পরবাসে গানে গানে বাংলা শেখা

সাইফুল আজম সিদ্দিকী (মিশিগান) যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশিত: ০৮:৩২ পিএম, ১৩ জুন ২০১৮ | আপডেট: ০৮:৩৯ পিএম, ১৩ জুন ২০১৮

বাংলা গান, গানের তালে পরবাসে বাংলাদেশি সন্তানদের বাংলা শেখার এক অভিনব বিদ্যাপীঠ বাংলা গানে স্কুল। বাংলা গানের সুরে স্থানীয় আমেরিকানরাও ছুটে আসে বাংলা শিখতে। বাংলা বর্ণমালা, গানের তাল-লয় সবকিছু নতুন প্রজন্ম এবং স্থানীয়দের শেখানো সোজা কথা নয়। সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয়ভাবে বাংলাকে তুলে ধরতে এ পাঠশালা দিনকে দিন জনপ্রিয় হয়ে চলেছে সবার মাঝে। আগত শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ও ইংরেজি ফোনেটিক উচ্চারণ এবং অনুবাদসহ গানের বই প্রকাশ করা হয়েছে ব্যতিক্রমী এ পাঠশালায়। জয় করেছে নাইট পুরস্কার।

২২ বছর আগে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে বাংলাদেশি অধুষ্যিত এলাকায় ‘বাংলা স্কুল অফ মিউজিক’ নামের গানের পাঠশালার যাত্রা শুরু। সময়ের আবর্তে অনেক চড়াই উতড়াই পেরিয়ে আজ স্কুল বাংলাদেশিদের কাছে এক জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। প্রবাসে বাংলার সব উৎসব এখানে বেশ ঘটা করে পালিত হয়। প্রবাসে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি শিক্ষার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলছে বাংলা গানের স্কুল।

বাংলা স্কুল সবার স্কুল, সব বয়সের জন্য এ স্কুলের দরজা খোলা। প্রবাসে জন্ম নেয়া বাংলাদেশি আমেরিকানদের জন্য বাংলা শেখানো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই অবস্থানে থেকে বাংলা গান ও গানের সব বাদ্যযন্ত্র শেখানোর কঠিন কাজ করে যাচ্ছেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল আকরাম হোসাইন। নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলা ভাষা ও শেখার ব্যাপক আগ্রহ আকরাম হোসাইনকে এ স্কুল প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ জুগিয়েছে বলে জানালেন। বাংলা সংস্কৃতি বিকাশে এ কাজ করে আসছেন তিনি তার ব্যক্তিগত ভালোবাসার জায়গা থেকে।

রবীন্দ্র, নজরুল গীতি, লালনের গান, ভারতীয় ক্লাসিক, আধুনিক বাংলা ও ভারতীয় বাংলা গানের ছন্দ, তাল- লয় ও অন্ত্যমিল এ স্কুলের প্রধান বিষয়। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশি বাচ্চাদের জন্য বাংলা অক্ষরের সঙ্গে পরিচয়, বাংলা ভাষা পড়া, লেখা, ও সঠিকভাবে বাংলা বলতে পারার শিক্ষা দেয়া হয়। ছবি আঁকার মাধ্যমে গ্রাম বাংলার অপরূপ দৃশ পৌঁছে দেয়ার কাজ করে যাচ্ছে এ গানের স্কুল।

বাংলা টাউন খ্যাত হামট্রামাক শহরের উত্তর পার্শ্ব ও ডেট্রয়েট শহর সীমানা ঘেঁষে ডেভিসন ফ্রীওয়ের পাশে ছোট এক বাসায় এ স্কুল। স্কুল, বন্ধু টিভিসহ চারপাশে যেখানে ইংরেজি, তখন নিজের সন্তানকে শিকড়কে ধরে রাখতে, বাংলা ভাষার অভিজ্যাত বোঝাতে বাবা-মা অনেকটা জোর করেই সন্তানকে এ গানের স্কুলে দিচ্ছেন বলে জানালেন গান ও গিটারের শিক্ষক এথেনা আকরাম। বাদ্যযন্ত্রের মাঝে হারমোনিয়াম, তবলা, হাওয়াই গিটার, স্প্যানিশ গিটার, পিয়ানো, ও কিবোর্ড শেখানো হয়।

প্রথমে বাচ্চাদের অনেকটা জোর করে স্কুলে নিতে হলেও অল্প দিনেই এ স্কুল হয়ে উঠে বাচ্চাদের প্রিয় স্থান। নতুন সব বন্ধু, নাচে গানে বাংলা শেখা ও নিজেকে জানা ও বাংলা ভাষার মধুরতা সব কিছু মিলে ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা পড়ে এ স্কুলে।

Bangla-School-1

আজ থেকে দুই দশক আগে ১৯৯৬ সালে বাংলা গানের স্কুলের যাত্রা শুরু। আকরাম হোসাইনের হাত ধরে এ স্কুলের পথ চলা। শুরু থেকেই প্রতি বছর বেশকিছু অনুষ্ঠান করে থাকেন। প্রতি সপ্তাহের শনি ও রোববারে প্লে হাউজে (ভবনের নাম) মিলিত হন সব ছাত্রছাত্রীরা। গানের স্কুলে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা উৎসব, ভালোবাসা ও বসন্ত উৎসব, মার্চে স্বাধীনতা উৎসব, এপ্রিলে বৈশাখ। এমনটি প্রতি মাসেই কোন না কোন উৎসবে গানের আয়োজন। বাংলাদেশ থেকে বড় কোনো শিল্পী এলে তার আতিথিয়তা ছাড়া মিশিগান ছেড়েছেন এমনটি এখনো হয়নি। রেজোয়ানা চৌধুরী বন্যা থেকে এ যুগের বিউটি দাস সবাই তার অতিথি। গানের স্কুলের হয়ে মিশিগানে গান করেছেন প্রথিতযশা সব শিল্পিরা। ফরিদ রহমান, তাজুল ইমাম, তপন মদক, ক্বাদরী কিবরিয়া, সৌমেন অধিকারি, রেজোয়ানা চৌধুরী বন্যা, রথিন্দ্র নাথ রায়, দুলাল ভৌমিক, ফেরদৌস আরা, রামা মণ্ডলসহ অনেকে।

গান ও বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষক হিসেবে এ গানের স্কুলে রয়েছেন প্রিন্সিপাল আকরাম হোসাইন নিজেই। রয়েছেন তার মেয়ে এথেনা আকরাম, শাম্মি আক্তার, নাজমুল আনোয়ার, লিজা, আক্তারুজ্জামান, আইরিন সুলতানা অ্যানি। গানের স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উৎযাপনে রয়েছে শক্তিশালী এক কমিটি। প্রিন্সিপাল আকরামের নেতৃতে এ কমিটিতে রয়েছেন নাজমুল আনোয়ার, এথেনা আকরাম, জি এম আলী হায়দার, আহমাদুল হাসান রুশো, চিনু মৃধা, লিজা, উত্তম বড়ুয়া, শাম্মি আক্তার, সাঞ্জিব রায় চৌধুরী ও সুব্রত মোহান্তা।

৪৫ বছর থেকে গান, গানের সব বাদ্যের সঙ্গে তার সখ্য। ১৯৯২ সালে সহধর্মিণী ও মেয়েসহ যুক্তরাষ্ট্রে ছয় মাসের জন্য বেড়াতে আসেন। সে সময় তার সহধর্মিণী মিশিগানে ফিজিক্যাল থেপারিস্ট হিসেবে চাকরি পেয়ে যান।

আমেরিকায় আসার আগে মুক্তিযোদ্ধা আকরাম হোসাইন দেশে বাংলাদেশ বেতারে সংগীত শিল্পী, কম্পোজার, ও সংগীত পরিচালনা করতেন। বাদ্যযন্ত্রে দখল তার ছোটকাল থেকে। ১৭ বছর বয়েসে পাকিস্তানে জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতায় গিটারে স্বর্ণ পদক জেতেন। সংগীত জগতের হাতেখড়ি পেয়েছেন সাধন সরকার, বিনয় রায়, আজিজ খানের মতো ওস্তাদের সান্নিধ্য।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনা রেডিওতে যোগদেন। যুদ্ধে মুক্তি বাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করতে জীবন বাজি রেখে সংগীত প্রচারের কাজ করেন। যুদ্ধ জয়ের পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খুলনায় সংগীত পরিচালক হিসাবে যোগদান করেন।

১৯৯৭ সালে আকরাম হোসাইন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক করেন। এতে তিনি মাস খানেক প্যারালাইসিস আক্রান্ত হন। তবে তিনি বাংলা স্কুলের হাল ছাড়েননি। পাওয়ার হাউজ প্রডাকশনে অবাঙ্গালীদের সঙ্গে কাজ করেন। বাংলাকে উপস্থাপনে সর্বদা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন। থিয়েটার গ্রুপ হিন্টারল্যান্ড এর সাথে মিলনায়ন শেয়ার করেন। এতে তার গানের স্কুলের শিক্ষার্থীরা বড় পরিসরে পারফর্ম করার সুযোগ পায়। রাজ্যের যে কোনো স্থান থেকে ডাক এলেই উনি তার স্কুলের শিক্ষার্থীদের উপস্থাপন করেন, তৈরি করেন অনুষ্ঠানের জন্য।

নাইট ফাউন্ডেশন পুরস্কার

মিশিগানে বাংলা সংস্কৃতি চর্চা ও বিস্তারে কাজ করে যাওয়া বাংলা গানের স্কুল নাইট ফাউন্ডেশন পুরস্কার লাভ করেন। স্কুলের শিক্ষার্থীরা মূলত প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি হলেও আমেরিকানরা বাংলা গানে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বাংলা গান শিখতে, গানের সঙ্গে গলা মেলাতে গানের স্কুল থেকে ২০১৫ সালে একটি বই প্রকাশ করে। ড. মোহাম্মদ নাজমুল আনোয়ারের সম্পাদনায় এ ‘চন্দ্রতরু’ নামে বাংলা গান ও কবিতার বই প্রকাশিত হয়।

Bangla-School-2

পাওয়ার হাউস প্রডাকশনের সহযোগিতায় এ বই ইংরেজি ফোনেটিক উচ্চারণ এবং অনুবাদ প্রকাশিত হয়। যা বাংলাদেশি আমেরিকান নতুন প্রজন্ম ও অবাঙালিদের সহজবোধ করে তোলে। ২০১৫ সালে অলাভজনক এ গানের স্কুল ফাউন্ডেশন থেকে গ্রান্ট লাভ করেন, যা গানের স্কুলের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়।

বাংলা গানের স্কুলের দ্বিতীয় প্রকাশনা ‘গীতিমালা’ বাজারে এসেছে। বাংলা ও ইংরেজি ফোনেটিক উচ্চারণ এবং অনুবাদ এ গানের বই সম্পাদনা করেছেন ড. মোহাম্মদ নাজমুল আনোয়ার। বাংলা স্কুল অব মিউজিকের প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান আকরাম হোসেন ছিলেন সর্বাত্মক সহযোগিতায়। তার শিল্পী জীবনের সাফল্য উদযাপনের ওপর একটি নিবন্ধ আছে এই বইতে। মিথুন চক্রবর্তী এবং অভ্র চট্টোপাধ্যায় এর বেশ কিছু কবিতার চমত্কার অনুবাদ করেছেন। লিজা বিল্বি ও জিনা রাইকার্ট ছিলেন এর প্রকাশনের সহযোগিতায়। বাংলা ও ইংরেজি ফোনেটিক উচ্চারণের পাশাপাশি বইয়ের ফ্রন্ট সাইজ নির্বাচনে আনা হয়েছে ভিন্নতা, এতে অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনে এ বই রেফারেন্স হিসেবে কাজে আসবে। বাংলা স্কুলের সবার বিশ্বাস এ বই নতুন প্রজন্মকে সহজ ভাষায় গান শেখায় উৎসাহ যোগাবে। বাংলা গানকে, বাংলা ভাষাকে অন্যান্য জাতির কাছে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরতে এ জ্ঞানের স্কুল অন্যান্য।

জেএইচ/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :