শিক্ষা

১৭১৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তোড়জোড়, নেপথ্যে ‘ঘুসবাণিজ্য’

প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ‘রকেট গতি’ ঘুসের হার শিক্ষকপ্রতি ১০ লাখ টাকা সরকারের বছরে খরচ বাড়বে ৬৭০ কোটি টাকা ‘ঘুসবাণিজ্য’ নিয়ে কানাঘুষা, মুখ খুলছে না কেউ

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে এক হাজার ৭১৯টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা তড়িঘড়ি আবেদন নিয়ে মাত্র এক সপ্তাহে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের চূড়ান্তও করে ফেলেছে। তা অনুমোদনের জন্য বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন মিললেই এমপিওভুক্তি চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

এভাবে রকেট গতিতে এতসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়াকে নজিরবিহীন বলছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, এর পেছনে কাজ করছে কয়েক শ কোটি টাকার ঘুসবাণিজ্য। প্রতিষ্ঠানভেদে প্রতিটির জন্য ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষকপ্রতি ১০ লাখ টাকা ঘুস নেওয়া হয়েছে। ফলে যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বেশি, সে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে ঘুসও বেশি। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেনদেনের পরিমাণ অর্ধকোটি ছাড়িয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত হলে হঠাৎ করেই সরকারের খরচ বাড়বে। বছরে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে লাগবে ৬৭০ কোটি টাকারও বেশি। অথচ এগুলোর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই কাম্য শিক্ষার্থী। চলছে নামকাওয়াস্তে।

যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, শিক্ষকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে যাচ্ছে। এখানে কোনো অর্থের লেনদেন হয়নি। যাচাই-বাছাই করে এ তালিকা চূড়ান্ত করেছেন তারা।

সরকারের শেষ দিকে এসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নানা সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার একদিন আগে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে নজিরবিহীন পদোন্নতি ও পদায়নের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে মন্ত্রণালয়। তাতেও থামেনি বদলি-পদোন্নতির তোড়জোড়।

গত ২৫ জানুয়ারি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২৪ উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করে আদেশ (জিও) জারি করে মন্ত্রণালয়। এখন সেটি অনুমোদনের জন্য নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর আগে গত ৭ ও ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ১১ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ও নতুন পদায়ন দেওয়া হয়। সেই পদোন্নতি নিয়েও তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হয়।

এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়ায় রকেট গতিনতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে গত ১৪ জানুয়ারি থেকে অনলাইনে আবেদন নেওয়া শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তা চলে গত ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে মোট তিন হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে আবেদন করা হয়।

আবেদন শেষে শুরু হয় যাচাই-বাছাই। কিন্তু মাত্র আট কর্মদিবসে এসব তথ্য-উপাত্ত যাচাই শেষ করে ফেলে এমপিও কমিটি। তালিকা চূড়ান্ত করে বৃহস্পতিবার এক হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচনা করে এমপিওভুক্তির অনুমতি চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

মাউশির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা এসেছে, তার মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান এমনও আছে, যেখানে কাম্য শিক্ষার্থী নেই, বেহাল দশা। পাঠদান, লেখাপড়া বলে কিছুই হয় না। এমপিওভুক্তির জন্য তারা টাকা দিয়েছে। ফলে যাচাই-বাছাইয়ে উতরে গেছে।’

এত অল্প সময়ে যাচাই-বাছাই শেষ করাটা নজিরবিহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২৫ জানুয়ারি আবেদন শেষ হয়েছে। ২৬ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কর্মদিবস ছিল আটদিন। তিন হাজার ৬১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত আট দিনে যাচাই শেষ। দিনে ৪৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করেছে কমিটি। এটি প্রায় অসম্ভব কাজ। এর অর্থ হয়তো আগেই কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের চুক্তি ছিল। ফলে আবেদনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অটোমেটিক চয়েজ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। আর যাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল না, তাদের আবেদনে হাত না দিয়েই ফেলে দেওয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুনপ্রাথমিকের ৯৩% শিক্ষক অপেশাদার কাজে ক্লান্ত, বছরে ব্যয় ১৭১০ কোটি৪৮ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে দুই রাজনৈতিক দলের ‘ভাগাভাগি’শিক্ষকদের বেতন সুবিধা বাড়লো, জুলাই থেকে কার্যকর

তালিকায় কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটিঅর্থ বিভাগে পাঠানো এমপিওভুক্তির তালিকার সংক্ষিপ্তসারের কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে। তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৮৫৯টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় আবেদন করলেও যোগ্য বিবেচিত হয়েছে ৪৭১টি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আবেদন পড়েছিল এক হাজার ১৭০টি। এর মধ্যে যোগ্য বিবেচিত হয়েছে ৬২৩টি। ৩৩৬টি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় আবেদন করলেও যোগ্য বিবেচিত হয়েছে ১৩৫টি।

এছাড়া ৩৫১টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ থেকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচিত হয়েছে ১৪৫টি। স্নাতক পাস কলেজ ৪৪০টি আবেদন করলেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ৭৮টি। স্নাতক (সম্মান) ৪১৪টি কলেজ আবেদন করলেও বিবেচিত হয়েছে ২৩২টি। আর ৪৫টি স্নাতকোত্তর কলেজের মধ্যে যোগ্য বিবেচিত হয়েছে ৩৫টি।

বছরে খরচ ৬৭০ কোটি টাকানতুন করে এক হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি চূড়ান্ত হলে সরকারের বছরে ৬৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকার খরচ বাড়বে। সবচেয়ে বেশি ব্যয় হবে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পেছনে। ৪৭১টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ বছরে সরকারের খরচ হবে ১৮৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

এরপর রয়েছে উচ্চমাধ্যমিক কলেজ। ১৪৫টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজে ব্যয় হবে ১২৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। ২৩২টি স্নাতক (সম্মান) কলেজের জন্য ব্যয় হবে ১২৫ কোটি টাকা। এছাড়া ৬২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, ১৩৫ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০২ কোটি ২২ লাখ এবং ২৩২ স্নাতক (পাস) কলেজে খরচ হবে ৩৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

মুখ খুলছেন না কেউবিদায়বেলায় এতসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করা নিয়ে শিক্ষাপ্রশাসনে ফিসফিসানি। কে, কত টাকা ভাগে পাচ্ছেন, তা নিয়েও চলছে কানাঘুষা। তবে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছেন না। কারণ শতকোটি টাকার এ বাণিজ্যে মাউশির সব আঞ্চলিক কার্যালয়, প্রধান কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ শিক্ষা বিভাগের সব কর্মকর্তাই ভাগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তালিকা অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে, তাতে সই করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-৩-এর উপসচিব সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী। বিষয়টি নিয়ে জানতে তার মোবাইল ফোন নম্বরে কয়েক দফা কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে বেসরকারি মাধ্যমিক শাখার দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে জানান, শিক্ষা উপদেষ্টা ও সচিবের নির্দেশে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কাজ চলছে। যা কিছু হচ্ছে সে বিষয়ে তারা অবগত।

এ নিয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহেনা পারভীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। আর শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরারের মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

এএএইচ/একিউএফ