আয়াতুল কুরসি আল্লাহর অপূর্ব দান

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:২৮ এএম, ১৩ আগস্ট ২০১৫

কুরআন আল্লাহ তাআলার বানী। যা মানুষের জন্য নাজিল করা হয়েছে। মানুষের উপকারে এ কুরআনে রয়েছে বিশেষ কিছু আয়াত ও সুরা। দোয়া ও আমল হিসেবে এগুলো মানুষের উপকারে খুবই কার্যকরী। সুরা ফাতিহার পর সবচেয়ে বেশি পঠিত ও মুখস্ত থাকা অন্যতম আয়াত হলো আয়াতুল কুরসি।

হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় কার্যকারিতা, প্রয়োজনীয়তা, ফজিলত, মর্যাদা ও উপকারিতায়ও সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে এ আয়াতুল কুরসি।

আয়াতুল কুরসির পরিচয়
আল্লাহর গুণ বর্ণনায় এ আয়াতটিই সবচেয়ে বড়। কুরআনুল কারিমের দ্বিতীয় ও বড় সুরা ‘সুরা বাকারা’র ২৫৫ নং আয়াত এটি। এ আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি, গুনাবলী ও বৈশিষ্ট্য সম্বলিত ১০টি অংশ রয়েছে।

আয়াতুল কুরসির মর্যাদা
হজরত উবাই ইবনু কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হে আবুল মুনযির! তোমার কাছে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জানেন। তিনি আবার বলেন, হে আবুল মুনযির! তোমার কাছে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ? আমি বললাম, ‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম’ (আয়াতুল কুরসি)। তখন তিনি আমার বুকে (হালকা) আঘাত করে বলেন, হে আবুল মুনযির! তোমার জ্ঞান আনন্দদায়ক হোক।’ (আবু দাউদ)

আয়াতুল কুরসি
اللّهُ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
উচ্চারণ- আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম। লা তাঅ খুযুহু সিনাতুঁও ওয়া লা নাওম। লাহু মা ফিস্ সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ্বি। মাং জাল্লাজি ইয়াশফাউ ইংদাহু ইল্লা বি-ইজনিহি। ইয়ালামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়া মা খালফাহুম, ওয়া লা ইউহিতুনা বিশাইয়্যিম্ মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শাআ ওয়াসিআ কুরসিইয়্যুহুস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি, ওয়া লা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা ওয়া হুওয়াল ‘আলিয়্যুল আজিম।’ (উচ্চারণটি কোনো কুরআন বিশেষজ্ঞের কাছে বিশুদ্ধভাবে পড়ে নেয়া জরুরি)
অর্থ : (তিনিই) আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং ঘুমও নয়। সবই তাঁর, আসমান ও জমিনের মধ্যে যা কিছু রয়েছে। কে আছ এমন- যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? (চোখের সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানের সীমা থেকে কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টিত করতে পারবে না, কিন্তু ‘হ্যাঁ’, তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন তা ছাড়া। সমগ্র আসমান এবং জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে তাঁর সিংহাসন। আর সেগুলোকে ধারণ (নিয়ন্ত্রণ) করা তাঁর জন্য কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।’

আয়াতুল কুরসি জান্নাতের দরজা
হজরত আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়বে, ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতে প্রবেশ করা মৃত্যু ছাড়া আর কোনো কিছু বাধা হবে না।’ (বুখারি, নাসাঈ, তাবারানি)

মানুষের নিরাপত্তায় আয়াতুল কুরসি
>> হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার দেখতে পেলেন একজন ব্যক্তি সাদকার মাল চুরি করছে। তখন তিনি তার হাত ধরে বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে আল্লাহর রাসুলের কাছে নিয়ে যাব।’ তখন ওই ব্যক্তি বলল যে, সে খুব অভাবী আর তার অনেক প্রয়োজন। তাই দয়াবশত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে ছেড়ে দিলেন ।
পরদিন সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসার পর তিনি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘গতকাল অপরাধীকে কী করেছে?’
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন তাকে ক্ষমা করার কথা বললেন ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘অবশ্যই সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে আর সে আবারও আসবে।
এভাবে চোর পরপর ৩দিন সাদকার মাল চুরি করতে আসে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুও তাকে প্রত্যেকবার ছেড়ে দেন। সর্বশেষ সে আয়াতুল কুরসির আমলের কথা বর্ণনা করে বলে-
আমি তোমাকে এমন কিছু বলে দেব যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাকে কল্যাণ দান করবেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু সেটা জানতে চাইলে চোর বলল-
‘রাতে যখন ঘুমাতে যাবে তখন আয়াতুল কুরসি (আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম) পড়ে ঘুমাবে তাহলে আল্লাহ তোমার জন্য একজন ফেরেশতাকে পাহারাদার নিযুক্ত করবেন। যে তোমার সঙ্গে থাকবে আর কোনো শয়তান সকাল পর্যন্ত তোমার কাছে আসতে পারবে না।’
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ঘটনা শুনে বললেন, ‘যদিও সে চরম মিথ্যাবাদী কিন্তু সে সত্য বলেছে।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘তুমি কি জান সে কে?’ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘না’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘সে হচ্ছে শয়তান।’ (বুখারি)

>> হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আয়াতুল কুরসি কুরআনের অন্যসব আয়াতের সর্দার বা নেতা। আয়াতটি যে ঘরে পড়া হবে, সে ঘর থেকে শয়তান বের হয়ে যাবে।’

আয়াতুল কুরসির মর্যাদার কারণ
কুরআনুল কারিমের এ আয়াতটিতে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি, গুনাবলী ও বৈশিষ্ট্য আলোচনার ১০টি বাক্য রয়েছে। এ সব বাক্যের কারণেই আল্লাহর কাছে এ আয়াতটি মর্যাদা এত অধিক।
>> اللّهُ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ : তিনিই আল্লাহ যিনি ব্যতিত ইবাদতের উপযুক্ত আর কোনো ইলাহ নেই
>> الْحَيُّ الْقَيُّومُ : তিনি সদা জীবিত এবং বিদ্যমান
>> لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ : আল্লাহ তাআলা তন্দ্রা ও নিন্দ্রা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
>> لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ : আকাশ এবং জমিনের যা কিছু রয়েছে তার সবাই আল্লাহর মালিকানাধীন।
>> مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ : সৃষ্টি কোনো বস্তুই আল্লাহর চেয়ে বড় নয় বিধায় এমন কে আছে যে তাঁর সামনে তাঁর অনুমতি ব্যতিত সুপারিশ করতে পারে?
>> يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ : মানুষের জন্মের পূর্বে এবং জন্মের পরের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা জানেন।
>> وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء : সমস্ত সৃষ্টির জ্ঞান মিলে একত্রিত হয়ে আল্লাহর জ্ঞানের কোনো একটি অংশ বিশেষকেও পরিবেষ্টিত করতে পারে না।
>> وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ : তাঁর কুরসি এত বড় যে, সাত আসমান ও সাত জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে।
>> وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا : আল্লাহর নিকট এত বৃহৎ দুইটি সৃষ্টি আসমান-জমিনের হেফাজত করা কোনো কঠিন কাজ নয়।
>> وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ : তিনি অতি উচ্চ এবং অতি মহান।

আয়াতুল কুরসির বিশেষ মর্যাদা
হজরত আবু যর জুনদুব ইবনে জানাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার প্রতি সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন আয়াত নাজিল হয়েছে কোনটি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- ‘আয়াতুল কুরসি।’ (নাসাঈ)

এই পুরো আয়াতটিই আল্লাহর একত্ববাদ, মর্যাদা ও গুণের বর্ণনা থাকার কারণেই আল্লাহ তাআলঅ এ আয়াতের মধ্যে অনেক ফজিলত রেখেছেন।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আয়াতুল কুরসির যথাযথ আমল করার মাধ্যমে হাদিসে ঘোষিত ফজিলতগুলো লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/পিআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।