রোজা নিয়ন্ত্রিত জীবনের প্রশিক্ষণ

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৩৭ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রোজা নিয়ন্ত্রিত জীবনের প্রশিক্ষণ ছবি: ফ্রিপিক

মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান (রহ.)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, রোজা (যুদ্ধে ব্যবহৃত) ঢালের মতো। তোমাদের কেউ যেন রোজা পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার। (সহিহ বুখারি: ১৯০৪)

আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, রোজা ঢালের মতো, যতক্ষণ না মানুষ নিজেই তা ভেঙে ফেলে। (সুনানে নাসাঈ: ২২৩৩)

রোজা মূলত প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের অনুশীলন। রমজান মাসে এই অনুশীলনকে এমন পর্যায়ে নেওয়া হয় যে, খাওয়া-দাওয়ার মতো স্বাভাবিক ও বৈধ বিষয় থেকেও বিরত থাকতে হয়। খাওয়া-দাওয়া মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বৈধ; কিন্তু রোজার দিনে একেও হারাম করে হয়েছে, যাতে মানুষ নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

যদি মানুষের মনে সব সময় রোজার এই উদ্দেশ্যটা জিন্দা থাকে, তবে সে কখনও রাগে উত্তেজিত হবে না, বরং নিজেকে সংযত রাখবে। কারণ রোজা তো আত্মনিয়ন্ত্রণেরই শিক্ষা। একজন মানুষ রোজা রেখে কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দিতে পারে?

প্রতি বছর এক মাস মেয়াদে এই কঠোর শিক্ষা প্র্যাকটিক্যালি বাস্তবায়ন করা হয়। যদি কেউ বিশুদ্ধ মনে রমজানের হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করে রোজা রাখে, তবে এই এক মাসের প্রশিক্ষণের প্রভাব তার বাকি এগারো মাসের জীবনেও বজায় থাকবে। প্রশিক্ষণের সময় সে যখন নিজেকে সংযত রেখেছিল—প্রচণ্ড রাগের সময়ও অসংযত হয়নি—তখন স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পরবর্তী জীবনেও দেখা যাবে। মানুষ তাকে অন্য মাসগুলোতেও ‘রোজাদারের মতো’ দেখতে পাবে, যেমন রমজানে দেখেছিল।

রোজা নিঃসন্দেহে এক উচ্চস্তরের ইবাদত এবং এর প্রতিদানও অনেক। কিন্তু এই প্রতিদান নির্ধারিত হয়েছে প্রকৃত রোজাদারের জন্য—লোক দেখানো রোজাদারের জন্য নয়।

হাদিসে এসেছে, মানব সন্তানের প্রতিটি নেক কাজের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু রোজার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিফল দান করব। বান্দা আমারই জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৫১)

অন্যদিকে আবার বলা হয়েছে, ‘এমন অনেক রোজাদার আছে যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত নামাজ আদায়কারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৯০)

আরও বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যাচার, মূর্খতা ও মূর্খতাসুলভ কাজ ত্যাগ করল না, তার পানাহার বর্জন করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৮৯)

বাহ্যিকভাবে সবার রোজা একই রকম মনে হলেও এই পার্থক্যের কারণ কী? কারণ শুধু না খেয়ে থাকার নাম রোজা নয়; এটি আসল রোজার একটি ‘আলামত’। যে ব্যক্তি সেই আলামতকে তার প্রকৃত অর্থসহ পালন করে, সে আল্লাহর কাছে বড় পুরস্কার পায়। আর যে ব্যক্তি প্রকৃত রোজাকে উপেক্ষা করে, তার রোজার কোনো মূল্য থাকে না। প্রতীকী বিষয়ের মূল্য নির্ধারিত হয় তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে, কেবল বাহ্যিক রূপের ভিত্তিতে নয়।

রোজার বাহ্যিক রূপ হলো খাওয়া-দাওয়া পরিহার করা। এই পরিহার আসলে এ কথার প্রতীক—বান্দা আল্লাহর নির্দেশের অধীন। তিনি আল্লাহর নির্দেশে যে কোনো কিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত—এমন কি প্রয়োজনীয় জিনিসও।

অতএব যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করে কিন্তু আল্লাহ নিষিদ্ধ অন্যান্য বিষয়—যেমন মিথ্যা কথা, অন্যায় আচরণ—ত্যাগ করে না, সে যেন প্রতীকী নির্দেশ মানল কিন্তু প্রকৃত নির্দেশ অমান্য করল। এমন ব্যক্তি কোনো পুরস্কারের যোগ্য হতে পারে না।

প্রকৃত রোজাদার সে, যার রোজা তার সমগ্র জীবনের রোজায় পরিণত হয়—যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণকে মেনে চলে। তার জিহ্বা কু-কথা বলা থেকে বিরত থাকে, তার হাত অন্যায় কাজ করে না, তার পা অবিচারের পথে চলে না। হাদিসের ভাষায়—সে যেন সেই ঘোড়ার মতো, যা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা; দড়ি যতটুকু, সে ততটুকু সীমার মধ্যেই থাকে, তার বাইরে যায় না। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৩৮৩৭, শুআবুল ঈমান লিল বায়হাকি: ১০৪৬০)

রোজার প্রকৃত অর্থ হলো মন্দকে পরিত্যাগ করা। সত্যিকার রোজা সেটাই, যেটা মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রে মন্দত্ব ত্যাগের সমার্থক হয়ে ওঠে।

তর্জমা: মওলবি আশরাফ

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।