বিশ্ববাজারে কয়েক সপ্তাহ ধরে সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার পর হঠাৎ করেই বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনার জেরে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তবে হঠাৎ কেন এমন দরপতন শুরু হলো?
গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিশ্ববাজারে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে তা ৫ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত ওঠে। একই সময়ে রুপা এবং প্লাটিনামের দামেও বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা যায়। যদিও পরবর্তী কয়েক দিনে এসব ধাতুর দাম দ্রুত কমে আসে, তবু এক বছর আগের তুলনায় দাম এখনো অনেক বেশি।
কেন বাড়লো সোনার দাম?বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে সোনার দাম লাফিয়ে বাড়ার পেছনে তিনটি বিষয় কাজ করেছে-
১. ট্রাম্প অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগকারীদের সরে আসা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। যেসব দেশকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনুকূল মনে করছেন না, তাদের ওপর শুল্ক আরোপ বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে। হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল বলেন, এই অনিশ্চয়তাই সোনার দামের বড় উত্থানের অন্যতম কারণ।
আরও পড়ুন>>ইতিহাসে প্রথমবার সোনার দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়ালোসোনার দামে নতুন ইতিহাস, আউন্স ছাড়ালো সাড়ে ৫ হাজার ডলারসোনার দাম ভরিতে কমলো ১৫ হাজার ৭৪৬ টাকা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ইউরোপের আটটি দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিলে শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয় এবং একই সময়ে সোনা ও রুপার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইনের মতে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্র ও রাজস্বনীতি ঘিরে ঝুঁকির ধারণা সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
২. যুদ্ধ ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে উত্তেজনা
ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে আনার ঘটনাও সোনার দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলসংক্রান্ত বক্তব্য বৈশ্বিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। এতে মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা কমে যায় এবং বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝোঁকেন। ট্রাম্পের তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণার পর ডলার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এমা ওয়ালের কথায়, ‘বিশ্ব যখন অগোছালো হয়ে ওঠে, তখন সোনা তার স্বভাবসুলভ আচরণই করে—দাম লাফিয়ে বাড়ে।’
৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ভূমিকা
সোনার দামে ঊর্ধ্বগতির পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ সোনা কেনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমা ওয়াল বলেন, অনেক দেশ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনাকে তাদের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে বেছে নিচ্ছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ভরতা থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া যায়।
রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ জব্দ হওয়ার ঘটনাও অনেক দেশকে নিরপেক্ষ রিজার্ভ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকিয়েছে। তবে হামাদ হুসেইনের মতে, ২০২২ সালের তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা এখনো বেশি হলেও ২০২৫ সালে চাহিদা কিছুটা কমেছে।
চীনের মতো দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে গয়না কেনা ও বিনিয়োগের কারণে সোনার চাহিদা বেশি। পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরাও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সোনা ব্যবসায় যুক্ত কোম্পানিগুলোতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছেন। পাশাপাশি টেথারের মতো ডিজিটাল মুদ্রা প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ সোনা কিনেছে, যা সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।
হঠাৎ দাম কমার কারণ কী?বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কাউকে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করবেন, যিনি সুদহার কমাতে তার চাপে নতি স্বীকার করবেন। এতে ডলার দুর্বল ও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় সোনার দাম আরও বেড়েছিল।
তবে ট্রাম্প তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত কেভিন ওয়ার্শকে মনোনয়ন দিতে পারেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের দাম হঠাৎ কমে যায়।
তবু বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, চলমান শুল্কনীতি ও যুদ্ধের কারণে সোনার দীর্ঘমেয়াদি আকর্ষণ এখনো অটুট। এবিসি রিফাইনারির গ্লোবাল হেড নিকোলাস ফ্রাপেল বলেন, ‘সোনা এমন একটি সম্পদ, যা কোনো ঋণ বা প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্সের সঙ্গে যুক্ত নয়। অনিশ্চিত বিশ্বে এটি একটি কার্যকর বৈচিত্র্য তৈরি করে।’
তবে বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, শুক্রবারের দামের অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে, অন্য পণ্যগুলোর মতো সোনার দাম যেমন দ্রুত বাড়ে, তেমনি দ্রুত কমতেও পারে।
সূত্র: বিবিসিকেএএ/