ষা দিতে এসেছে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সুনাম রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের অবদান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও কাজে আসে। বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও সংযম বজায় রাখতে সক্ষম হয়। বলপ্রয়োগ নয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণই তাদের মূল কৌশল। এটি নির্বাচনী গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় ইতিবাচক দিক বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশের ভোটারদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল ভয়। কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, সংঘর্ষ—এসব অভিজ্ঞতা মানুষকে ভোটবিমুখ করেছে। কিন্তু যেসব নির্বাচনে সেনাবাহিনী দৃশ্যমানভাবে দায়িত্ব পালন করেছে, সেসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে, সেনাবাহিনী ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সেনাবাহিনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা হলো নির্বাচন পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা রক্ষা। ফলাফল ঘোষণার পর অনেক সময় উত্তেজনা তৈরি হয়। বিজয়ী ও পরাজিত পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়। এই সময়ে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সহিংসতা প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে। সাধারণ মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং দুর্বল গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তা বোধ করে।
তবে সেনাবাহিনীর এই ইতিবাচক ভূমিকা কার্যকর হয় তখনই, যখন তাদের ব্যবহার হয় সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায়।

সেনাবাহিনী যখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে থেকে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়ক শক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, তখনই তাদের অবদান সবচেয়ে ফলপ্রসূ হয়। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি,সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা করার নীতি মেনে চলাই সেনাবাহিনীর আসল শক্তি।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন বা ধারাবাহিকতার প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনার নির্বাচন। এই যাত্রায় ভোটারদের সবচেয়ে বড় চাওয়া নিরাপত্তা ও আস্থা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই আস্থা সব প্রতিষ্ঠানের ওপর সমানভাবে নেই। এ কারণেই সেনাবাহিনী হয়ে ওঠেছে ভোটারদের শেষ ভরসা।

এই ভরসা মানে এই নয় যে গণতন্ত্র সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। বরং এর মানে হলো—রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী ও পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংকটকালে গণতন্ত্রকে দাঁড়াতে সহায়তা করছে মাত্র। ফলে দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই শক্তিশালী হতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন তখনই সফল হবে, যখন ভোটার নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন। যখন প্রার্থী ও কর্মকর্তারা চাপমুক্ত থাকবেন। যখন ফলাফল নিয়ে দেখা দেবে না বড় ধরনের কোনো সহিংসতা। এই সবকটি শর্ত পূরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি কার্যকর, আস্থাভাজন ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়। তারা ভোটারদের শেষ ভরসা। এই ভরসা যদি পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে রক্ষা করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতন্ত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। সুতরাং গণতন্ত্রের এই কঠিন যাত্রায় সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকা কেবল প্রয়োজনীয় নয় বরং সময়ের দাবি।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।