কৃষি ও প্রকৃতি

রঙিন বাজরিগারে সিফাত খানের রঙিন স্বপ্নযাত্রা

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

মো. সিফাত খান তরুণ আইনজীবী। তবে হৃদয়ে লালন করেন অনন্য ভালোবাসা—বাজরিগার পাখির প্রতি। এলএলবি (অনার্স) ও মাস্টার্স শেষ করার পর বর্তমানে তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সিনিয়র অ্যাডভোকেটের অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে যুক্ত আছেন। বাবা-মা, দুই বোন ও স্ত্রীকে নিয়ে তার পরিপূর্ণ পরিবার। পরিবারের ভালোবাসার ঘেরাটোপেই শুরু হয়েছিল তার পাখি পালনের যাত্রা।

সিফাত খানের বাজরিগার পালনের শুরুটা একেবারেই শৈশবের গল্পের মতো। মায়ের সঙ্গে ঢাকার কাপ্তান বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে দোকানে ছোট্ট রঙিন পাখিগুলো দেখে মনে দারুণ আগ্রহ জাগে। বায়না ধরতেই মা কিনে দেন দুই জোড়া বাজরিগার। এরপর থেকেই শুরু হয় পাখির প্রতি মায়াময় এক অধ্যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও দেখে তিনি জানতে পারেন, এই ছোট্ট পাখিগুলো ডিম পাড়ে, বাচ্চা দেয় এবং ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে বাড়তে থাকে—সেই জ্ঞানই তাকে অনুপ্রাণিত করে নিজের ছোট্ট এভিয়ারি গড়ে তুলতে।

অনেকে যখন বড় আকারের পাখি পালন করেন, সিফাত বেছে নেন বাজরিগারকে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বাজরিগার ছোট, সামাজিক ও রঙিন পাখি। দামের দিক থেকেও এটি সবার সাধ্যের মধ্যে। ক্লাসিক বাজরিগারের দাম একদম অল্প, আর বাচ্চা দেয় বেশি—এসব কারণেই আমি বাজরিগার বেছে নিয়েছি।’

পাখি পালনের বিষয়টি তিনি শিখেছেন মূলত সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই। তিনি শুধু নিজে শেখেননি বরং তার স্ত্রী, চাচাতো ভাই এবং পাশের গ্রামের একজন হাফেজকেও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাদের অনেকেই এখন সফলভাবে ব্রিড করাচ্ছেন।

আরও পড়ুনলাভবার্ডসের মিলনমেলা, পেলো গোল্ড মেডেল 

বর্তমানে তার খামারটি ঘরের স্টোর রুমে তৈরি করা হয়েছে। খামারে জানালা, এক্সহস্ট ফ্যান, হোয়াইট টিন ও নেটের দরজা আছে। যাতে পাখির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হয়। খামারের নাম ‘সিফাত এভিয়ারি’। বর্তমানে খামারে প্রায় ৫৬টি খাঁচা আছে। যার মধ্যে ৩৫টিতে জোড়ায় পাখি রাখা আছে। মোট পাখির সংখ্যা প্রায় ১৩০টি। যার মধ্যে বাচ্চা আছে ৩৫-৪০টি। প্রতি বছর এক জোড়া পাখি থেকে গড়ে ১২-১৩টি বাচ্চা পাওয়া যায়।

পাখিগুলোর মধ্যে আছে ১১ প্রজাতি বা মিউটেশন—যেমন লুটিনো জাপানিজ, ইয়োলো ডিএফ, এলবিনো, হোয়াইট ডিএফ, ক্রিমিনো (লাল ও কালো চোখের), ক্ল্যাসিক জাপানিজ, টিসিবি হলুদ, রেইনবো জাপানিজ ও নরমাল রেইনবো ইত্যাদি। দামও বৈচিত্র্যময়—ক্লাসিক জোড়া ১০০০ টাকা থেকে শুরু করে রেইনবো জাপানিজ জোড়া ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

এ পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বাজরিগার পালন দেখতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়—বললেন মো. সিফাত খান। তার মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্রিডিংয়ের সময় হাঁড়ির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। কারণ একসঙ্গে বেশি বাচ্চা হলে হাঁড়ি দ্রুত ময়লা হয়ে যায়। ফলে প্রতিদিন হাঁড়ি বের করে বাচ্চার দেখাশোনা করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

এ সমস্যা সমাধানে তিনি এখন হাঁড়ির পরিবর্তে ব্রিডিং বক্স ব্যবহার করেন। যাতে পাখিরা নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশে থাকতে পারে। এ ছাড়া আরেকটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর সমস্যা হলো পাখির সবুজ পায়খানা—যা অসুস্থতার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই তিনি প্রতিদিনই খামারের প্রতিটি পাখির পুপস বা পায়খানা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। যেন প্রাথমিক অবস্থাতেই কোনো সমস্যা ধরা পড়ে ও দ্রুত সমাধান করা যায়।

আরও পড়ুনকবুতর পালনের সুবিধাসমূহ জেনে নিন 

যারা পাখি নিতে চান তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘পাখি নেবেন ভালো কথা, কিন্তু শুধু ছবি বা ভিডিও দেখে না—খামার ভিজিট করে নিতে হবে। কারণ অনেক সময় পাখি মাইটস রোগে আক্রান্ত হয়। আমি চাই সবাই খামার দেখে, পাখির বাবা-মা দেখে তারপর সংগ্রহ করুক।’

বাজরিগার পাখি সুস্থ ও চঞ্চল রাখতে সিফাত খান অনুসরণ করেন কিছু নিয়মিত যত্নের টিপস। তার মতে, সপ্তাহে অন্তত একদিন পরপর নতুন সিডমিক্স দেওয়া উচিত। যাতে পাখিরা সব সময় তাজা ও পুষ্টিকর খাদ্য পায়। প্রতিদিন সকালে ও দুপুরে পানি পরিবর্তন করা জরুরি। কারণ পুরোনো পানি ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে পারে। সপ্তাহে দুইবার সফট ফুড এবং তিন দিন পরপর শাক-সবজি খাওয়ানো পাখির রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও প্রজনন সক্ষমতা উন্নত করে। পাশাপাশি খামারে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হয়। যেন পরিবেশ আর্দ্র বা দূষিত না হয়। সবশেষে, সপ্তাহে একদিন খাঁচার ট্রে পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন—যাতে পাখির বাসস্থান সর্বদা স্বাস্থ্যকর ও আরামদায়ক থাকে।

এ খামার থেকে তার মাসিক গড় আয় ২০-৩০ হাজার টাকা। এখন পর্যন্ত মোট আয় প্রায় ৩ লাখ টাকার মতো। তার মতে, ‘সোশ্যাল মিডিয়া এখন বিক্রির বড় মাধ্যম। সঠিক দাম না পেলে আমি পাখিকে ফ্লাইং কেইজে রেখে বড় করি, যেন ভবিষ্যতে ভালো দামে বিক্রি করা যায়।’

বাজরিগারের কিছু মজার দিকও আছে বলে জানান তিনি—‘যখন তাদের গোসলের জন্য পানি দিই, শাক মিশিয়ে দিই—তাদের উচ্ছ্বাস দেখতে দারুণ লাগে। তখন রুমে বসে তাদের গোসল দেখা সত্যিই আনন্দের।’ তার সাফল্যের পেছনে পরিবারের পাশাপাশি আছে কয়েকজন সহযোগীর অবদান—সাইফুর রহমান মিল্টন, সাকিল, গালিব, মোস্তাফিজুর রহমান রাকিব। বিশেষ করে তার স্ত্রী সব সময় মানসিকভাবে পাশে থেকেছেন, যা তিনি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন।

আরও পড়ুনতিতির পালনে স্বাবলম্বী রাজবাড়ীর রুবেল 

সিফাত খানের কাছ থেকে শেখা ও তার দিকনির্দেশনায় অনেকেই এখন সফলভাবে বাজরিগার পালন করছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাজমুল, হাফেজ আরমান এবং ইয়াছিন খান। এরা সবাই সিফাতের হাত ধরেই বাজরিগার পালনের যাত্রা শুরু করেছেন এবং বর্তমানে বেশ ভালো করছেন। নিয়মিত ব্রিডিং, যত্ন ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে তারা এখন নিজ নিজ এলাকায় পরিচিত ছোট উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠেছেন। সিফাতের মতে, তারা ধারাবাহিকভাবে অগ্রগতি করছেন এবং খুব শিগগিরই প্রত্যেকের মাসিক গড় আয় স্থিতিশীলভাবে বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে।

নতুন উদ্যোক্তাদের তিনি পরামর্শ দেন—‘অবশ্যই অভিজ্ঞ খামার ভিজিট করুন। ব্রিডিং সম্পর্কে জানুন এবং রোগমুক্ত পাখি দিয়ে শুরু করুন।’ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি চাই বৈধ উপায়ে বিদেশেও পাখি বিক্রি করতে। পাশাপাশি চাই, নতুন প্রজন্ম যেন খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে থেকে প্রাণীপ্রেম শেখে। এক-দুই জোড়া বাজরিগার পোষার মাধ্যমে তারা সহানুভূতি ও যত্নশীলতা শিখবে।’

এসইউ