কারাবন্দি দুই প্রার্থী

গোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াই

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
তৌহিদুজ্জামান তন্ময় তৌহিদুজ্জামান তন্ময় , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক গোপালগঞ্জ থেকে
প্রকাশিত: ১০:৫৬ এএম, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
গোপালগঞ্জ-১ এ এবার ভিন্নধর্মী প্রচারণা, কারাবন্দি দুই প্রার্থীর স্বজনরা চাইছেন ভোট, ছবি: জাগো নিউজ

গোপালগঞ্জে বইছে ভিন্নধর্মী নির্বাচনি হাওয়া। গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী একাংশ) আসনটি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন এমন দুজন প্রার্থী যারা বর্তমানে কারাবন্দি। আইনি জটিলতা কাটিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার পর এখন কারাগার বনাম মাঠের লড়াই দেখতে মুখিয়ে আছেন ভোটার-সমর্থকরা।

কারাগারে দুই প্রার্থী

কারাবন্দি এ দুই প্রার্থী হলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আশ্রাফুল আলম শিমুল এবং গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী মো. কাবির মিয়া।

স্বতন্ত্র প্রার্থী আশ্রাফুল আলম শিমুল বর্তমানে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। তার নির্বাচনি প্রতীক ফুটবল। দাখিলকৃত হলফনামা অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে জামিন না পেলেও আত্মীয়-স্বজন ও তার সমর্থকরা সবাই তার পক্ষে মাঠে কাজ করছেন। কারান্তরীণ প্রার্থীর প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ভোটের মাঠে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করছেন তারা।

গোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াই

অন্যদিকে, কাশিমপুর কারাগারে বন্দি থেকেই ট্রাক প্রতীকে লড়ছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. কাবির মিয়া। তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা সাতটি। শুরুতে যাচাই-বাছাইয়ে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও দমে যাননি তিনি। উচ্চ আদালতে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় তার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার হয়েছে। মুক্তি না মিললে কারাগার থেকেই তিনি এ নির্বাচনি যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।

নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ফৌজদারি অপরাধে অন্তত দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত না হন, তবে তার নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা নেই। এ আইনি সুযোগেই বিচারাধীন মামলায় বন্দি থাকা অবস্থায় তারা লড়ছেন।

এই আসনে অন্য প্রার্থী যারা

এই আসনটি থেকে এবার মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন, বিএনপির মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা, জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মাদ আবদুল হামীদ, স্বতন্ত্র আশ্রাফুল আলম শিমুল, গণঅধিকার পরিষদের মো. কাবির মিয়া, স্বতন্ত্র আনিসুল ইসলাম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নীরদ বরন মজুমদার, স্বতন্ত্র মো. কাইউম আলী খান, ইসলামী আন্দোলনের মোহামদ মিজানুর রহমান এবং জাতীয় পার্টির সুলতান জামান খান।

গোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াই

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গোপালগঞ্জ-১ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের পাশাপাশি এ দুই কারাবন্দি প্রার্থীর অংশগ্রহণ নির্বাচনে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। ভোটারদের মধ্যে এটি আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ভোটার ও সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দুর্গ বলে খ্যাত গোপালগঞ্জের ভোট ব্যাংকে হানা দিয়ে আসনটি নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া বিএনপি। বিএনপি প্রার্থী ভোটারদের অনেক রকম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। শান্ত-নিরিবিলি গোপালগঞ্জ গড়ারও কথা বলছেন ধানের শীষের প্রার্থী সেলিমুজ্জামান মোল্যা।

বসে নেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীও। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মুহাম্মাদ আবদুল হামীদ নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মিজানুর রহমান ও জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে সুলতান জামান খান আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টায় ব্যস্ত। তৃণমূল ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত আসনটি।

গোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াই

তবে স্থানীয়রা বলছেন, মুকসুদপুর-কাশিয়ানীতে জামায়াতে ইসলামীর ভোট নেই বললেই চলে। ধানের শীষের সঙ্গে লড়াই হবে কারাগারে থাকা দুই প্রার্থী আশ্রাফুল আলম ও কাবির মিয়ার। তাই এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

ভোটার-সমর্থকদের ভাবনা

মুকসুদপুর কলেজ মোড়ের একটি চা দোকানে কথা হয় স্থানীয় হামিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, গোপালগঞ্জের মধ্যে ১ নম্বর আসনটি এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ। এখানের দুইজন এমপি প্রার্থী জেলে আছেন। তাদের স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়রা সবার কাছে ভোট চাচ্ছেন। অনেকে ভোটকেন্দ্রে যেতে না চাইলেও তাদের জন্য যাবে।

তিনি আরও বলেন, নয়জন প্রার্থীর মধ্যে হামিদুল কাবির মিয়ার অবস্থান তুলনামূলক ভালো।

মুকসুদপুরের খান্দারপাড়া গ্রামের বাজারের একটি চা দোকানে বসে কয়েকজন ভোটার ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তাদের আশঙ্কা, একটি প্রতীকে ভোট দিলে তা অন্য প্রতীকে চলে যেতে পারে।

আলাপচারিতায় অংশ নেওয়া ইকবাল মিয়া বলেন, গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এখানে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য প্রতীকের তেমন ভোট নেই বললেই চলে। তবে এবার অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। ভোট যদি সুষ্ঠু হয়, তাহলে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

গোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াই

খান্দারপাড়া বাজার ছেড়ে মুকসুদপুরের দিকে যাওয়ার পথে বিস্তীর্ণ মাঠে পেঁয়াজের জমিতে সার দিচ্ছিলেন কৃষক আফিল শেখ। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবার নৌকা মার্কা নাই, তাই কোনো দলীয় লোককে ভোট দেবো না। যে স্বতন্ত্র থেকে দাঁড়িয়েছে তাদের একজনকে ভোট দেবো। আশা করি তাদের মধ্যে একজন জেতবে।

আরও পড়ুন:

আওয়ামী লীগের দুর্গ গোপালগঞ্জ, ভোট নিয়ে কী ভাবছেন ভোটাররা? 

ভোট দিতে চান আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা 

আসন পুনরুদ্ধার চাইবে বিএনপি, জামায়াতের সামনেও প্রথম সুযোগ 

টেংরাখোলা বাজারে কথা হয় তরুণ ভোটার আরিফুল ইসলাম আরিফের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, দুইজন প্রার্থী জেলে আছেন, তাদের প্রতি মানুষের আগ্রহ যেমন বেশি তেমন কৌতূহলও তৈরি হয়েছে। অনেক দূর দূরান্ত থেকে আমাদেরকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছেন কে জিতবে এখানে, জেলে থাকা কেউ জিতবে কি না। জেলে থাকলেও যে ভালো কাজ করেছে, গোপালগঞ্জ মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছে তাকেই এখনকার সচেতন ভোটার বেছে নেবেন।

জেলে থাকা দুই প্রার্থীর স্বজনরা যা বলছেন

কাবির মিয়ার ছোট ভাই ইকবাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আমার ভাই জেলে থাকলেও নির্বাচনের দিক থেকে অনেক এগিয়ে রয়েছি আমরা। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করবো।

ভোটের দিন পাঁচ শতাংশ কেন্দ্রে আশঙ্কা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, আজ-কালকের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ করা হবে। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, কাবির ভাই যেহেতু জেলে সেকারণে কর্মীদের অকারণে হয়রানি করা হচ্ছে। পুলিশ দিয়ে ধরায়ে দেওয়ার হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে।

গোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াই

স্বতন্ত্র প্রার্থী আশ্রাফুল আলম শিমুলের চাচাতো ভাই সোহাগ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, আমরা স্বতন্ত্র প্রার্থী। যারা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করছেন তাদের থেকে কিছুটা চাপ রয়েছে। তবে সাধারণ ভোটারদের আমরা খুব রেসপন্স পাচ্ছি। যে এলাকায় যাচ্ছি সবাই শিমুল ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করছেন। তিনি কবে জেল থেকে মুক্তি পাবেন সবাই জানতে চাচ্ছেন। ভোটাররা বলছেন শিমুল ভাইকেই তারা এবার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে শতভাগ আমরা জয়লাভ করবো।

ভোট দেবেন কি না সিদ্ধান্তহীনতায় অনেকে

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাব থাকা গোপালগঞ্জের অনেক ভোটার এবার ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি না সে সিদ্ধান্ত এখনও নেননি অনেকে। আসনটির বিভিন্ন গ্রামে, মহল্লায় এবং প্রত্যন্ত এলাকার অন্তত অর্ধশত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৌকা প্রতীক ছাড়া এই নির্বাচনে অনেকেই ভোট দিতে যাবেন না। যদি কারো নিকটাত্মীয় হয় সেটি ভিন্ন কথা।

মুকসুদপুর এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চল্লিশোর্ধ্ব একজন জাগো নিউজকে বলেন, মামলা-হামলা থেকে রেহাই পাইনি ভাই। একের পর মামলা। ভয়ে ভয়ে থাকি কখন পুলিশ আসবে। এই অবস্থা শুধু আমার একার নয়। হাজার হাজার মানুষের। তারা জানের ভয় নিয়ে কীভাবে ভোটকেন্দ্রে যাবে।

গোবিন্দপুর গ্রামের আশিষ কুমার বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, আমরা সনাতন ধর্মের মানুষ। আমাদের কাছে সব প্রার্থীই আসছেন, ভোট চাচ্ছেন। ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে না বলেও আশ্বাস দিচ্ছেন। তবে এবার ভোট দিতে যাবো কি না তা এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি।

খান্দারপাড়া বাজার ছেড়ে মুকসুদপুর যাওয়ার পথে সড়কের দুই পাশ দিয়ে দিগন্তজুড়ে বিস্তীর্ণ মাঠ। নির্বাচন নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এবার নৌকা মার্কা নেই, আমাদের ভোটও নেই। এই ভোট কে দেবে।

ভোটের হিসাব-গোপালগঞ্জ-১

মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী (আংশিক) নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ-১ আসন। ১৯৮৬ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই আসনে ৬ বার জিতেছিলেন আওয়ামী লীগের ফারুক খান। এর আগে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের কাজী আব্দুর রশিদও জয়ী হন। গোপালগঞ্জে তিনটি আসনের মধ্যে শুধু এ আসন থেকে বিএনপি জয়ী হয়েছিল দুইবার। একবার ১৯৮৮ সালে এম. এইচ. খান মঞ্জুর এবং ১৯৯৬ সালে শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীর। এছাড়া ১৯৮৬ সালে সারওয়ার জাহান চৌধুরী জাতীয় পার্টি থেকে জয়ী হয়েছিলেন।

এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এই আসন থেকে এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৯ জন প্রার্থী। তারা হলেন, বিএনপির মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা, জামায়াত ইসলামীর মুহাম্মাদ আবদুল হামীদ, স্বতন্ত্র মো. আশ্রাফুল আলম শিমুল, গণঅধিকার পরিষদের মো. কাবির মিয়া, স্বতন্ত্র আনিসুল ইসলাম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নীরদ বরন মজুমদার, স্বতন্ত্র মো. কাইউম আলী খান, ইসলামী আন্দোলনের মোহামদ মিজানুর রহমান এবং জাতীয় পার্টির সুলতান জামান খান।

এখানকার মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৫১০ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২ হাজার ৮১৬ জন, নারী ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৯৪ জন।

টিটি/এসএনআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।