কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট


প্রকাশিত: ০২:৪৮ এএম, ১৫ মে ২০১৫

১ জুন থেকে শুরু হচ্ছে বাজেট অধিবেশন। এই অধিবেশনেই পাশ হবে ২০১৫-২০১৬ এর জাতীয় বাজেট। কেমন হবে এই বাজেট? কেমন বরাদ্দ থাকবে কৃষিখাতে? কেমন প্রত্যাশা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের? এনিয়ে ‘কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট’ প্রস্তাবনায় ওঠে এসেছে কৃষকদের প্রস্তাব, দাবি ও চাহিদার কথা। এসব নিয়েই জাগো নিউজে লিখেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজসাত পর্বের ধারাবাহিক লেখায় আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব।

(পূর্ব প্রকাশের পর)
নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ হিসেবে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে প্রদত্ত সুপারিশমালায় উল্লেখিত ছিল। এবারও এ পরিস্থিতি বহাল রয়েছে। 

ক. কৃষির আজকের পরিবর্তন : ভূমি মালিকরা ছেড়ে দিচ্ছেন কৃষি

দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে দেশের কৃষিচিত্র। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের দাবি রাখছে যে বিষয়টি, সেটি হচ্ছে দেশের প্রায় সব এলাকায় কৃষক কৃষি পেশা থেকে সরে আসছেন। অর্থাৎ জমির মালিক এখন আর কৃষিকাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। তিনি জমি ভাড়া দিয়ে বা বর্গা দিয়ে চাষাবাদ করাচ্ছেন। ক্ষেত মালিকের ভাষ্য হচ্ছে, আগের মতো এখন আর কৃষিকাজে লাভ হচ্ছে না। তার কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে শ্রমিক ব্যয়। কৃষি শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে। অন্যদিকে উপকরণ ব্যয় তো রয়েছেই। আরেক বিবেচনায় জমির মালিকরা দীর্ঘদিন কৃষিকাজ করতে করতে নানা কারণেই এখন কৃষির প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ছেন। তারা জমি বর্গা দিয়ে অনেকটাই নিষ্কণ্টক ও নিশ্চিন্ত হয়ে যাচ্ছেন। তিনি শহরমুখি ব্যবসা-বাণিজ্যেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। কিছুদিন আগেও যিনি মাঠে নিজের জমিতে কৃষিকাজ করতেন, এখন তিনি রীতিমত শহরের ভদ্রলোক। তার সন্তানকে আর কৃষিকাজে নামানোর ইচ্ছে বা লক্ষ্য কোনোটিই নেই তার। ঠিক এই জায়গাটি দখল করছে দেশের ভূমিহীন ক্ষেতমজুররা। তারা জমি বর্গা নিয়ে স্ব-পরিবারে চাষাবাদে যুক্ত হচ্ছেন। বর্গ চাষী বা ভূমিহীন হিসেবে ঋণ বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা তেমন না থাকলেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে কৃষিতে যুক্ত হওয়ার কারণে সবচেয়ে বড় ব্যয় অর্থাৎ শ্রমিকের খরচটি তারা বাঁচাতে পারছেন। ফলে লাভও হচ্ছে বেশি। কিন্তু জমির মালিক কৃষি থেকে সরে যাওয়ার বহুমুখি প্রতিক্রিয়া রয়েছে সামগ্রিক কৃষিতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষির সঙ্গে ঐতিহ্য ও মায়া মমতার সংশ্রব কমে যাচ্ছে, কৃষি হয়ে উঠছে অতিমাত্রায় বাণিজ্যনির্ভর। আর সে কারণেই কৃষিকাজে লাভ লোকসানের বিষয়টি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

খ. কৃষক পর্যায়ে জৈব কৃষির তৎপরতা : সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো নয়
 
বিজ্ঞানীদের কল্যাণে উচ্চ ফলনশীল শস্যবীজ উদ্ভাবণ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে তা কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া আর কৃষকদের প্রাণান্ত পরিশ্রমে ক্রমেই আবাদি জমি হ্রাস পেতে থাকলেও স্বাধীনতার তিতাল্লিশ বছরে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। এটি বিশ্বে একটি অনন্য উদাহরণ। কিন্তু এই সাফল্য অর্জন করতে গিয়ে মাটিতে ব্যবহার করতে হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। বিরতিহীন ফসল উৎপাদন ও অতিরিক্ত সারের বিষক্রিয়ায় মাটি দিনে দিনে হারিয়ে ফেলেছে তার জৈব উপাদান। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ১৭টি অপরিহার্য উপাদানের উপস্থিতি এবং ৫ শতাংশ জৈব উপাদান উর্বর ও সুস্থ মাটির পূর্বশর্ত। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকার মাটিতে জৈব উপাদানের হার কমতে কমতে কোথাও দশমিক ৩ থেকে দশমিক ১ শতাংশ নিচে নেমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মাটির স্বাভাবিক উর্বরাশক্তি ফিরিয়ে দিতে না পারলে আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার এই গর্ব ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। মাটির উর্বরাশক্তি ফিরিয়ে দেয়ার অন্যতম উপাদান হচ্ছে জৈব সার। আর জৈব সারের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও সহজ একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষক পর্যায়ে কেঁচো কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে এখনও সরকারের ব্যাপক তৎপরতা অপরিহার্য হলেও তা চোখে পড়ছে না।

গ. উচ্চমূল্যের ফলে ফসলে মার খাচ্ছে কৃষক : সরকারের আমদানি ও বিপণন নীতিমালার অভাব

কৃষির সকল পর্যায়ে সরকারে সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকার কারণে, উচ্চমূল্যের ফল ফসল আবাদে ঝুঁকি নিয়ে কৃষক বিনিয়োগ করে দুয়েক বছরের মধ্যেই লোকসানের মুখে পড়ছেন। কারণ, মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে সরকারি আমদানী নীতির সঙ্গে নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এদেশে যখন উচ্চমূল্যের বাউকুল, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, আদা, টমেটো উৎপাদিত হচ্ছে, ঠিক একই মৌসুমে ভারত থেকে ওইসব ফল ফসল আমদানি করা হচ্ছে, এতে স্থানীয় পণ্যের দাম পড়ে যাচ্ছে। চরম লোকসানের শিকার হচ্ছেন কৃষক। অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং হরতালের মতো কর্মসূচির কারণে কৃষক তার পণ্য বাজারজাত করতে না পেরে কোটি কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়ছেন। এই চিত্রগুলো উঠে এসেছে চ্যানেল আই-এর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ আয়োজিত কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে।

ঘ. বাজার চাহিদা, উৎপাদন, আমদানি ও স্থানীয় বিপণন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই

গত ফেব্রুয়ারি (২০১৪) মাসে দেশে আলু নিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নতুন আলু বাজারে আসতে না আসতেই স্মরণকালের সবচেয়ে নিচে নেমে যায় দাম। এর পেছনে যে কারণ ছিল, তা হচ্ছে বছরের সার্বিক চাহিদা, রপ্তানি সম্ভাবনা, সংরক্ষণ সুবিধা ও বাজার অবকাঠামো সম্পর্কে কোনোই পূর্ব সম্ভাব্যতা নির্ণয় না করেই কৃষকদেরকে আবাদে উৎসাহিত করা। এর মধ্য দিয়ে কৃষক অনেক উৎসাহ নিয়ে আবাদ করেছে। কিন্তু গত মৌসুমের আলু কোল্ড স্টোরেজে থাকতেই নতুন আলু উঠে গেছে, বাজারমূল্য না পেয়ে কৃষক রাস্তায় আলু ঢেলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে আলু রপ্তানির জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শুধু পরিস্থিতি সামলানো গেছে কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি।

ঙ. কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তরের গতি মন্থর
 
প্রধান রাসায়নিক সার ইউরিয়ার ব্যবহার কমিয়ে আনা, ব্যয়বহুল সেচ-এর খরচ কমিয়ে আনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এ পর্যন্ত বেশ কিছু প্রযুক্তি, পদ্ধতি ও প্রয়োগযোগ্য উপকরণ উদ্ভাবণ করেছে। কিন্তু এগুলো অজ্ঞাত কারণে কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণ হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সার প্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণী রঙের ছক ‘লিফ কালার চার্ট, ইউরিয়ার ব্যবহার কমিয়ে আনা ও ফসলের বেশি ফলন নিশ্চিত করার জন্য ‘গুটি ইউরিয়া’, সেচের পানির অপচয় রোধ ও কার্যকর সেচ দেয়ার জন্য ‘এ ডব্লিউ ডি’-প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করা যায়। কৃষক পর্যায়ে যেগুলোর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যাপক সম্প্রসারণ হচ্ছে না। এতে কৃষি উৎপাদনে কাক্সিক্ষতমাত্রায় ব্যয় সংকোচন করা যেমন সম্ভব হচ্ছে না একইভাবে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না কাক্সিক্ষত উৎপাদনে।

এছাড়াও যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে দৃষ্টিতে এসেছে তা হলো:
 
১.    বড় বড় সকল নদী নাব্য হারিয়ে ফেলেছে। নদীকেন্দ্রিক কৃষি এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি ও বর্ষা মৌসুমে প্লাবণভূমির আকার ধারণ করছে।

২.    আবাদযোগ্য তিন ফসলি জমিতে আবাসন, অবকাঠামো ও ইটের ভাটা নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকারের জোনিং এগ্রিকালচার প্ল্যানের বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

৩.    সরকারের সঠিক নীতি পরিকল্পনা ও সুদৃষ্টি না থাকায় দেশীয় অসংখ্য উদ্যোক্তার হাত দিয়ে গড়ে ওঠা পোল্ট্রি শিল্প এখন বেহাল দশায় পতিত হয়েছে। দিনের পর দিন পোল্ট্রি খাদ্য ও একদিনের বাচ্চার দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বহু সংখ্যক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিরা রাস্তায় ডিম ঢেলে প্রতিবাদ করেছেন। 

৪.    প্রাণি সম্পদ খাতেও বিরাজ করছে একই সংকট।
 
কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট- এ উত্থাপিত দাবির পরিপ্রক্ষিতে সরকারের নেয়া বেশকিছু পদক্ষেপের কয়েকটি ন্মিরূপ:

১.    কৃষি গবেষণায় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
২.    কৃষকের জন্য উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রবর্তন করা হয়েছে।
৩.    জাতীয় কৃষি দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
৪.    শস্যবীমা বিষয়টি সরকারের আমলে এসেছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে পাইলট প্রকল্প কাজ করছে।
৫.    কৃষি ঋণ সহজীকরণ, ঋণের পরিধি বাড়ানো ও বর্গাচাষীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা।
৬.    জাতীয় বাজেট প্রণয়নে কৃষকদের এই প্রাক বাজেট আলোচনাকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
৭.    তিন ফসলি জমি রক্ষায় সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। অঞ্চলভিত্তিক কৃষির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
৮.    মৌচাষকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
৯.    বেসরকারি পর্যায়ে কারিগরী শিক্ষা কার্যক্রমে মৎস্য বিজ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
১০.    পোল্ট্রি, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ খাতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সংকটের চিত্রগুলো বারংবার উচ্চারিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিষয়গুলো সরকারের দৃষ্টিতে আসার অবকাশ ও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১১.    চরাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে এসেছে।

কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রম কোনো সংখ্যাতাত্তি¡ক জরিপ নয়, এটি  কৃষি ও কৃষকের সাম্প্রতিকতম চাহিদা ও দাবির একটি সামষ্টিক ফর্দ। যা জাতীয় বাজেট-এর পরিকল্পনা ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমটি কৃষকের অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তবভিত্তিক দাবি-দাওয়া। যা সুপারিশমালা আকারে এবার দশমবারের মতো সরকারের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।  চলবে....

এইচআর/এআরএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।