# ১৪ হাজার ৩৮৫ পদে প্রার্থী পৌনে ১১ লাখের বেশি# ৬১ জেলায় পাঠানো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ‘কানাঘুষা’# ফেসবুক গ্রুপগুলোতে সক্রিয়া প্রশ্নফাঁস চক্র# গুজব ছড়িয়ে পরীক্ষা ভণ্ডুলের অপচেষ্টা: অধিদপ্তর
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘হিসাব সহকারী’ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে পরীক্ষা শুরুর মাত্র এক ঘণ্টা আগে বিনা নোটিশে তা স্থগিত করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে চাকরিপ্রার্থীরা একদিকে যেমন ক্ষোভ জানিয়েছেন, অন্যদিকে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জড়িত বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।
হিসাব সহকারী পদের প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই এবার সামনে এসেছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা। এক দফা পিছিয়ে আগামী ৯ জানুয়ারি এ পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে অধিদপ্তর। তবে এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এতে ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা।
চাকরিপ্রার্থী ও অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে দেশের সবচেয়ে বড় নিয়োগ হয় প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক পদে। এবারও ১৪ হাজার ৩৮৫ পদে শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে এ পরীক্ষা নিতে তৎপর হওয়ায় প্রার্থীদের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় বেড়েছে।
তাদের অভিযোগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উচ্চপদে থাকা কর্মকর্তারা নির্বাচনের পর আর নাও থাকতে পারেন। অধিকাংশ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। এজন্য তড়িঘড়ি করে এ পরীক্ষা নিয়ে মৌখিক পরীক্ষা শেষ করতে চান। এ কারণে নিয়োগে প্রভাব ও অনিয়মের আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন পক্ষ।
প্রশ্নফাঁস চক্র সক্রিয়, অভিযোগ পাচ্ছেন কর্মকর্তারাওরংপুর বিভাগের একটি জেলার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, সাধারণত প্রাথমিকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনের পর এত দ্রুত সময়ে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় না। কিন্তু এবার দ্রুত এ পরীক্ষা নেওয়ার তোড়জোড় করায় সবার মধ্যে সন্দেহ বেড়েছে।
আরও পড়ুনপ্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার সময় পরিবর্তনপ্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নফাঁস নিয়ে যা বলছে অধিদপ্তরপ্রাথমিকে কর্মঘণ্টা বাড়লো, শিক্ষকদের ক্ষোভ
চাকরিপ্রার্থীরা প্রতারকচক্রের কাছ থেকে প্রশ্ন কেনার অফার পাচ্ছেন- এমন অভিযোগও পাচ্ছেন জানিয়ে এ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েকদিন একাধিক প্রার্থী কল করে জানিয়েছেন যে, তাদেরকে ফেসবুকের বিভিন্ন সিক্রেট গ্রুপে যুক্ত করে সেখানে প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি জানানো হয়েছে। পরীক্ষার আগে কেন্দ্রের আশপাশে কোনো বাসায় রেখে তাদের হাতে প্রশ্ন ও উত্তর দিয়ে পড়ানো বা প্রস্তুতি নেওয়ানো হবে। সেখান থেকে শতভাগ প্রশ্ন কমন আসবে বলেও নিশ্চয়তা দিচ্ছে চক্রটি। এর বিনিময়ে তারা অগ্রিম কিছু টাকা দাবি করছে। পাশাপাশি প্রবেশপত্র জমা রেখে পরীক্ষায় পাস করলে বাকি টাকা দিতে হবে বলে চুক্তি করছে। এ ধরনের প্রস্তাবের বিষয়টি অভিযোগ আকারে আসছে। আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তা জানিয়ে দিয়েছি।
যেভাবে প্রশ্নফাঁসের প্রলোভনপ্রশ্নফাঁস চক্রের অফার পাওয়া দুজন প্রার্থীর মোবাইল ফোন নম্বরও দেন ওই প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছে জাগো নিউজ। নাম প্রকাশ না করে ওই নারী চাকরিপ্রার্থী জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ প্রস্তুতি নামের একটা গ্রুপে যুক্ত আছি। সেখান থেকে একজন আমাকে প্রার্থী দেখে নক দিয়েছেন। কিছু কথাবার্তার পর মেসেঞ্জারে কল দিয়ে প্রশ্ন দেওয়ার অফার করছেন। তাদের অফার অনুযায়ী- তিন লাখে চুক্তি করতে হবে। ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হবে। তাহলে স্পেশাল গ্রুপে নেবে।’
‘এরপর পরীক্ষার আগের দিন মোবাইল ফোন রেখে তাদের নির্ধারিত বাসায় যেতে হবে। সেখানে তারা খাওয়া-থাকা ও প্রস্তুতির ব্যবস্থা করবেন। পরদিন তারাই কেন্দ্রে দিয়ে আসবেন। কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর তাদেরকে প্রবেশপত্র দিতে হবে। রেজাল্ট হলে লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে বাকি আড়াই লাখ টাকা দিয়ে প্রবেশপত্র নিতে হবে। তারা মৌখিক পরীক্ষার কোনো দায়িত্ব নেবে না’ যোগ করেন ওই চাকরিপ্রার্থী।
প্রশ্নপত্র কোথায়?গত ২ জানুয়ারি একযোগে দেশের ৬১ জেলায় প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও তার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পরীক্ষা পিছিয়ে ৯ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সেসময় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এমনকি প্রশ্নপত্রও প্রস্তুত করে জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানেই এক সপ্তাহের বেশি প্রশ্নপত্রগুলো রয়ে গেছে। সে কারণে প্রশ্নফাঁসের কানাঘুষাটা বেশি ছড়িয়েছে বলে ধারণা করছেন অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের এক কর্মকর্তা।
আরও পড়ুনশিক্ষক নিয়োগে সপ্তম গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন শুরু ১০ জানুয়ারিশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে নতুন নিয়ম, আবেদন শুরু ১৪ জানুয়ারিরোজায় প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখার দাবি শিক্ষকদের
তবে জেলায় প্রশ্নপত্র পাঠানো হলেও তা ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন পলিসি অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের পরিচালক এ কে মোহম্মদ সামছুল আহসান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ২ জানুয়ারি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। সঙ্গতকারণে আমাদেরকে সেসময় জেলা পর্যায়ে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। প্রশ্নপত্রগুলো স্ব স্ব জেলা প্রশাসনের (ডিসি) ট্রেজারিতে জমা থাকে। সেখানে কঠোর নিরাপত্তায় সিলগালা এসব প্রশ্ন রাখা হয়। সেখান থেকে প্রশ্নফাঁসের কোনো সুযোগই নেই।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব অপতথ্য বা মিথ্যা-ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এটি একটি চক্রের কাজ। একটি চক্র পরীক্ষা ভণ্ডুল করতে চায়। আবার কেউ কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করে পরীক্ষাটা পেছাতে চান। এসব অপতথ্য রুখতে গণমাধ্যম ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা গণামধ্যমের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের জানাতে চাই যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজবে কান দেবেন না। ৯ জানুয়ারি বিকেলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষা হবে। শতভাগ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার দুই ধাপ মিলিয়ে মোট ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৮০টি। সে হিসাবে গড়ে প্রতিটি পদের বিপরীতে লড়াই করবেন প্রায় ৭৫ জন চাকরিপ্রার্থী।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রথম ধাপে (রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ) ১০ হাজার ২১৯টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯২৯টি। দ্বিতীয় ধাপে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ) ৪ হাজার ১৬৬টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫১টি।
এএএইচ/কেএসআর/জেআইএম