গামিনির বদলে হেমিং, এলিমিনেটর ম্যাচে তবু শেরে বাংলায় এমন পিচ!

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৭:০৮ পিএম, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

কথায় বলে, ‘আগুন সম্পর্কে হাজারো কথা বলার চেয়ে একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে দেখাই যথেষ্ট, আগুন কী?’ এবারের বিপিএলে উইকেটের অবস্থা কেমন ছিল, তা দেখতে ও জানতে আর পরিসংখ্যান ঘাঁটার কিছু নেই।

২০ জানুয়ারি দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে হওয়া বিপিএলের এলিমিনেটর ম্যাচের স্কোরলাইনই বলে দিচ্ছে উইকেট কেমন ছিল। সিলেট টাইটান্স আর রংপুর রাইডার্স ম্যাচের গড় স্কোর ছিল ১১১। প্রথম ব্যাট করতে নেমে ডেভিড মালান, কাইল মেয়ার্স, তাওহিদ হৃদয়, লিটন দাস, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, খুশদিল শাহ, নুরুল হাসান সোহান আর ফাহিম আশরাফের রংপুর থামলো ১১১ রানে।

আর সেই ছোট টার্গেট তাড়া করে অনেক চড়াই-উৎরাই পাড় করে শেষ বলে নাটকীয় জয় পেলো সাহেবজাদা ফারহান, পারভেজ হোসেন ইমন, আফিফ হোসেন, মেহেদী হাসান মিরাজ, স্যাম বিলিংস, মঈন আলী ও ক্রিস ওকসের সিলেট টাইটান্স।

শেষ ওভারে ৯ আর শেষ বলে সিলেটের দরকার ছিল ৬ রান। ইংলিশ ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাস’ অলরাউন্ডার ক্রিস ওকস ফাহিম আশরাফের বলে কভারের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে সিলেটকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন।

বাংলাদেশের লিটন দাস, তাওহিদ হৃদয়, পারভেজ ইমন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, নুরুল হাসান সোহানের কথা না হয় নাই-ই বা বলা হলো। কাইল মেয়ার্স, ডেভিড মালান, খুশদিল শাহ, ফাহিম আশরাফ, স্যাম বিলিংস, মঈন আলীরাও রান পাননি। মারতে গিয়েও পারেননি, টাইমিংয়ের হেরফেরে কিংবা বোলারের সুইংয়ে ধরা খেয়েছেন। তখন আর বলার অবকাশ থাকে না যে উইকেট মোটেই ভালো ছিল না। মানে টি-টোয়েন্টির আদর্শ ও উপযোগী ছিল না। যে কারণেই এলিমিনেটর ম্যাচের স্কোরলাইন এত কম।

আসলে উইকেট কেমন ছিল? খেলা শেষে দু’দলের হয়ে মিডিয়ায় কথা বলতে আসা রংপুরের পরিবর্তিত অধিনায়ক লিটন দাস আর সিলেটের জয়ের নায়ক ক্রিস ওকসের মুখেই শোনা যাক।

বিপিএলে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামা ইংল্যান্ড তারকা অলরাউন্ডার ক্রিস ওকসের মূল্যায়ন, ‘আসলে এটা (উইকেট সম্পর্কে মূল্যায়ন) আপেক্ষিক। একজন পেস বোলার হিসেবে আমার কাছে ভালোই লেগেছে। আমি প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে এমন বোলিং-ফ্রেন্ডলি পিচে খেলতে ভালোবাসবো। নতুন বলে খানিক মুভমেন্ট ছিল। বাড়তি বাউন্সও ছিল। কিছু কিছু ডেলিভারি বেশ ক্যারি করেছে। সেই সঙ্গে বেশ সুইংও হচ্ছিল। বোলার হিসেবে এমন উইকেটে বোলিং করার জন্য বেশ কন্ডিশন। তবে আমার মনে হয় না ব্যাটাররা এমন উইকেটে প্রতিদিন ব্যাট করতে চাইবেন, যাতে ১১০ ভার্সেস ১১০ লড়াই হয়। পাশাপাশি উইকেট সিম হচ্ছিল। স্পিনও নিয়েছে বেশ। আমার মনে হয় মাঝেমধ্যে এমন উইকেটে খেলাও ভালো। তবে ব্যাটাররা এমন পিচে নিয়মিত খেলতে চাইবেন না।’

ওকসের প্রতিটি লাইন মনোযোগ দিয়ে পড়লে পরিষ্কার হবে তিনি শেরেবাংলার এলিমিনেটর ম্যাচের উইকেটকে মোটেই ব্যাটিং বান্ধব বলছেন না। পেসার ও স্পিনাররা কী কীভাবে এ পিচে সহায়তা পেয়েছেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। একজন বিশ্বমানের ক্রিকেটার তিনি তার অভিজ্ঞতালব্ধ ক্রিকেট-বোধজ্ঞান থেকেই এমন মূল্যায়ন করেছেন। এবং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছেন, মাঝেমধ্যে এমন উইকেটে খেলাও ভালো।

কিন্তু ওকসের তো আর জানা নেই যে, মাঝেমধ্যে নয়; এটাই শেরেবাংলার পিচের প্রতিদিনকার রূপ! সন্ধ্যায় শিশিরভেজা পিচে বল স্কিড করে, ব্যাটে আসে, শট খেলা সহজ হয়ে যায়। স্পিনারদের বল গ্রিপ করতে খুব সমস্যা হয়। তাদের কার্যকারিতাও যায় কমে। তাই রাতের ম্যাচে রান ওঠে। ব্যাটাররা শট খেলতে পারেন। কিন্তু দিনের বেলায় শেরেবাংলা পুরোই বোলিং-বান্ধব।

ক্রিকেট অনুরাগীদের প্রশ্ন, তা কেন হবে? এমন উইকেটে কি টি-টোয়েন্টি হয়? এটা মোটেই আদর্শ টি-টোয়েন্টি পিচ নয়-সরাসরি এমন মন্তব্য না করলেও রংপুর রাইডার্স তথা বাংলাদেশ অধিনায়ক লিটন দাসও বুঝিয়ে দিলেন, উইকেট মোটেই ভালো ছিল না।

ক্রিস ওকসের মতো এত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ না করে লিটন বলেন, ‘এলিমিনেটর ম্যাচে এর চেয়ে ভালো পিচ আশা করেছিলাম। এক দল ১১১ রানে অলআউট হওয়ার পর আরেক দল যখন শেষ বলে ছক্কা পেয়ে ম্যাচ জিতে, তখন বোঝাই যায় উইকেট কেমন ছিল।’

অথচ এই পিচের গতি-প্রকৃতি পাল্টাতে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে সাবেক লঙ্কান কিউরেটর গামিনি ডি সিলভাকে। তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থে আনা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান কিউরেটর টনি হেমিংকে।

হেমিং উইকেট তৈরির ও পরিচর্যার খুব বেশি সময় না পেলেও প্রায় মাস তিনেক ধরে কাজ করছেন। কিন্তু উইকেটের আচরণের কোনোই পরিবর্তন আনতে পারেননি। বরং উইকেটের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এক কথায়, দিনের ম্যাচগুলোয় বোলাররা পুরো কর্তৃত্ব করেছেন। ব্যাটাররা স্বচ্ছন্দে খেলতেই পারেননি।

তাহলে টনি হেমিংকে এত টাকা বেতন দিয়ে এনে লাভ কী হলো? ঘুরে ফিরে সেই আগের জায়গাতেই শেরে বাংলার পিচ।

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা এখনও অনিশ্চিত। তারপরও প্রস্তুতি তো নিয়ে রাখতেই হচ্ছে। এই স্লো আর বোলিং-ফ্রেন্ডলি পিচে বিপিএল খেললে বিশ্বকাপের আদর্শ প্রস্তুতি হওয়া সম্ভব?

বরং বিপিএলে ইচ্ছেমতো খেলতে না পেরে এবং কম রান করে তানজিদ তামিম, পারভেজ ইমন, লিটন দাস, তাওহিদ হৃদয়দের আত্মবিশ্বাস কমেছে নিঃসন্দেহে। বিপিএলের শেষভাগে এসেও তাই ব্যাট-বলের লড়াই ছাপিয়ে পিচ নিয়ে আলোচনা।

এআরবি/এমএমআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।