অর্থনীতি

চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে 

আসন্ন রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং রপ্তানিমুখী পণ্যের চালান নির্বিঘ্ন রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান অচলাবস্থা দ্রুত নিরসনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, বন্দরের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তাই দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তা স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার গুলশানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এ আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বন্দরের অচলাবস্থার কারণে রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

তিনি জানান, গত দুদিন ধরে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রপ্তানি পণ্য বন্দরে আটকে আছে। ফলে বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সব রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু রপ্তানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আরও বলেন, বর্তমানে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য বন্দরে আটকে রয়েছে। এসব পণ্য দ্রুত বাজারে সরবরাহ করা না গেলে রমজানকে কেন্দ্র করে ভোক্তা পর্যায়ে সংকট তৈরি হতে পারে। এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত যেন এই ক্ষতি আর বাড়তে না পারে।

বন্দরের বর্তমান সমস্যাকে বন্দর পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের মধ্যকার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে সেলিম রহমান বলেন, এ বিরোধ বা সমস্যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তিনি জানান, বন্দরের জটিলতার কারণে রপ্তানিকারকদের ডেমারেজ চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার বাতিলের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সমস্যার সমাধানে ব্যবসায়ী মহল ইতিমধ্যে নিজস্ব উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করা হচ্ছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, কখনো কাস্টমস ইস্যু, আবার কখনো অপারেটরদের আন্দোলনের কারণে বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করছে। এতে ভবিষ্যতে ক্রেতারা বাংলাদেশে অর্ডার দেওয়ার আগে দু’বার ভাববেন, যা রপ্তানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি।

তিনি বলেন, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা হলে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কমতো। ব্যবসার ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও কম থাকতো। একই সঙ্গে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ সমন্বয়ের অভাবকে তিনি সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া উচিত।

বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান অচলাবস্থা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আজ এখানে বিকেএমইএ, বিজিএমইএ, বিটিএমএসহ সংশ্লিষ্ট প্রায় সব ব্যবসায়ী সংগঠন একসঙ্গে উপস্থিত রয়েছি এবং বন্দরের অচল অবস্থা নিয়ে সবাই একই ধরনের উৎকণ্ঠায় ভুগছি। বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নয়, বরং এটি একটি চেইন ইফেক্ট তৈরি করছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে পড়ছে।

তিনি বলেন, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ও শিপিং খাতে বিদেশি জাহাজগুলো ইতিমধ্যে অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করতে শুরু করেছে। বন্দরে পণ্য আটকে থাকার কারণে শুধু দেশে নয়, বিদেশের ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট—বিশেষ করে সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত জাহাজগুলোতেও অতিরিক্ত খরচ তৈরি হচ্ছে। এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই চাপবে। বিশেষ করে রমজান মাসে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে এর প্রভাব সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলবে।

শওকত আজিজ রাসেল বলেন, অতীতে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন দেখা গেলেও জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। ইতিমধ্যে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত অনেক কন্টেইনার বন্দরে পড়ে আছে, ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক অঙ্গীকার পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছর ধরে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাত নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা সহায়তা শিল্পখাত পায়নি। সামনে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলেও এর মধ্যে শিল্প খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ বলেন, এই সমস্যার দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও তৎপর হতে হবে। তিনি কাউকে সরাসরি দোষারোপ করতে চান না উল্লেখ করে বলেন, পরিস্থিতি যে একটি বড় ব্যর্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে তা স্বীকার করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে এই সংকট দ্রুত সমাধান করা এখন সময়ের দাবি।

আইএইচও/এমএমকে