বয়কাট চুল। পরনেও ছেলেদের মতো পোশাক। সারাদিন খেলার মাঠে ছোটাছুটি। আলপি আক্তারের এই দুরন্তপনার কারণে তার বাবা আতাউর রহমানকে শুনতে হয়েছে মানুষের কটু কথা। হাটবাজারে বা পথেঘাটে কেবল আলপি আক্তারের বাবাকেই নয়, বাড়িতে তার মাকেও শুনতে হয়েছে মানুষের নানারকম কথা।
সব কথার সারমর্ম ছিল এমন- এই মেয়েকে বিয়ে দেবেন কিভাবে? অথচ আলপি তখনো বিয়ের বয়স থেকে অনেক দূরে। তারপরও মানুষের কথা কতক্ষণ সহ্য করা যায়? তাই তো মেয়েকের বোঝানোর চেষ্টা ছিল আতাউর দম্পতির, যেন আর মাঠে-ঘাটে না যায়; কিন্তু আলপি কারো কথার পাত্তাই দেননি। খেলাকেই ধ্যানজ্ঞান করে ফেলেন।
আলপি আক্তার নামটি এখন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে খুবই পরিচিত। চলমান নারী ফুটবল লিগ ও সাফ নারী অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে আলো ছড়িয়ে ফুটবল অঙ্গনে সাড়া ফেলেছেন এই কিশোরী।
আলপির আলোয় আলোকিত হয়ে বয়সভিত্তিক আরেকটি সাফের শিরোপা জয়ের হাতছানি বাংলাদেশের সামনে। শনিবার নেপালের পোখারা রঙ্গশালায় ফাইনালে বাংলাদেশ খেলবে ভারতের বিপক্ষে।
আলপি আক্তারকে নিয়ে প্রত্যাশাটা অনেক বেশি সবার। সর্বশেষ ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে দেশকে সহজেই ফাইনালে তুলেছেন আলপি। পঞ্চগড়ের এই কিশোরীই মাতিয়ে যাচ্ছেন হিমালয়ের দেশ।
নারী লিগের গত আসরে রাজশাহী সিরাজ স্মৃতি সংসদের হয়ে খেলে এক হ্যাটট্রিকসহ ১১ গোল করেছিলেন আলপি আক্তার। চলমান লিগে রাজশাহী স্টারসের জার্সিতে তিন হ্যাটট্রিকসহ ২৫ গোল করে গোল্ডেনবুটের লড়াইয়ে আছেন সবার ওপরে। সাফ নারী অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের ১৮ গোলের ৭টিই করেছেন আলপি আক্তার। হ্যাটট্রিক করেছেন দুটি। ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে তার দিকেই বেশি নজর থাকবে সবার।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় দাঁড়িপাড়া গ্রামের আতাউর রহমান পাশের বাজারে চায়ের দোকান দিয়ে সংসার চালান। আলপি আক্তার তার ছোট সন্তান। বড় ছেলে নুর আলম কিছুদিন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। করোনার পর থেকে বাবার ছোট চায়ের দোকানেই সহযোগিতা করেন।
আলপি আক্তার এখন দেশের নারী ফুটবলের পরিচিত মুখ। ২০২৪ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ নারী অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন আলপি। সেটাই ছিল তার লাল-সবুজের জার্সিতে প্রথম কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া।
আলপি আক্তারের বাবা আতাউর রহমান পঞ্চগড় থেকে বলছিলেন মেয়েদের ফুটবলার হওয়ার গল্প। ‘আলপির ছোট সময় থেকেই খেলাধুলার প্রতি টান ছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টু-থ্রিতে পড়ার সময় থেকে দৌড়, লাফসহ নানা ধরণের খেলায় অংশ নিতো। ছেলেদের সাথে ফুটবলও খেলতো। উচ্চলম্ফে অনেক ভালো করতো। রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দৌড়, হাইজাম্ফ, লংজাম্ফসহ বিভিন্ন খেলায় ওর ১৭-১৮ টা সার্টিফিকেট আছে। খেলাধুলা করতে আমরা নিষেধ করতাম। তবে সে নিজের ইচ্ছায়ই এসব করতো। বিজন মাস্টার (ওর স্কুলের প্রথম শিক্ষক) তাকে খেলার বিষয়ে অনেক সহযোগিতা করেছেন। আমি তো খেলাধুলার কিছু বুঝতাম না। তাই তিনিই আলপির খেলাধুলার প্রথম গুরু’-বলছিলেন আলপি আক্তারের বাবা আতাউর রহমান।
বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার পাশাপাশি আলপি ফুটবলে গোলপোস্টের নিচে খেলতে পছন্দ করতেন। সেই আলপিকে স্ট্রাইকার পজিশনে খেলার জন্য তৈরি করেছেন মোফাজ্জল হোসেন বিপুল নামের তৃণমুলের একজন ফুটবল কোচ। বিপুল পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় নিজ উদ্যোগে পরিচালনা করেন একটি ফুটবল একাডেমি। ‘টুস্টার বোদা উপজেলা ফুটবল একাডেমি’- থেকে এরই মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় উঠে আসতে শুরু করছে। আলপি আক্তার ছাড়াও তৃষ্ণা রানী ও শান্তি মারদি এই একাডেমি থেকেই বের হয়ে এসেছেন।
একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মোফাজ্জল হোসেন বিপুল আলপিকে নিয়ে দারুণ আশাবাদী। তিনি আলপির মধ্যে দেখতে পান একজন সাবিনা খাতুনকে। ‘২০১৮ সালে এই একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছি। প্রথম বছর ছিল কেবল ছেলেরা, পরের বছর মেয়েদেরও ট্রেনিং শুরু করি। এখন ১২০ জন ছেলে ও ৩০ জন মেয়ে আছে। আলপি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তো তখন তার খেলা দেখে বলেছিলাম ফুটবল অনুশীলন করতে। তবে ওর বাবা-মা খেলতে দিতে চাইতেন না। পরে সম্মতি দিয়েছেন। শুরুতে সে গোলরক্ষক পজিশনে খেলতো। আমি তাকে আক্রমণভাবে নিয়ে আসি। ওর পায়ের কাজ দুর্দান্ত। ঠিক সাবিনা খাতুনের মতো। আমি বলবো আলপি আক্তার আগামীর সাবিনা খাতুন’- বলছিলেন টুস্টার বোদা উপজেলা ফুটবল একাডেমির কোচ বিপুল।
বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরত্ব একাডেমির। ভ্যানে করে অনুশীলনে যেতে হতো আলপিকে। কখনো কখনো আলপির স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার মটর সাইকেলে করে নিয়ে যেতেন একাডেমিতে। কখনো কোচ বিপুল নিজে ভাড়া দিয়ে নিয়ে যেতেন তাকে। এভাবেই বাড়ি থেকে অনুশীলনে যেতেন আলপি আক্তার। তারপর বাফুফের ট্রায়ালে অংশ নিয়ে টিকে যান এবং ওঠেন ক্যাম্পে।
নেপাল থেকে আলপি আক্তার বলছিলেন তার শুরুর দিকের কথা। ‘২০২৪ সালে ট্রায়াল দিতে ঢাকায় আসি এবং টিকে যাই। তারপর ওই বছর সাফ অনুূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেই নেপালে। এর আগে আমি একটি লিগ খেলেছি সিরাজ স্মৃতি সংসদের হয়ে। ১১ গোল করেছিলাম’- বলছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের এই স্ট্রাইকার।
আপনি ছোট চুল রাখেন। কাউকে অনুসরণ করেন? ’আলপি বলেন, না। আমি এমনিই ছোট চুল রাখি। কাউকে অনুসরণ করি না। তবে আমার খুব পছন্দ সাবিনা আপুর খেলা। তার মতো খেলার চেষ্টা করি’-বলেন আলপি আক্তার।
আলপি এসএসসি পরীক্ষা দেবেন বোদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। এই স্কুলের হয়ে তিনি বঙ্গমাতা ফুটবলে খেলে সবার নজর কেড়েছিলেন। নেপাল থেকে সবার কাছে দোয়া চেয়ে আলপি বলছিলেন, ‘দেশের সবাই যেন আমাদের জন্য দোয়া করেন যাতে চ্যাম্পিয়ন হতে পারি।’
আলপিদের বাসায় কোনো টিভি নেই। মেয়ের খেলা দেখতে আতাউর রহমানকে ভরসা করতে হয় অন্য কারো ওপর। ‘সবাই মেয়ের খেলা দেখেন মোবাইলে। আমার তো সাধারণ মোবাইল। তাই দোকানে বসে কেউ খেলা দেখলে আমি দেখতে পারি। বাসায় টিভি ও মোবাইল নেই। আলপির মাও খেলা দেখতে পারে না’- বলছিলেন আলপির বাবা।
খেলাধুলা সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই আতাউর রহমানের। সবার কাছে শুনেশুনে মেয়ের খেলার খবর রাখেন। লিগে আলপি ২৫ গোল করেছেন সেই তথ্য আছে তার কাছে। বুধবার নেপালের বিপক্ষে ৪ গোলে জিতেছে বাংলাদেশ, আলপি তিন গোল করেছেন সেই খবরও রেখেছেন। তিন গোল করা তো সম্মানের জানেন? ‘শুনেছি আলপি হ্যাটট্রিক না কি যেন করেছে। লিগেও কয়েকবার করেছে’-জবাব আতাউর রহমানের।
অনেক প্রতিকুলতার পর আলপি এখন দেশের জার্সিতে খেলছেন এবং ভালো খেলছেন। এখন আপনার কেমন অনুভূতি? ‘এখন তো অনেক ভালো লাগছে। ওই সময় যারা বলতেন তোমার মেয়ে ছোট চুল রাখে কেন, খেলাধুলা করে কেন, বিয়ে দিবা কিভাবে? তারাই এখন এসে আমাকে প্রশংসা করেন। বলেন, তোমার মেয়ে অনেক ভালো জায়গায় চলে গেছে। আরো অনেক ওপরে যাবে। সবাই যখন এখন আমার কাছে এসে এসব কথা বলে অনেক ভালো লাগে। এক সময় যে মেয়ের জন্য মানুষের কটু কথা শুনতে হতো এখন সেই মেয়ের জন্যই চারিদিক থেকে প্রশংসা পাচ্ছি’- বলছিলেন আলপি আক্তারের বাবা আতাউর রহমান।
আলপির এ পর্যন্ত আসার পেছনে আতাউর রহমান বারবার বলছিলেন বোদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিজন ও টুস্টার বোদা ফুটবল একাডেমির কোচ মোফাজ্জল হোসেন বিপুলের কথা, ‘এই দুইজনের কারণেই আলপি আজকে এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে।’
শনিবার আলপিদের ফাইনাল। কিভাবে দেখবেন? ‘কারো মোবাইলে দেখবো। দোকানে বসে অনেকে খেলা দেখেন। সেখানে দেখবো। বাড়িতে হয়তো ওর মা দেখতে পারবেন না’-বলছিলেন আলপির বাবা। তিনি আশাবাদী বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে।
আরআই/আইএইচএস/