ঢাকা-১২
৫০ গজের মধ্যে ৫ প্রার্থীর নির্বাচনি অফিস, সহনশীলতার ‘অনন্য দৃষ্টান্ত’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন সামনে সরগরম ভোটের মাঠ। এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী থাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ঢাকা-১২ আসন। তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর থানা এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১৫ জন প্রার্থী—যা দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে তিনজন প্রার্থীর নামের প্রথম অংশ একই হওয়ায় (সাইফুল) ভোটারদের মাঝে বাড়তি কৌতূহল ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনি প্রচারণাতেও দেখা যাচ্ছে ব্যতিক্রমী ও সৌহার্দ্যপূর্ণ চিত্র। রাজধানীর হাতিরঝিল সংলগ্ন মধুবাগ খেলার মাঠের এক পাশে মাত্র ৫০ গজের মধ্যে পাশাপাশি পাঁচজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীর নির্বাচনি অফিস স্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনি অফিসগুলোতে মাইক ও বক্সে নিজ নিজ দলের গান ও প্রচারকালে এক অফিসের শব্দ আরেক অফিসে গেলেও কেউ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ বা আপত্তি তুলছে না। ভোটারদের মতে, এটিই প্রকৃত নির্বাচনি সৌন্দর্য।

মধুবাগ, হাতিরঝিল ও আশপাশের এলাকার ভোটাররা বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি অফিস ঘিরে সহিংসতা, ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও ঢাকা-১২ আসনে এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এখানকার প্রার্থীরাও একে অপরের বিরুদ্ধে বিরূপ বা নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছেন।
হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দা ও একটি গার্মেন্টস কারখানার এক্সিকিউটিভ ময়না জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগের নির্বাচনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে না দেওয়া কিংবা একতরফা প্রচারণার মতো ঘটনা দেখেছি। এবার বিএনপি, জামায়াত, বাম সংগঠনসহ নানা রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মাঠে আছেন এবং সবাই শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। এটা সত্যিই ভালো লাগছে।’

একই কথা বলেন ব্যাংক কর্মকর্তা গালিব। তিনি জাগো নিউজকে জানান, ‘অতীতে মধুবাগ মাঠে একক দলের প্রভাব ছিল। অন্য দলের কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হতো না। কিন্তু এবার মাত্র ৫০ গজের মধ্যে পাশাপাশি পাঁচজন প্রার্থী অফিস করলেও কোনো ধরনের অভিযোগ বা বিরোধ দেখা যাচ্ছে না।’
আরও পড়ুন
সর্বাধিক প্রার্থীর আসনে আগ্রহ বেশি তিন ‘সাইফুলে’
জয়-পরাজয়ে ব্যবধান গড়ে দিতে পারে ১.২ শতাংশ পোস্টাল ভোট
১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাতিয়ায় গণবিপ্লব ঘটবে: হান্নান মাসউদ
সরকারি একটি দপ্তরের কর্মকর্তা আলমগীর বলেন, ‘মধুবাগ মাঠ এমন একটি জায়গা যেখানে প্রতিদিন সকাল-বিকেল মানুষজন হাঁটাহাঁটি ও খেলাধুলা করে। নির্বাচনের মধ্যেও এসব কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চলছে। কারণ প্রার্থীরা মাঠের একপাশে অফিস করেছেন। এতে একদিকে নির্বাচনি আমেজ বিরাজ করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও বিনোদন নিতে পারছেন।’

মধুবাগ মাঠের শুরুতেই রয়েছে বিএনপি সমর্থিত ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি মনোনীত কোদাল প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল হকের নির্বাচনি অফিস। তার পাশেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলনের অফিস।
এরপর রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুল হাসান মমতাজীর অফিস। এর পাশেই স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের সাইফুল আলম নীরবের অফিস এবং সর্বশেষ গণসংহতি আন্দোলন মনোনীত মাথাল প্রতীকের প্রার্থী তাসলিমা আক্তারের নির্বাচনি অফিস।

ঢাকা-১২ আসনের ১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে একই নামের তিনজন হলেন—দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সাইফুল আলম খান মিলন, ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব এবং কোদাল প্রতীকের বিএনপি জোটের প্রার্থী সাইফুল হক।
এছাড়া এ আসনে কাস্তে প্রতীকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কল্লোল বণিক, মোমবাতি প্রতীকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মদ শাহজালাল, সিংহ প্রতীকে এনডিএমের মোমিনুল আমিন, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, কলম প্রতীকে জনতার দলের ফরিদ আহমেদ, আপেল প্রতীকে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের সালমা আক্তার, ছড়ি প্রতীকে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মুনতাসির মাহমুদ, ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের আবুল বাশার চৌধুরী এবং কাঁঠাল প্রতীকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নাঈম হাসান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ভোটারদের মতে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতাই ঢাকা-১২ আসনের এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক—যা দেশব্যাপী একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
ইএআর/ইএ