জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে আইন ও বিচারব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
দলটি জানিয়েছে, ক্ষমতায় গেলে তারা আইন সংস্কার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি, ঘুষ ও সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ নামে একটি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা হবে।
ইশতেহারে দলটি কল্যাণমুখী আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান এই ইশতেহার ঘোষণা করেন।
ইশতেহারে আইন ও বিচারব্যবস্থা বিষয়ে ১৬ দফা পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে দলটি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো—
বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সংস্কারমামলার জট নিরসনে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে বিচার প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ এবং আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।
স্বাধীন তদন্ত ও প্রসিকিউশন ব্যবস্থাবিদ্যমান প্রসিকিউশন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন প্রসিকিউশন সার্ভিস গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করবে।
নিবর্তনমূলক আইন সংস্কারগণগ্রেফতার, রিমান্ডে নির্যাতন, গুম ও তথাকথিত ‘আয়নাঘর’র মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ বন্ধে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে।
পার্সোনাল ল’ ও পারিবারিক আইনমুসলিমদের জন্য ইসলামি শরিয়াহসম্মত স্বতন্ত্র মুসলিম পার্সোনাল ল’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পার্সোনাল ল’ বিষয়ক বিশেষ বেঞ্চ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
নারীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও রয়েছে। এছাড়া পারিবারিক আদালত আইন ও বিধিমালা আধুনিকায়নের পাশাপাশি আপসামূলক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি কাউন্সিল বা কমিশন গঠনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষায়িত আদালত ও গ্রাম আদালতবিচার দ্রুততর করতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত আদালত স্থাপন এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। গ্রাম আদালত ও আইনগত সহায়তা ব্যবস্থাকেও সময়োপযোগী করে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরোনো আইন যুগোপযোগীকরণদণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এবং দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-সহ অন্যান্য পুরোনো আইন আধুনিক বাস্তবতার আলোকে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।
ওয়াকফ, যাকাত ও ইসলামি অর্থনীতিওয়াকফ ও যাকাত সংক্রান্ত আইনসমূহ সংস্কার করে এসব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি ইসলামি অর্থনীতি, তাকাফুল (ইসলামি বিমা) ও ব্যাংকিং খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
আইনগত সহায়তা ও ভুক্তভোগী পুনর্বাসনগরিব ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল জনগণের জন্য থানা পর্যায়ে সরকারি লিগ্যাল এইড সেল গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক বিচার নিশ্চিত করতে ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের কথা জানিয়েছে দলটি। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তায় একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
দলটির মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গত দেড় দশকে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্ঘাটন হবে এবং বাংলাদেশে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।
থাকবে ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ অ্যাপচাঁদাবাজি, ঘুষ ও সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ নামে একটি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা চাঁদাবাজি, ঘুষ, মাদক, সন্ত্রাসসহ যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগের সঙ্গে ভিডিও, অডিও ও ছবি সংযুক্ত করার সুবিধা থাকবে, যেন প্রমাণসহ তথ্য জমা দেওয়া সম্ভব হয়।
অ্যাপে জমা দেওয়া অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পৌঁছাবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগের অগ্রগতি লাইভ ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে অ্যাপেই দেখা যাবে, ফলে অভিযোগকারী প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে অবহিত থাকতে পারবেন। এ উদ্যোগে অভিযোগকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে, যেন নাগরিকরা নির্ভয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন।
স্মার্টফোন ব্যবহার করতে না পারা নাগরিকদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হবে। স্মার্টফোন না থাকলেও নির্ধারিত হটলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ জানানো যাবে, যা একইভাবে প্রশাসনের কাছে পৌঁছাবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে চাঁদাবাজি ও অপরাধ দমনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ আরও জোরদার হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমডিএএ/এমকেআর