প্রবাস জীবনের বাস্তব কিছু কথা

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৪:০৪ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

দুইদিন ধরে সুইডেনের টিভির পর্দায় দুটি বাংলাদেশি মেয়েকে দেখছি। গত নয় বছর ধরে তারা অসুস্থ মাকে নিয়ে এখানে বসবাস করছে। তবে মা’র অসুস্থতার কারণে মেয়ে দুটিকে সুইডিশ সমাজের দায়িত্বে রাখা হয়েছে। সুইডিশ কর্তৃপক্ষ মেয়ে দুটিকে সকল সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করছে।

যদিও তাদের সুইডেনে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি আজ অবধি হয়নি। সুইডিশ ইমিগ্রেশন ৯ বছর পর তাদের স্থায়ী নাগরিকত্ব না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে নানা মহল থেকে নানা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে তাদের!

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার মানুষ ধনী দেশগুলোতে আসছে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য সবধরনের চেষ্টা করে চলছে। প্রিয়জন, সমাজ এমনকি নিজ দেশ ছেড়ে কখন মানুষ ভিন দেশে এসে আশ্রিত হয়! যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, জীবনের গতি থেমে যায়।

পিছে যাওয়ার জায়গা থাকে না তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে যা থাকে তার সবকিছু বিক্রি করে। শেষে বিদেশ ভুবনে এসে সত্য মিথ্যার সাহায্যে চেষ্টা করে নতুন জীবন শুরু করতে। অনেক চেষ্টার পর কেউ স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পায়, কেউ পায় না।

জীবনে সুযোগ পাওয়ার পর মানুষ যখন ভুলে যায় অতীতের কথা, ভুলে যায় জীবনের স্ট্রাগেল, ভুলে যায় কৃতজ্ঞতা আমি সেই গ্রুপের কিছু মানুষের কথা তুলে ধরব। প্রশ্ন আসতে পারে কেন অকৃতজ্ঞদের কথা তুলে ধরলাম কৃতজ্ঞদের রেখে?

কারণ ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণের মধ্যেও রয়েছে শিক্ষণীয়। যারা অকৃতজ্ঞ তাদের থেকেও অনেক কিছু শেখার থাকে। তাই একই ধরনের ভুল করা এবং ভুল করে শেখার চেয়ে অন্যের ভুল দেখে শেখা শ্রেয় বলে আমি মনে করি।

দরিদ্র হয়ে জন্মগ্রহণ করা দোষের নয় তবে মিথ্যা দিয়ে জীবন শুরু করা দোষের। কথায় বলে কয়লা ধুলে ময়লা যায় না। মিথ্যা দিয়ে যারা জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে তারা বাকি জীবনটাই মিথ্যার সঙ্গেই বসবাস করে।

যে বা যারা নিজ পরিবার বা নিজ দেশের বদনাম করে পরদেশে আশ্রিত, তারা সেই দেশেরও বদনাম দিয়ে থাকে। যেহেতু অন্যায় এবং মিথ্যার সাহায্যে জীবন গড়ার সুযোগ পেয়েছে সেহেতু সেটাই তারা মনে করে সাফল্যের চাবিকাঠি।

আধুনিকতার নামে আজ অনেকেই নানা অপসংস্কৃতির অনুকরণ করে আত্মপ্রসাদ লাভে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তথাকথিত আধুনিকতার মায়াবী ছলনায় স্বকীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে আধুনিকতার গৌরব অনুভব করছে।

তাই দেখা যায়, সমাজ জীবনে তাদের স্নেহ-প্রীতি-ভালোবাসা প্রায় অবলুপ্ত। শ্রদ্ধা-বিনয় অদৃশ্য, দুর্নীতি ও ভ্রষ্টাচারে সামাজিক পরিমণ্ডলে তারা কলুষিত। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ইত্যাদি তাদের স্বাভাবিক জীবনকে ছন্দহীন করে তুলেছে। অপকর্মে লিপ্ত থাকাটা যেন তাদের কাছে নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল ফোন করেছে এক বাংলাদেশি বড় ভাই। থাকেন কানাডায়। তিনি পরিবারের বড় ছেলে। দেশের লেখাপড়া শেষ করে সেখানে বসবাস করছেন বহুবছর ধরে। বড় ভাই হিসেবে তার দায়িত্ব অনেক।

তার পরিবারের যারা দেশে বসে বসে অন্ন ধ্বংস করছে বলতে গেলে গুড ফর নাথিং, তাদের জীবনের নিশ্চয়তা দেবার দায়িত্ব বড় ভাইকেই নিতে হয়েছে। এ ধরনের দায়িত্ব শুধু বড় ভাই হিসেবেই নয়, নানা চাপের কারণেও নিতে হয়। যেমন মনুষ্যত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ বা পাছে লোকে কিছু বলে বা পরিবারের জন্য কিছু করার বোধ থেকে। ভদ্রলোক সবগুলো দিক ভেবেই তার পরিবারের সবাইকেই নানাভাবে সাহায্য করেছেন।

পরিবার, সমাজ এমনকি দেশের বদনাম হবে ভেবে যাদেরকে দেশ থেকে সরিয়ে বিদেশে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন আজ তাদের সকল বদনাম সেই বড় ভাইকেই বহন করতে হচ্ছে।

ঘটনা প্রসঙ্গে বললেন কেউ বিয়ে করছে তিন থেকে চারবার। বউ ছাড়ছে আবার নতুন করে সেই বউয়ের বোন, খালা বা কাছের একজনকে বিয়ে করছে। কেউ আবার দেশ থেকে অন্যকে বিদেশে আনবে বলে প্রচুর টাকা ফাঁকি দিয়ে আত্নসাৎ করছে।

কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, এত বছর আপনার সঙ্গে পরিচয়, এসব কথা এতদিন বললেন না কিন্তু হঠাৎ এখন কেন? উত্তরে বললেন, গত কয়েকদিন আগে আল জাজিরার খবর দেখে বিবেক নাড়া দিয়েছে।

দরিদ্র পরিবার বা দেশে জন্মগ্রহণ করার মাঝে একটি জিনিস কমন সেটা হলো পরিবারের যে সদস্য সম্মানিত বা প্রতিষ্ঠিত হয় তাকেই সব কিছুর দায়ভার নিতে হয়। বিনিময়ে লাঞ্ছনা-গঞ্জনাও তাকে সইতে হয়। এখানেই লেখার সমাপ্তি হতে পারত। কারণ সবাই এ পর্যন্ত এসেই অতীতে লেখার ইতি টেনেছেন। আমি শুরু করতে চাই এখান থেকে।

আমি সুইডেনে বহু বছর বসবাস করছি। এখানে তাদের বড় ভাই রয়েছে কিন্তু বড় ভাইয়ের কোনো নীতিগত দায়ভার নেই ছোটদের জীবন গড়ার জন্য। এমনকি সন্তানের বয়স ১৮ বছর হলে বাবা-মা’রও কোনো আইনগত দায়ভার নেই। এমন নয় যে সরকার সব দায়ভার বহন করে।

ব্যক্তি তার নিজের দায়ভার নিজেই নেয়। কর্মের ফলাফলও সে নিজেই বহন করে। এক ভাইয়ের কৃতিত্বে যেমন অন্য ভাইয়ের বাহাদুরি নেই, ঠিক এক ভাইয়ের অপকর্মে অন্য ভাইয়ের জীবননাশ বা বিনাশেরও সম্ভাবনা নেই। কারণ একটিই সেটা হলো প্রত্যেকেই তার নিজ ভালো মন্দের জন্য দায়ী।

এখানে পরিবার, সমাজ এবং দেশের পরিকাঠামোকে প্রথম থেকেই সঠিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। যার ফলে শত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সমাধানের ধারাবাহিকতা ক্রমাগত উন্নতির দিকে বয়ে চলেছে।

আমরা সবাই সোনার বাংলা গড়ার বিষয়ে একমত। কিন্তু কীভাবে সেটা গড়া সম্ভব বা কী করণীয় বা বর্জনীয় তাকি ভেবে দেখেছি? এ বিষয়ে কি আমরা একমত এবং কোথায় সে তথ্যগুলো?

যে দেশের জাতীয় খেলা হাডুডু বা কাবাডি যাই হোক না কেন, জিততে হলে টেনে ধরে রাখতে হবে, সামনে যেতে দেয়া যাবে না। যে দেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল যার মধ্য রয়েছে শত শত রসাল ফল এবং বিচি, সেই দেশের মানুষ আমরা, কী জানি বাবা, বোঝা মুসকিল! কীভাবে এবং কবে আমরা বাঙালি হবো বাংলাদেশি আর কবেই বা হবে আমাদের জাতীয় চরিত্রের শনাক্তকরণ!

দেশকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসতে হলে যে বিষয়টির উপর কড়া নজর দেয়া দরকার তা হলো দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা।রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন তাদের জন্যও দরকার দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তি নিশ্চিত করা।

পাশাপাশি দরকার আমূল সংস্কার ও কঠোর নজরদারি এবং জরুরি সুশাসন নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, কোনো খাতেই যোগসাজেশ ছাড়া দুর্নীতি হয় না। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ পেতে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্যাশ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার করা দরকার। সর্বপরি বাংলাদেশের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে।

সুস্থ সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। সমাজে অশুভ শক্তি যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। তরুণ-যুব সমাজকে সঠিক পথে রাখার জন্য যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। কারণ আদর্শ সমাজ গঠনে, অনিন্দ্য সুন্দর দেশ গঠনে নৈতিকতার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]